স্বাস্থ্যের নতুন উদ্যোগ হামের মৃত্যুতে ম্লান

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০২:১০ এএম

দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসে স্বাস্থ্য খাতে বেশ কিছু নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার। যেগুলো বাস্তবায়ন হলে মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ সময়ের মধ্যে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে হাম পরিস্থিতি মোকবিলার ক্ষেত্রে। সরকারের নতুন নতুন উদ্যোগ কিছুটা হলেও মøান করেছে হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর পরিস্থিতি।

স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে সীমাহীন দুর্নীতিতে স্বাস্থ্য খাতে ধস নামে। হাসপাতালে গিয়েও রোগীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হতো। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরও বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে পড়ে। স্বাস্থ্য খাতের দেখভালের দায়িত্ব যাদের দেওয়া হয়েছিল তাদের দক্ষতা ও দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেই ১৭ বছরের মৃতপ্রায় খাতকে সচল করতে গিয়েই বড় বড় চ্যালেঞ্জে মুখে পড়ছে বিএনপি সরকার।

শুরুতেই স্বাস্থ্য খাতকে হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসাব্যবস্থা থেকে মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সরকার স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধি ও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তরের ঘোষণা, নগরস্বাস্থ্য ব্যবস্থা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে আসা, জেলা হাসপাতালে ৫০ শয্যার ডায়ালাইসি সেন্টার, স্পেশাল বিসিএসের মাধ্যমে আরও ৫ হাজার ডাক্তার নিয়োগ, ১ হাজারের মতো নার্স নিয়োগসহ বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

স্বাস্থ্য খাতে গতি আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সভা করেছেন। সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার গতি ও জবাবদিহিতা বাড়াতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীও আকস্মিক হাসপাতাল পরিদর্শন করছেন। অসঙ্গতি চোখে পড়লেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন।

দায়িত্ব নেওয়া পর সরকার প্রথম চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ে। সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করে। টিকা গ্রহীতার বয়স ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাসে নির্ধারণ করা হয়। টিকা সংগ্রহ করে এক মাসের মধ্যে দুই কোটির বেশি শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করে। কিন্তু তাতেও হাম পরিস্থিতির চোখে পড়ার মতো উন্নতি হয়নি। চলতি বছরে ১৫ মার্চ থেকে ১৬ আগস্ট এই ৫ মাসে ৯০৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম ও হামজনিত রোগে। সন্দেহজনক হামের রোগী পাওয়া গেছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৭৯৭ জন। হাম শনাক্ত হয়েছে ১৭ হাজার ৮৮০ জনের। হামের পরিস্থিতি গুরুতর পর্যায়ে যাওয়া এবং বিপুল মৃত্যুর জন্য কারও অবহেলা দায়ী কি না তা চিহ্নিত করার দাবি উঠলেও কোনো উদ্যোগ না নেওয়ার বিষয়টি এই সময়ে সমালোচিত হয়েছে। হাম পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এমএ মুহিত বলেন, ‘হাম পরিস্থিতি আমরা তৈরি করিনি; কিন্তু তার ভার আমাদের বহন করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। ২০২০ সালের পরে এ নিয়ে ক্যাম্পেইন হয়নি। বিগত সরকারের সময়ে টিকার ক্ষেত্রে চরম অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে হাম ছড়িয়ে পড়ে। আমরা স্বল্প সময়ের মধ্যে ভ্যাকসিন জোগাড় করে এক মাসের মধ্যে সারা দেশে দুই কোটির ওপরে শিশুকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনতে পেরেছি। এটা বিশ্বে একটা বিরল দৃষ্টান্ত। তবে হাম অতি সংক্রমনী, এটা নিয়ন্ত্রণে আসতে একটু সময় লাগে।’

গত ছয় মাসের মধ্যে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ছিল সরকারের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালটির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, লাইসেন্স বাতিল করে দেন। পরে সব শর্ত পূরণ করে আবার হাসপাতাল চালানো অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যা ছিল বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জন্য একটি বড় বার্তা।

বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর আগে বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশের নিচে থাকত। এবার সরকার তা ১ শতাংশের বেশি করেছে। নগর স্বাস্থ্য পরিচালিত করত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মাধ্যমে। এ রকম ১৯২টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে আসা হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। গত মাস থেকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে। ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৩ হাজার ১৭৩ জন। মৃত্যু হয়েছে ৬৭ জনের। যদিও গত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যু এখন পর্যন্ত কিছুটা কম। গত বছর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয় ২৫ হাজার ৭১০ জন। মৃত্যু হয় ১০৪ জনের। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, এ ব্যাপারে সরকার সজাগ রয়েছে। দেড় মাস আগে থেকেই কাজ শুরু হয়েছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতিও আগের চেয়ে অনেক ভালো।

সরকারের প্রথম ছয় মাসের সাফল্য-ব্যর্থতা সম্পর্কে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘সরকার যখন দায়িত্বে আসে তখন হামের প্রকোপ শুরু হয়েছে। সরকার খুব দ্রুত হামের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। যাতে দ্রুত সারা দেশে অন্তত একটি অংশে তারা সফলভাবে টিকা দিতে পারে। এটি একটি সাফল্য। কিন্তু একই সঙ্গে যে পরিমাণ টিকাদানের ব্যাপার ছিল সেক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে একটু ঘাটতি ছিল। যে কারণে এখনো হামে আক্রান্ত হচ্ছে। অন্যদিকে আবার ডেঙ্গুর প্রকোপ চলছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য সারা দেশে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সরকার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কার্যকর এবং জনসাধারণকে যুক্ত করে কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে আমরা দেখিনি।’

তিনি বলেন, ‘প্রতি উপজেলায় ১৫০ শয্যার হাসপাতাল করার একটা পরিকল্পনা করেছে। এটি ভালো। কিন্তু বেড বাড়ালেই তো আর চিকিৎসা হয় না। বেডের সঙ্গে চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ওষুধ সরবরাহ, পরীক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার। জেলাগুলোতে শিশুদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা এটি একটি ভালো দিক। সব কিছু মিলে ছয় মাস তো অনেক বেশি সময় নয়, এর মধ্যে আমরা ইতিবাচক, ঘাটতি বা সীমাবদ্ধতা দেখছি। তবে এই ধারায় চললে স্বাস্থ্য খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করা যায়।’

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারপ্রধান আন্তরিক। তিনি চান সবাই যেন সহজে সেবা পান। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের যে অবস্থা, তা উত্তোরণে সবার আগে একটা সার্ভে দরকার। আমাদের কোথায় কী ঘাটতি আছে, সেগুলো চিহ্নিত করা। আমাদের অবকাঠামো ভালো আছে। এখন দরকার যথাযথ ব্যবস্থাপনা। কিন্তু যখন নিউজ দেখি খুবই হতাশ হই। আমি আশাবাদী প্রধানমন্ত্রী যেভাবে চেষ্টা করছেন, আমরা সবাই তার সঙ্গে কাজ করলে এই অবস্থা উত্তরণে বেশি সময় লাগবে না।’

গত ছয় মাসে সরকারের সাফল্য সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এমএ মুহিত বলেন, এই সেক্টরের জন্য যেকোনো চেঞ্জ আনা একটু সময়সাপেক্ষ এবং কঠিন। তবে ছয় মাস হিসেবে আমি মনে করি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যথেষ্ট পরিমাণ কাজ হয়েছে। বিশেষ করে বিগত ৫-১০ বছরে এমন অব্যবস্থাপনা-অবহেলায় স্বাস্থ্য সেক্টর ভগ্নদশা হয়। আমাদের ছয় মাসে প্রথম এবং সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষায়িত চিকিৎসা, প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসা, ডাক্তারদের পদায়ন সবদিকে আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত