আজ সোমবার পূর্ণ হচ্ছে বিএনপি সরকারের ছয় মাস। এই সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে একাধিক পদক্ষেপ নিলেও পুরোপুরি আস্থা ফেরেনি। এই নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছে পুলিশের শীর্ষ কর্তারা। তারপরও খুনখারাবি ও চাঁদাবাজিসহ প্রায় সব ধরনের অপরাধ বাড়ছে। এর মধ্যে বোমাতাঙ্ক ও উগ্রবাদ নিয়ে উদ্বেগ ভোগাচ্ছে পুলিশকে। এসব ঘটনায় দু-একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে জাতিসংঘও বলেছে, আল কায়েদার মতো উগ্রবাদী সংগঠন বাংলাদেশে ‘সেল প্রতিষ্ঠা’র পাঁয়তারা করছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার। তাদের সামনে শুরুতেই বড় পরীক্ষা ছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা। জনগণের আস্থা ও নিরাপত্তার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা ছিল অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া থানা, ফাঁড়ি বা সড়কের চেকপোস্টে লাঞ্ছিত হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে সন্দেহভাজনদের পিটিয়ে হত্যার প্রবণতাও বেড়েছে।
পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) উদ্ধারের পর আশুলিয়ায় একটি চায়ের দোকান থেকে উদ্ধার হয় প্রেসার কুকার আকৃতির আইইডি। ১ আগস্ট মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের নিচে পাওয়া যায় দুটি বোমাসদৃশ বস্তু। ৩ আগস্ট বরিশালের বাকেরগঞ্জে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এতে হনুফা বেগম নামে এক নারী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। গত ১২ আগস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় একটি বাড়ি ঘিরে আরিফ নামে এক যুবককে বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার করা হয়। আরিফ ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া নব্য জেএমবির ‘শুরা সদস্য’ নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুনের’-এর শিষ্য। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মামুন কারাগার থেকে মুক্তি পান। কিছু দিন আগে মাদারীপুরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আরিফের বাসা থেকে এসিটোন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইডসহ আরও কিছু রাসায়নিক পাওয়া গেছে। যেগুলো দিয়ে টিএটিপি নামে এক ধরনের বিস্ফোরক বানানো হচ্ছিল। গত ডিসেম্বরে কেরানীগঞ্জের মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের পর আমরা একই রকম টিএটিপি পেয়েছিলাম। এক্সপ্লোসিভ হিসেবে টিএটিপি খুবই অনিরাপদ। এটা উচ্চচাপ, তাপ কিংবা শব্দেও বিস্ফোরিত হয়, এমন নজির রয়েছে।
আল কায়েদার সেল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, জাতিসংঘের উদ্বেগ : আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল কায়েদার (একিউআইএস) ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা ধীরে ধীরে আঞ্চলিক সংগঠনে রূপ নিয়েছে। তারা বড় ইউনিটের পরিবর্তে ছোট ও বিচ্ছিন্ন সেল গঠন করে রসদ সরবরাহ এবং আর্থিক নেটওয়ার্ক বিস্তারের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশেও একিউআইএসের সেল প্রতিষ্ঠার চেষ্টার কথা জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির গত ১০ ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে একিউআইএসের কর্মকা-ের উদাহরণ হিসেবে দিল্লির লাল কেল্লায় গত বছরের নভেম্বরে হামলার কথা বলা হয়েছে।
উগ্রবাদের আতঙ্ক : অল্প সময়ের ব্যবধানে বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার, বিস্ফোরণের ঘটনায় প্রাণহানি এরই মধ্যে দেশে আল কায়েদার সেল প্রতিষ্ঠার খবর ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে মুখ না খুললেও ভেতরে ভেতরে তারা বেশ উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা। কয়েক বছর ধরে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকায় স্বস্তিতে ছিলেন সাধারণ মানুষ। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ফের আতঙ্কের ছায়া ফেলেছে। সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন একটাই উগ্রবাদীরা কি ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে? অজানা শঙ্কা আর নানা প্রশ্নে নতুন করে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন সাধারণ মানুষ।
ছয় জঙ্গিসহ পলাতক ৫৩ বন্দিকে নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তা : ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে-পরে পাঁচটি কারাগার থেকে ২ হাজার ২৪৭ বন্দি পালি যায়। তাদের মধ্যে এখনো ৬৯৭ বন্দি পলাতক রয়েছেন। বিশেষ করে ছয়জন জঙ্গি, চারজন মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বিডিআর সদস্য ও ৪৩ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তসহ ৫৩ বন্দি পলাতক রয়েছেন; তাদের ঝুঁঁকিপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে কারা অধিদপ্তর। দুর্ধর্ষ এসব অপরাধী পলাতক থেকে বিভিন্ন অপরাধ করতে পারে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ হতে পারে, এমন শঙ্কা কারা অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে ছাতা বোমা, প্রেসার কুকার বোমার ঘটনায় পলাতক জঙ্গিরাই জড়িত বলে ধারণা করছে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কর্মকর্তারা।
ছয় মাসে বিএনপির ৩৮ নেতাকর্মী খুন : শুধু বোমার ঘটনায় নয়, সম্প্রতি সময়ে খুনখারাবির ঘটনায়ও ভাবিয়ে তুলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশকেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ৩৮ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ ২৪ জুলাই রাতে রাজধানীর কাফরুলে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন যুবদলের কর্মী মো. ইউসুফ আলী পারভেজ। কয়েকটি ঘটনার তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, ময়লার ঠিকাদারি, ফুটপাতের ব্যবসা, অন্যান্য ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং টিনশেড ঘরের দখল নিয়ে বিরোধ থেকেই এসব হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে।
বেড়েছে খুন-অপহরণ : পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ১ হাজার ৫৩১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৭৭৮টি। অর্থাৎ চলতি ছয় মাসে ২৪৭টি খুনের ঘটনা বেশি ঘটেছে। আবার চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫২৭টি, যা গত বছরের প্রথম ছয় মাসে ছিল ৪৭২। তবে অন্তর্বর্তী সরকার গুম নিয়ে হাঁকডাক দিলেও সে সময়ে ৪৭২টি গুমের ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম নয়।
মামলার পরিসংখ্যান : পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে দেশের থানাগুলোতে ৯৯ হাজার ৯৯২ মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। দাঙ্গার ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৩টি। হত্যার ঘটনায় ১ হাজার ৭৯১ ও দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে ৪০৮টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১১ হাজার ১৬৫টি মামলা হয়। এ ছাড়া ২৬৫টি ডাকাতি, ৯০৪ ছিনতাই, ৫১২ অপহরণ, ৪ হাজার ৮০৮ চুরি, ১ হাজার ৫৯১ সিঁধেল চুরি এবং অন্যান্য ঘটনায় ৪১ হাজার ৯২৫টি মামলা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ ভয় পুলিশে : পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশ বাহিনীতে অভ্যন্তরীণ ভয়, অস্থিতিশীলতা ও কাজের স্থবিরতা কাটেনি। বরং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং অপরাধ দমনে গতিহীনতায় জনমনে নিরাপত্তাহীনতাবোধ বিরাজ করছে। মাঠ পর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসই এখন বড় সংকটে। অন্তর্র্বর্তীকালীন মব ভায়োলেন্স (গণপিটুনি), রাজনৈতিক সহিংসতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার রেশ এখনো রয়ে গেছে। গত ছয় মাসে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক বিরোধ, পারিবারিক বিরোধ এবং গ্যাং কালচারের জেরে বেশকিছু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে সামনে এসেছে। তিনি আরও বলেন, ঢাকার পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দেয়। পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা সত্ত্বেও ছিনতাই ও চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে। এই সময়ে অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদকবিরোধী অভিযান এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে। কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। পুলিশকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করতে ভালো কাজের জন্য প্রণোদনা এবং পেশাগত গাফিলতির জন্য তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে গুজব ও অপতৎপরতা রোধে সাইবার নিরাপত্তা আইন সংস্কার এবং ডিজিটাল মনিটরিং জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুুলিশে অবসর আতঙ্ক : সরকারের প্রথম ছয় মাসে চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া এবং বিগত সরকারের সময় বিতর্কিত ভূমিকা পালনের অভিযোগে পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। অতিরিক্ত আইজিপি, ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপার ও ইন্সপেক্টরসহ প্রায় দুই শতাধিক পুলিশ সদস্যকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে পুলিশের অবসর আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে পুলিশ কর্মকর্তাদের অবসরে পাঠানোর কথা রয়েছে।