আত্মতৃপ্তির অবকাশ নেই

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩২ এএম

বর্তমান সরকার তাদের শাসনকালের ৬ মাস পূর্ণ করছে আজ। যদিও একটা সরকারের মূল্যায়নের জন্য ৬ মাস সময় খুব বেশি নয়, কিন্তু কমও তো নয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন এ সরকার তাদের শাসনকার্য পরিচালনার সূচনাতেই জনপরিসরে কিছু অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু এর কতটা তারা এ পর্যন্ত পূরণ করতে পেরেছে! বিএনপি নেতৃত্বাধীন এই সরকারের পূর্ব অধ্যায়গুলো দেশের ইতিহাসে ভিন্নতর। একটি অসাংবিধানিক অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলের পরিসমাপ্তি ঘটে নির্বাচন শেষে। যেমনটা ঘটা স্বাভাবিক তেমনটাই ঘটেছে। বুর্জোয়ারাই জিতেছেন। যারা সরকার গঠন করেছেন এবং যারা বিরোধী দলের আসনে আসীন হয়েছেন তারা কিছুদিন আগেও এক সঙ্গেই ছিলেন, রীতিমতো জোট বেঁধে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা তখন ছিল বিএনপি-জামায়াত জোটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের। আওয়ামী লীগ এখন নেই, তাই লড়াইটা বেধেছে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের ও এনসিপির। উভয়েই বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক দল একটির পরিচিতি উদারনৈতিক হিসেবে, অন্য দুটি ঘোষিতরূপেই কট্টর দক্ষিণপন্থি; তফাত ওইটুকুই। তার বাইরে উভয়েই সম্পদের ব্যক্তিমালিকানার তথা পুঁজিবাদেরই সমর্থক এবং সামাজিক মালিকানার ঘোরতর বিরোধী। এক কথায় বলতে গেলে, উভয়েই পুঁজিবাদী উন্নয়নের আদর্শে দীক্ষিত, যে কারণে তাদের পক্ষে জোট বাঁধা কোনো বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল না।

বিগত ৬ মাসে দেশের মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে, এ কথা বলার অবকাশ মনে হয় নেই। গ্যাস, বিদ্যুৎ নিয়ে দেশব্যাপী সংকট বিরাজ করছে। সিএনজি গ্যাসের সংকটে পরিবহনব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ার দশা। গ্যাস সংকটে আবাসিকে ভোক্তার অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি, অন্যদিকে শিল্পকারখানায় উৎপাদনে লেগেছে অভিঘাত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে ভালো নয় তাও দৃশ্যমান সত্য। খুন, ধর্ষণ, নারী-শিশু নির্যাতনের খবর প্রায়ই থাকছে সংবাদ মাধ্যমে। ১৬ আগস্ট দেশ রূপান্তরের দুটি সচিত্র প্রতিবেদনে দেখা গেল, ফের সেই ‘মব’-এর চিত্র। একটি ঘটনা ঢাকায় ঘটেছে পুলিশের সামনেই। অন্যটি আরও ভয়াবহ। প্রধান শিক্ষককে হাত-পা ভেঙে বেঁধে রাখা হয় স্কুল গেটে। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতার নেতৃত্বে ‘মব’ সৃষ্টি করে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার আমতলী ফেদু শেখ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমানকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে স্কুলের গেটে বেঁধে রাখার ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে দৌলতপুর থানা-পুলিশ তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করেছে। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাত প্রশ্ন তুলেছে, আবারও কি ফিরছে সেই পরিস্থিতি? বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হেনস্তার ঘটনাও ঘটেছে। বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হচ্ছে কিন্তু বিনিয়োগ-খরা কাটছে না। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলছে। প্রার্থী দুজন হলেও পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন তা গাণিতিক হিসাবে অস্পষ্ট নয়। শোনা যাচ্ছে মন্ত্রিপরিষদেও আসছে রদবদল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যবস্থা বদলের কতটা কী হলো? পুরনো ব্যবস্থা জিইয়ে রেখে কাক্সিক্ষত দেশ গঠন কতটা সম্ভব? নির্বাচিত সরকারের কাছে দেশবাসীর অনেক প্রত্যাশা নিশ্চয়ই ছিল, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গত ৬ মাসে কাক্সিক্ষত প্রত্যাশা অধরাই রয়ে গেছে। গ্যাস-বিদ্যুতের দাবিতে বামপন্থিরা ইতিমধ্যে মাঠে নেমেছেন।

আগেও বলেছি এবং আবারও বলি, জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্ররা যে একটি রাজনৈতিক দল গঠনে উদ্যোগী হবে সেটা তাদের আচরণই বলে দিচ্ছিল। সেটি তারা গঠন করেছেও। জাতীয় সংসদে তারা প্রতিনিধিত্বও করছে। তাদের আওয়াজ ছিল নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কায়েম করার, রাষ্ট্রব্যবস্থায় এমন সব সংস্কার আনার, যেগুলো হবে রীতিমতো বৈপ্লবিক। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল তাদের আস্ফালিত বন্দোবস্তটা দাঁড়িয়েছে অতি পুরনো জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধা এবং তাদের সংস্কারসূচি যে জামায়াতের অনুমোদনের বাইরে যাবে না সেটাও স্বচ্ছ পানির মতোই পরিষ্কার। দৃশ্যত সরকারের দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে তাদের সঙ্গে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ফের অস্থিরতার ইঙ্গিতও মিলছে। চব্বিশের আগস্ট মাসের পাঁচ তারিখে একটি সরকারের পতনে তাৎক্ষণিকভাবে যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল সমাজ-পরিবর্তনে বিশ্বাসীদের কর্তব্য ছিল সেটি পূরণ করে বুর্জোয়াদের বিকল্প শক্তি হিসেবে দৃশ্যমান হওয়া এবং দেশবাসীকে আশা দেওয়া যে, সত্যিকারের পরিবর্তন সদ্য সদ্য না ঘটলেও আগামীকাল ঘটবে। ওই কাজের জন্য আবশ্যক ছিল একটি সমাজ বিপ্লবী যুক্তফ্রন্ট গঠন। অনেক দেরিতে হলেও শেষ পর্যন্ত একটি যুক্তফ্রন্ট গঠনে তারা সম্মত হলেন ঠিকই, কিন্তু দেখা গেল সেটি বিপ্লবী আন্দোলনের যুক্তফ্রন্ট না হয়ে রূপ নিয়েছে নির্বাচনী জোটে। তারা তৎপর হলেন বুর্জোয়াদের সঙ্গে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।

কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাচন যে বুর্জোয়াদের ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াই ছাড়া অন্যকিছু নয় এবং সেখানে যে বুর্জোয়া ভিন্ন অন্য কারও প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ সেই স্থূল বাস্তবতাটাকে বোঝার মতো বিবেচনার অভাবের কারণে কিনা জানি না। বামপন্থি জোটের শরিকরা নিজ নিজ পরিচয়ে নির্বাচন-যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে জামানত হারানো তো সামান্য ব্যাপার, এমন করুণ সংখ্যক ভোট পেলেন যেটার গুরুভারে তারা নিজেরাই এখন বিব্রত; হয়তো লজ্জিতও, নিজেদের কাছেই। সমাজতন্ত্রীরা বুর্জোয়াদের চেয়েও অধিক তীক্ষè বুদ্ধির অধিকারী হবেন এটাই প্রত্যাশিত। নির্বুদ্ধিতা আর যাদেরই সাজুক সমাজতন্ত্রীদের সাজে না। নির্বাচনের পরে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী একটি জোট যে তারা শেষমেশ গঠন করেছেন সে জন্য তাদের অভিনন্দন এবং সামনে যেহেতু কোনো সংসদীয় নির্বাচন নেই তাই তারা আন্দোলনেই থাকবেন এমনটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সামাজিক বিপ্লব সম্ভব নয়, এটা তো ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত এবং এখন বিশ্বজুড়ে সত্য বলে প্রতিভাত। এমনকি অভ্যুত্থানও যে বিপ্লবী চরিত্র গ্রহণ করবে না, যদি না লক্ষ্যটা হয় সমাজবিপ্লব এটাও তো খুবই মোটা দাগের একটি সত্য।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল যে ভৌগোলিক সীমান্তে পরীক্ষিত হয় তা তো নয়, প্রতিনিয়ত তার পরীক্ষা চলে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনাতেও। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যে অত্যন্ত অসম বাণিজ্য চুক্তিটি স্বাক্ষর করে রেখে গেছে অন্য অনেক ক্ষতির সঙ্গে সেটি যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপরও হস্তক্ষেপ করবে সেটা মোটেই অপরিষ্কার নয়। প্রতিবাদ হচ্ছে, বামপন্থিরা করছেন, দেশপ্রেমিক সংগঠনগুলোও করছে, কিন্তু এ ব্যাপারে জাতীয় সংসদে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। সরকারি দল নিশ্চুপ, বিরোধী দলও সাড়া-শব্দহীন। প্রতিবাদ তো নয়ই, এমনকি বৈদেশিক চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ সংসদে উপস্থাপনের যে সাংবিধানিক আবশ্যিকতা রয়েছে সেটি মান্য করার দাবিটুকুও সংসদীয় দুই মহলের কোনোটির পক্ষ থেকেই তোলা হয়নি। তাতে সেই প্রমাণিত সত্যটিরই নবতর পরিচয় পাওয়া যায় যে, দুপক্ষের ভেতর আত্মীয়তাটা অতিঘনিষ্ঠ ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের এবং তাদের যে ঝগড়া সেটাও ভ্রাতৃকলহের অধিক কিছু নয়। বাণিজ্য চুক্তিতে বাণিজ্যের কথাই বলা হয়েছে, কিন্তু অসম বাণিজ্য যে কী বস্তু সেটা তো আমরা উপমহাদেশের মানুষরা ইংরেজ বণিকদের আগমনের পরেই টের পেয়েছিলাম। চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ব্যবস্থাপনাও বিদেশি অপারেটরদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। শুধু তাই নয়, কর্ণফুলী নদীর ধারে একটি বিদেশি কোম্পানিকে অনুমতিও দেওয়া হয়েছে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি টার্মিনাল নির্মাণের। চুপিসারে কাজ এগোচ্ছেও। বন্দর আমাদের, কিন্তু তার ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের; স্বাধীন বাংলাদেশে এমন ব্যবস্থার কথাও শেষ পর্যন্ত আমাদের শুনতে হচ্ছে; কেবল শুনতে নয়, দেখতেও হবে, যদি না প্রতিরোধ সফল হয়। প্রতিবাদ বামপন্থি সংগঠনগুলো করছে, কিন্তু প্রকৃত প্রতিরোধের সুযোগটা রয়েছে বন্দরের শ্রমিক ও কর্মচারীদের এবং স্থানীয় মানুষদের হাতেই। তারা তৎপর রয়েছেন জানি, কিন্তু প্রতিরোধের কাজকে আরও শক্তিশালী করাটা যে অত্যাবশ্যক সেটা অস্বীকার করবে কে?

প্রধান সামুদ্রিক বন্দরে বিদেশি ব্যবস্থাপনা, প্রধান বিমানবন্দরের রাজস্ব বিদেশিদের পকেটে অসম বাণিজ্যচুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করলে এসব সংবাদে আহ্লাদিত হওয়ার কোনো কারণ থাকে না। জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ার অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি বিগত রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সব সরকারের শাসনামলেই কমবেশি শুনেছি, কিন্তু কাক্সিক্ষত মাত্রায় তা দৃশ্যমান হয়নি। এর পুনরাবৃত্তি প্রত্যাশিত নয়। কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে উপনিবেশবাদী পুরনো রাষ্ট্রটিকে ভেঙে প্রকৃত অর্থে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং পুরনো সমাজকে বদলে ফেলে নতুন এক সমাজ প্রতিষ্ঠার; উপলব্ধি ছিল প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন হবে ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গাতে সামাজিক মালিকানা কায়েমের। সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। গ্যাস-বিদ্যুৎ-জননিরাপত্তাসহ সংকটের খতিয়ানে আরও কিছু বিষয় যুক্ত আছে যেগুলোর সঙ্গে জনস্বার্থের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। যেকোনো সরকারের গুরুদায়িত্ব জনঅধিকারের পথ মসৃণ করা। জনগণের কাছে নির্বাচিত সরকারের জবাবদিহির দায় আরও বেশি। সরকারের আত্মতৃপ্তিতে ভোগার অবকাশ নেই। কাজের মধ্য দিয়ে তাদের প্রমাণ করতে হবে, ব্যবস্থা বদলানোর পথ সুগম করে সমাজ পরিবর্তনে তারা প্রতিজ্ঞ। শুধু সংস্কারে কুলাবে না, ব্যবস্থার বদল ঘটাতে হবে। তা না হলে সবই পর্যবসিত হবে দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতায়।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত