ডুবল ১৩২ হেক্টর বীজতলা

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৮ এএম

উত্তরের কৃষিসমৃদ্ধ জেলা গাইবান্ধার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হলো কৃষি। তবে সাম্প্রতিক টানা বর্ষণ ও উজান থেকে আসা ঢলের পানিতে জেলার কৃষি খাতে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার অধিকাংশ আমনের বীজতলা এখন পানির নিচে। দীর্ঘদিন নিমজ্জিত থাকায় অনেক এলাকার বীজতলা পচে নষ্ট হয়ে গেছে। মৌসুমের এই সময়ে এসে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনেকেই নতুন করে বীজতলা তৈরির কাজ শুরু করেছেন। কৃষকরা জানান, আকস্মিক এই বন্যার কারণে তাদের উৎপাদন খরচ এক লাফে অনেক বেড়ে গেছে। নতুন করে বীজ সংগ্রহ ও জমি প্রস্তুত করতে গিয়ে তাদের পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। অনেক প্রান্তিক চাষিই এখন এই বাড়তি খরচের জোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। এই সংকট উত্তরণে ভুক্তভোগী কৃষকেরা কৃষি বিভাগের জরুরি সহযোগিতা ও সরকারি প্রণোদনা দাবি করেছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সাত উপজেলার ৮১টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত গাইবান্ধা জেলা। সবকটি উপজেলা নদীবেষ্টিত। চলতি মৌসুমে জেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ১২০ হেক্টর জমি। এই জমির মধ্যে ধান রোপণের জন্য ৭ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে বীজতলা করা হয়েছিল। টানা বৃষ্টিতে ১৩২ হেক্টর বীজতলা পানিতে ডুবে গেছে। এরমধ্যে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৩ দশমিক ৫ হেক্টর বীজতলা। বীজতলাসহ জেলায় প্রায় ৩১০ হেক্টর জমির শাকসবজি পানির নিচে। সম্প্রতি সরেজমিনে সাত উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এসব বীজতলার চিত্র দেখা গেছে। এ সময় গাইবান্ধা সদর, পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অন্তত ৫০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি থেকে আষাঢ় মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বীজতলা তৈরি করা হয়। এসব আমনের চারা শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত রোপণ করা হয়। চাষিরা এবার সময়মতো বীজতলা তৈরি করেছিলেন। গত এক সপ্তাহ থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। ফলে উপকূলীয় এই নিম্নাঞ্চলের প্রায় সব বীজতলা পানির নিচে। তবে যে সব এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা তুলনামূলক ভালোÑ সেসব এলাকায় বৃষ্টি থামার এক-দুদিনের মধ্যে জমি থেকে পানি নেমে গেছে। সে সব বীজতলার চারার অবস্থাও ভালো নেই। জলাবদ্ধতার কারণে জেলার প্রায় অনেক এলাকায় বীজতলা পুরোপরি পানির নিচে পড়ে আছে।

চাষিদের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের জন্য অনেক বিলে খাল আছে। কিন্তু  প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিরা অধিকাংশ খাল নিজেদের দখলে রেখেছে। পলাশবাড়ী উপজেলার হরিনাথপুর ইউনিয়নের হরিনাথপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল সোবহান মিয়া বলেন, এ বছর প্রায় আট বিঘা জমিতে আমন চাষের পরিকল্পনা ছিল। সেজন্য তিনি প্রায় ২৫ শতাংশ জমির বীজতলা তৈরি করেন। প্রায় ২০-২২ দিনের চারা। জমিতে সার প্রয়োগ করার পরের দিন থেকে বৃষ্টি। এক সপ্তাহ ধরে চারাগুলো পানির নিচে। চারার মাথায় পচন ধরেছে। এই চারা রোপণ করা যাবে না। একই গ্রামের বকুল মিয়া প্রায় ৫ বিঘা জমিতে আমন ধান লাগানোর জন্য ১২ শতাংশ জমি বীজতলা করেন। সব চারা পচে নষ্ট হয়েছে বলে তিনি জানান। নতুন করে বা ক্রয় করে ধান রোপণের চিন্তা করছেন। এতে খরচ বাড়বে। উপজেলার পবনাপুর ইউনিয়নের গোপিনাথপুর গ্রামের হাবিবুর রহমান ১৫ দিন আগে বীজতলা তৈরি করছিলেন। চারাগুলো কিছুটা বড়ও হয়েছিল। কিন্তু এখন বীজতলায় থই থই পানি। শুধু আমরা নই, প্রায় সব কৃষকের বীজতলা পানির নিচে।

মনোহরপুর ইউনিয়নের কুমারগাড়ী গ্রামের আমিনুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টিতে বীজতলা ডুবে গেছে। সবগুলো চারা নষ্টের উপক্রম। নতুন করে বীজতলা তৈরির জন্য বেশি দামে বীজধান কিনেছেন। এতে আমন চাষে প্রায় ২০ দিন পিছিয়ে যাবে। তিনি বলেন- এলাকায় বহু বছরের একটি খাল আছে কিন্তু সেটি দখল করে রেখেছে প্রভাবশালীরা। খালটির পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত করেছে। ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ গাইবান্ধা কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) রোস্তম আলী দেশ রূপান্তরকে জানান, জেলায় অনেক শাকসবজি ও বীজতলা এখনো পানির নিচে ডুবে আছে। আমনের চারা আক্রান্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অনেক চাষি। তবে বীজতলা থেকে পানি নেমে যাওয়ার পরিচর্যা করলে ক্ষতি কমবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত