বৃহস্পতিবার দুপুরেও দুই ছেলেকে নিয়ে একসঙ্গে ভাত খেয়েছিলেন সেকান্দার আলী। তখন কে জানত, সেটিই হবে দুই সন্তানের সঙ্গে তার শেষবারের মতো খাওয়া। এক দিনের ব্যবধানে দুই ছেলের নিথর দেহ এখন মর্গে। বাকরুদ্ধ বৃদ্ধ বাবা। চোখে পানি, মুখে শোকের ছাপ। পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন নাতনিরাও। শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের সীতাকু-ের ভাটিয়ারী সমুদ্র উপকূলে ফেরদৌস স্টিল নামে পুরাতন জাহাজ ভাঙার কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মধ্যে সেকান্দার আলীর দুই ছেলে মোহাম্মদ মনসুর আলী ও মোহাম্মদ নাসিরও রয়েছেন। এদিকে স্বজনদের দাবি দ্রুত চিকিৎসা ও অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো প্রাণহানি কমানো সম্ভব হতো।
দুই ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে নির্বাক সেকান্দার আলী। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ। বাবার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন মনসুর আলীর দুই মেয়ে ও নাসিরের এক মেয়ে। বাবাকে হারানোর শোকের পাশাপাশি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের। কাঁদতে কাঁদতে সেকান্দার আলী বলেন, ‘আমার দুই ছেলে ১৭ বছর এই শিপইয়ার্ডে কাজ করত। এত বছর কাজ করার পর আজ দুজনকেই হারালাম। এখন নাতনিদের কী হবে, সেই চিন্তাই করছি।’
অন্যদিকে একই দুর্ঘটনায় মাত্র আট মাসের সংসার হারিয়েছেন ২৫ বছর বয়সী পলাশ দাশের স্ত্রী ভূমিকা রানী দাস। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ভূমিকার সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই হারাল তার বাবাকে। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে পলাশের বাড়ি। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির আঙিনায় স্বজনদের আহাজারি। ঘরের ভেতরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন পলাশের মা ও বোন। স্বামীকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী। স্বজনরা জানান, দুর্ঘটনার পর তার সিঁথির সিঁদুরও মুছে দেওয়া হয়েছে।
পলাশের বড় বোন রতœা রানী দাস বলেন, ‘আমার ভাই মাত্র আট মাস আগে বিয়ে করেছে। তার স্ত্রী সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আমাদের মা হার্টের রোগী। এখন কে দেখবে এই সংসার?’ কান্নায় ভেঙে পড়ে পলাশের মা বলেন, ‘আমার ছেলের বদলে যদি আমাকে নিয়ে যেত, তাতেই ভালো হতো।’ পলাশের পাশাপাশি একই এলাকার সানি দাসও এই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। স্থানীয়রা জানান, দুই তরুণই এলাকায় ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাদের মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তবে স্বজনদের শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা ও উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন। সানির এক স্বজনের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর আহত শ্রমিকদের দ্রুত ইয়ার্ডের বাইরে নেওয়া হয়নি এবং তাৎক্ষণিক অক্সিজেনের ব্যবস্থা ছিল না।
সানির বন্ধু সুবল দাস বলেন, ‘কয়েকজনকে কষ্ট করে অফিসে নিয়ে আসা হলেও সেখানে অক্সিজেন না থাকায় তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি।’ মনসুর আলীর মেয়ে রুপা আক্তারেরও অভিযোগ, ‘দুর্ঘটনার পর আহতদের প্রায় দুই ঘণ্টা ইয়ার্ডের ভেতরে রাখা হয়েছিল। দ্রুত চিকিৎসা ও অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো প্রাণহানি কমানো সম্ভব হতো।’
দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে জাহাজভাঙা শিল্প মালিক সমিতি। সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন জানিয়েছেন, নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আহতদের উন্নত চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের পরিবারকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে শিপ রিসাইক্লিংয়ে অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ এনামকে। ইয়ার্ডের মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ জানান, আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে এবং নিহতদের পরিবারকে সরকারি বিধি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে।
ক্ষতিপূরণ ও সহায়তার এসব আশ্বাসের মধ্যেও সেকান্দার আলীর পরিবারে ফিরছে না স্বস্তি। একসঙ্গে দুই সন্তান হারিয়ে বৃদ্ধ বাবার সামনে এখন শুধুই শূন্যতা। আর পলাশের সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ভূমিকার সামনে একদিকে স্বামী হারানোর শোক, অন্যদিকে অনাগত সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এখন নিহতদের স্বজনদের দাবি, ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে নিরাপত্তার ঘাটতির জন্য দায়ীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।