অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে দেশের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনা, বড় অর্থপাচারের মামলার তদন্তে গতি আনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে নেওয়া হয়েছে একাধিক কৌশলগত উদ্যোগ।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিএফআইইউর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং গণবিধ্বংসী অস্ত্র বিস্তারে অর্থায়ন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একক কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সফল হওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটির দুটি সভায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অর্থ পাচারের ১০ থেকে ১২টি বড় মামলায় পাচার হওয়া সম্পদ দ্রুত উদ্ধারের বিষয়টিকে। এ লক্ষ্যে বিএফআইইউ, দুদক এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জনের পাশাপাশি অর্থ পাচারকারীদের জন্য কঠোর বার্তা দেওয়া যায়।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ-সম্পদ উদ্ধারে পারস্পরিক আইনি সহায়তা জোরদারে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড এবং হংকং-চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক দুর্নীতি দমন সমন্বয় কেন্দ্রসহ (ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি-করাপশন কো-অর্ডিনেশন সেন্টার) অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময় ও যৌথ তদন্তে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি নিরূপণে চলমান জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন দ্রুত শেষ করে তার ভিত্তিতে আগামী তিন বছরের জন্য নতুন জাতীয় কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বৈধ পথে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়াতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অর্থপাচার প্রতিরোধে তদন্ত কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে তদন্তকারী কর্মকর্তা, প্রসিকিউটর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানির প্রকৃত মালিকানা শনাক্তের বিধান কোম্পানি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা, পাবলিক গ্যাম্বলিং আইন সংশোধন এবং বিদেশে আইনি সহায়তার আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পৃথক ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্সের বৈঠকে ব্যাংক হিসাব খোলার সময় অনলাইনে পাসপোর্ট যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু, মোবাইল নম্বরের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য মিলিয়ে গ্রাহকের পরিচয় যাচাই (কেওয়াইসি) আরও শক্তিশালী করা এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) টাস্কফোর্সে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থপাচার প্রতিরোধে শুধু কঠোর আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; বরং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম মাসরুর রিয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। শুধু দেশে মামলা করলেই হবে না, যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়েছে, সেসব দেশের সঙ্গে কার্যকর পারস্পরিক আইনি সহায়তা, তথ্য বিনিময় এবং সম্পদ জব্দ ও ফেরত আনার সমন্বিত ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে দেশের তদন্ত সংস্থাগুলোর দক্ষতা ও প্রমাণ সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বড় অর্থপাচারের কয়েকটি মামলায় দৃশ্যমান সাফল্য এলে আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে অর্থ পাচারকারীদের জন্য শক্ত বার্তা যাবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও জাতীয় শ্বেতপত্র কমিটির সদস্য ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। এর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, নির্ভুল আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য, দক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার, এই চারটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ। বড় মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সম্পদ উদ্ধারে সফলতা আসলে দেশের আর্থিক খাত নিয়ে মানুষের আস্থা বাড়বে, পাশাপাশি ভবিষ্যতে অর্থপাচারের প্রবণতাও কমবে।