সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গা

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫৭ এএম

কক্সাবাজার শরণার্থী ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ক্যাম্পের নির্দিষ্ট গণ্ডি পেরিয়ে এদের একটি বড় অংশ মিশে যাচ্ছে মূলধারার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। নির্মাণশ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাচালক ও জেলে হিসেবে পরিচয়ে সহজেই স্থানীয় শ্রমবাজারে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। অনেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও চাকরি করছেন। অসাধু জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সহজেই তৈরি করে ফেলছে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট।

এদিকে বিভিন্ন অপরাধে রোহিঙ্গাদের নাম আসছে। তাছাড়া তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা নিয়েও সমস্যায় পড়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। সম্প্রতি পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট রোহিঙ্গাদের নিয়ে গোপন নোট পাঠিয়েছে সরকারের নীতিনির্ধারদের কাছে। তাদের লাগাম টানতে না পারলে সামনে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে খাদ্য সহায়তা হ্রাস পাওয়া, দলগত কোন্দল ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতার কারণে অনেকে জীবিকার খোঁজে গোপনে ক্যাম্প ছেড়ে বের হয়ে যাচ্ছে। মানব পাচারকারী সিন্ডিকেটের সহায়তায় ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার শহর, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, নোয়াখালী, সিলেট, গাজীপুর ও ঢাকায়ও তারা ছড়িয়ে পড়েছে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। প্রাণভয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার শিবিরগুলোতে তারা বসবাস করছে। তাদের ভালো পরিবেশে রাখতে নোয়াখালীর ভাসানচরে একটি আবাসন পল্লীতেও রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তারা আধিপত্য ও মাদক কারবার নিয়ে খুনাখুনিতেও লিপ্ত হচ্ছে। এদিকে রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরত নিতে বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক মহল চাপ দিচ্ছে মিয়ানমারকে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে টালবাহানা করছে মিয়ানমার।

এনআইডি ও পাসপোর্ট জালিয়াতি : রোহিঙ্গারা স্থানীয় কিছু অসাধু জনপ্রতিনিধি, দালাল ও স্থানীয় নির্বাচন কমিশন অফিসের কিছু কর্মচারীর যোগসাজশে ভুয়া জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট বানিয়ে নিচ্ছে। ভুয়া জন্মনিবন্ধন এবং অন্যের অভিভাবকত্ব দেখিয়ে তারা জাতীয় পরিচয়পত্রও সংগ্রহ করছে। বাংলাদেশি এনআইডি ও পাসপোর্ট হাতিয়ে নিয়ে অনেক রোহিঙ্গা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। বিদেশে কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার দায় পড়ছে বাংলাদেশের ওপর, যা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে। কক্সবাজার জেলা রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৯৮২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত গত ৪৪ বছরে যারা এসেছে তাদের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা এনআইডি সংগ্রহ করেছে বলে আমরা অনেকটা নিশ্চিত হয়েছি। সৌদি আরব, দুবাই, মালয়েশিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে লাখখানেক রোহিঙ্গার হাতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট রয়েছে। আমি সৌদি আরবে গিয়ে অন্তত ২০ হাজার রোহিঙ্গার কাছে বাংলাদেশি পাসপোর্টের তথ্য পেয়েছি।’ তিনি বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পাসপোর্ট অফিসের অসাধু কর্মকর্তা ও একটি দালালচক্র এই অপকর্ম করে যাচ্ছে। চক্রটি রোহিঙ্গাদের ভোটার হতেও সহযোগিতা করছে। এনআইডি পেয়েছে এমন অনেক রোহিঙ্গাকে আমরা চিহ্নিত করেছি। তাদের এনআইডি বাতিল করতে জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করেছি। কিন্ত এখনো বাতিল করা হয়নি।’

ক্যাম্পের বাইরে চলে যাওয়ার তথ্য : পুলিশের তথ্যানুযায়ী ২ নম্বর ক্যাম্পে কমান্ডার মৌলবি আয়াছ, কলিমউল্লাহ, জাহিদ হোসেন, মোহাম্মদ ফরিদ, ইউসুফ, জামাল, আরমান, বাইল্লা, ক্যাম্প ফরিদ, মোহাম্মদ মুছা, সানাউল্লাহ, সালাম, জাহিদ হোসেন, ফরিদ, ইউছুফ, জামাল, সলিম উল্লাহ, মৌলবি সামছু, ৪ নম্বর ক্যাম্পে আরমান, আব্দুল মালেক, আব্দুল হালিম, মাস্টার সাইফ উদ্দিন, ১৭ নম্বর ক্যাম্পে সিরাজ, এনাম মাস্টার, হোসেন, ইলিয়াছ, নুর, সালাম, হাসিম মৌলবি হামিদ হোছন, নূর বশর, সেলিম, মাস্টার ফারুক, মাঝি আব্দুর ছবি, হাফেজ আয়াছ, লতিফ আলী, মাঝি সাইফুল্লাহ, ওসমান, হবির আহম্মদ, আইয়ূব, মোহাম্মাদ রফিক, ৭ নম্বর ক্যাম্পে আব্দুল মাবুদ, আইয়াছ উদ্দিন, হাফেজ, কেফায়েত উল্লাহ, হয়দার ল্যাংড়া হায়দার, ৫ নম্বর ক্যাম্পে ভুট্টু আব্দুল্লাহ, ওস্তাদ খালেক মাস্টার এনাম, হাবিবুল্লাহ, শাহ আলম, কালামিয়া, মৌলবি হোসেন আহাম্মেদ, মৌলবি নুরুল আমিন, নুর সাফা, লিয়াকত আলী, এহসান উল্লাহ, মাস্টার মুন্না, শামসুল আলম, জাফর, মুছা, জাবেদ, মাস্টার দিল মোহাম্মদ, নবী হোসেন, নুরুল আমিন, সৈয়দুল ইসলাম, নুরুল আমিন, নুর কামাল প্রমুখ ক্যাম্প ছেড়ে চলে গেছে। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক থানায় অভিযোগ আছে।

পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিনই রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে গিয়ে অপরাধ করছে। রোহিঙ্গাদের বিশাল একটি অংশ জেলাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের অনেকেই খুন, অপহরণ, মাদকসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত আছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা আছে, সেগুলো নিয়ে আমরা কিছুটা বেকায়দায় আছি। তারপরও দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ছদ্মবেশে নানা অপকর্মের জাল : ক্যাম্পের বাইরে এসে পরিচয় গোপন করা রোহিঙ্গাদের প্রধান কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় ভাষার সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষার মিল থাকায় সহজেই তারা নিজেদের স্থানীয় বাসিন্দা বলে পরিচয় দিতে পারছে। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তারা দেশের ভেতরে ইয়াবা ও অবৈধ অস্ত্রের চালান সরবরাহে বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নিজেদের স্বজনদের বিদেশে পাঠানোর নামে তারা আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অপকর্মের বিস্তার ঘটাচ্ছে। অনেকেই নাম ও পরিচয় পরিবর্তন করে স্থানীয় বৈবাহিক সূত্রে বা ভুয়া অভিভাবক দেখিয়ে নিজেদের বাংলাদেশি পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। গত ৯ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অন্তত ৩শ জনের মতো খুন হয়েছে। ক্যাম্পে থাকা ১০টির বেশি সশস্ত্র ও অপরাধীচক্র সক্রিয় রয়েছে। যারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত। অস্ত্র-মাদক কারবার, অপহরণ, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি দিন দিন বেড়েই চলছে। অপরাধ দমনে পুলিশ ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন নিয়মিত অভিযান চালালেও ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

জনপদে আতঙ্ক : রোহিঙ্গারা যখন কোনো লোকালয়ে স্থায়ী বা অস্থায়ী বসতি গড়ে তুলছে, তখন স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তা ও সামাজিক সংকট তৈরি হচ্ছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদক চোরাচালানের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অনেক রোহিঙ্গা জড়িয়ে পড়ছে। দলবদ্ধ হয়ে বসবাসের কারণে অনেক সময় স্থানীয়দের সঙ্গে সহিংস সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতিতে বনভূমি উজাড়, পরিবেশ ধ্বংস, শ্রমবাজারে মজুরি কমে যাওয়া ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত