বেড়েলা যেন সোনার ফুল

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৫ এএম

যা তে বলে শিবা তনু : বাট্যালকী ভেষজী শিবা।

বিকিরিদ্র বিলোহিতে শিবা রুতস্য ভেষজী মৃড় জীবসে।

অথর্ববেদ

অথর্ববেদের ৫৬।৭৫।৩ সূক্তটির ভাষ্য হলো ‘হে বলে! তোমার শরীরের দ্বারা আমাদের শরীরের সুখের সন্ধান করে দাও। তুমি বাট্যালকী। বটের অর্থ পথ, বাট্যের অর্থ গৃহাঙ্গন, সেখানে তুমি শ্বেত ও পীত কুসুমের দ্বারা শোভিত হও। সবই পীত ও শ্বেত কুসুমের শোভাবর্ধক। তুমি ভেষজী, বিবিধ উপদ্রব দূর কর, শরীরের, মনের পাপ ব্যাধি দূর করে তোমার দেহ, তাই তুমি শিবা।’ বেড়েলা গাছে দু’রঙের ফুল ফোটে, হলুদ ও সাদা। হলুদ ফুলের বেড়েলা পীত বেড়েলা এবং সাদা ফুলের বেড়েলা শে^ত বেড়েলা নামে পরিচিত।

অথর্ববেদ যতই পড়ি, ততই দুর্বোধ্য লাগে। কিন্তু ভেষজ গাছের কিছু প্রাচীন সূত্র ও তথ্য খুঁজতে মাঝেমধ্যে পাতা ওলটাতে হয়। কাজ যে তাতে খুব একটা হয় তা না। বেড়েলা গাছটাকে আমরা চিনি, কিন্তু অথর্ববেদে বেড়েলা গাছটাকেই বাট্যালাকী বলায় তা চেনা যায়নি। যদি শিবকালী ভট্টাচার্য মহাশয় তা বুঝিয়ে না দিতেন, তাহলে বেড়েলার এ মর্যাদা হয়তো বুঝতামই না। সেটা বোঝার পর ভাবলাম, ওই ছোট্ট গাছটার কি এমন মাহাত্ম্য রয়েছে যে সে অথর্ববেদের মধ্যে সে জায়গা করে নিতে পেরেছে! কারণটা হলো, বেড়েলা মানুষের দেহবল, মেধাবল ও মনোবলকে নিরুপদ্রব রাখে। অথর্ববেদে বেড়েলাকে বলা হয়েছে প্রত্যেকটি রোগেই দেহের কোনো না কোনো স্বাভাবিক শক্তি নষ্ট হয়। বেড়েলা সেই শক্তি যেন ফিরিয়ে দেয়। জীর্ণজ¦র ও রাজযক্ষ্মায় বেড়েলামূল ব্যবহারের উপদেশ রয়েছে। এত যার মাহাত্ম্য ও গুণগান, সে গাছটা আসলে কেমন, কোথায় পাওয়া যায় সেটা নিয়ে কৌতূহল থাকবে সেটাই তো স্বাভাবিক।

৩ জুলাই শুক্রবার, এক বৃষ্টিহীন আষাঢ়ী সকালে রমনা উদ্যানে অস্তাচল তোরণের কাছাকাছি বসে একদল প্রকৃতি বন্ধুর সঙ্গে গাছগাছালির গল্প করছিলাম। হঠাৎ গাছ দেখতে দেখতে একটা বড় শ্বেতরঙ্গন গাছের তলায় ছোট্ট এক ঝোপ বেড়েলা গাছ চোখে পড়ল। চিনতে কষ্ট হলো না। এর আগেও তাকে অনেক জায়গায় দেখেছি। কিন্তু ফুল তো ফোটেনি। তখন সকাল প্রায় ১০টা। পাতার কোলে ছোট দানার মতো হলদে কুঁড়ি দেখলাম কয়েকটা। তার মানে ফুল ফুটবে। কত বেলা হলে ফোটে তা? এর আগে টাঙ্গাইলে সদর ও সখীপুরের রাস্তার ধারে এ গাছ অনেক দেখেছি। তখন ছিল শরৎকাল, গাছে ফোটা ফুল ছিল। কিন্তু এত বেলা হলেও ফুল কেন ফোটেনি?

একটা কৌতূহল কাজ করল মাথার মধ্যে। এসব কুঁড়ি কখন ফুল হয় তা দেখতে হবে। বসে রইলাম সে দৃশ্য দেখার জন্য। বেলা বাড়ছে, গাছের ছায়া কমে আসছে, রোদের তাতে ঘাস গরম হয়ে উঠছে, ভেজা মাটি থেকে ভাপ উঠছে। ঘাসের ওপর বসে থাকা দায়। অবশেষে ফুল ফুটল, ঘড়িতে তখন ১০টা ১৮মিনিট। কয়েক দিন আগেও জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে লেকের পাড়ে ঝোপজঙ্গলের মতো জায়গাটায় বেশ কয়েকটা বেড়েলা গাছ দেখেছিলাম। তখন ছিল বৈশাখ মাস, বেলা প্রায় ১০টার দিকে সেসব গাছে ফুল দেখেছিলাম। তাতে মনে হলো, বেড়েলা বোধহয় আলোক সংবেদনশীল গাছ, সূর্য বা দিনের আলোর সঙ্গে তার একটা সম্বন্ধ আছে। সম্বন্ধ আছে জবা ফুলের সঙ্গেও। কেননা জবা ও বেড়েলা একই পরিবারের গাছ, পরিবারের নাম মালভেসি। তবে ফুল, পাতা, গাছ কোনোটিই জবার মতো না, বরং ফুলের গড়নের সঙ্গে কিছুটা মিল দেখা যায় হলিহক ও বনওকড়া ফুলের সঙ্গে। জবা বা হলিহকের মতো ফুলদায়ী শোভাবর্ধক গাছ বেড়েলা না, সারা বিশ্বেই সে আগাছা হিসেবে পরিচিত। আগাছা হলেও ঔষধি গুণে গুণান্বিত। হার্বাল চিকিৎসায় বেড়েলার বেশ ব্যবহার রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এ গাছটি নিয়ে বিস্তর গবেষণা করে যাচ্ছেন। গাছটির জন্মভূমি মধ্য আমেরিকা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটি প্রধানত আগাছা হিসেবেই বিবেচিত। সে কারণে এর ফুল সুন্দর হলেও তা বনফুল। সাধারণত চারণভূমি, তৃণভূমি, পাহাড়ি ঢাল, খোলা বনভূমি, রাস্তার ধার, ফসলের জমি, পতিত স্থান, ফুটপাত ও পার্কের ঝোপঝাড়ের নিচে বেড়েলা গাছ দেখা যায়।

বেড়েলার ইংরেজি নাম ফ্ল্যানেল উইড বা হার্টলিফ সিডা, প্রজাতিগত নাম সিডা কর্ডিফোলিয়া (ঝরফধ পড়ৎফরভড়ষরধ), গোত্র মালভেসী। এটি গুল্ম প্রকৃতির দীর্ঘজীবী উদ্ভিদ, গাছ ২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, তবে আধা মিটারের মধ্যেই সাধারণত উচ্চতা সীমাবদ্ধ থাকে। গাছ খাঁড়া ও প্রচুর শাখায়িত। ডালপালা ও পাতা সূক্ষ্ম পশমাবৃত, পাতার কিনারা করাতের দাঁতের মতো খাঁজকাটা, অগ্রভাগ তীক্ষè, বোঁটার কাছে হৃৎপিণ্ডাকার। ফুল দেখতে বাটির আকৃতি, হলুদ বা ফ্যাকাশে কমলা পাপড়ি, কেন্দ্রস্থলে কেশরগুচ্ছ ঝুটির মতো থাকে। পাপড়ি পাঁচটি। ফল পাকলে ফেটে ৮ থেকে ১০টি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। বীজ দ্বারা বংশবিস্তার ঘটে।

লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত