এ বছরের দোসরা মে-এর ঘটনা। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষ প্রাণীচিকিৎসার ছাত্র-ছাত্রীদের বন্যপ্রাণী প্রজনন ও রোগচিকিৎসা বিষয়ে ব্যবহারিক পাঠদানের জন্য মিরপুরস্থ বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানায় এসেছি। প্রাণীচিকিৎসা হাসপাতাল পরিদর্শন, কর্তব্যরত চিকিৎসকের দীর্ঘ বক্তব্য শ্রবণ ও পুষ্টি বিভাগের কর্মকা- পর্যবেক্ষণের পর ছাত্র-ছাত্রীদের বিভিন্ন প্রাণীর সঙ্গে পরিচয় করাতে নিয়ে গেলাম। প্রথমইে গেলাম পক্ষীশালায়। এরপর একে একে বাঘ, সিংহ ও হরিণশালা হয়ে কুমির ও ঘড়িয়াল দেখতে গেলাম। চিড়িয়াখানার বিশাল লেকে বসে থাকা শে^ত গগনবেড়ের সঙ্গে পরিচয় করাতেও কার্পণ্য করলাম না। পরের চল্লিশ মিনিট বানর ও বানরজাতীয় প্রাণী, সাপ ও ময়ুর দেখলাম। এরপর গেলাম জলহস্তিশালার সামনে।
বেশিরভাগ জলহস্তিই পানিতে ছিল। অল্প কয়েকটি ডাঙায় খাচ্ছিল। প্রতিবারের মতো এবারও বেস্টনির পাশে দাঁড়িয়ে পানিতে থাকা জলহস্তিগুলোর কিছু ছবি তুললাম। ওদের ছবি তুলে ডাঙার দিকে তাকাতেই বুনো পায়রা ও তিলাঘুঘুর সঙ্গে বালু-বাদামি রঙের অন্য এক প্রজাতির ঘুঘুকে ব্যস্তভাবে কিছু একটা খুঁটে খেতে দেখলাম। চিড়িয়াখানার প্রায় প্রতিটি বেস্টনিঘেরা স্তন্যপায়ী প্রাণী রাখার জায়গাগুলোতে নিয়মিত বুনো পাখি, বিশেষ করে কবুতর, ঘুঘু, শালিক ও কাক দেখা যায়। এ ছাড়া কাঠবিড়ালি ও বেজিও চোখে পড়ে। এরা মূলত খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ খেতে আসে। তবে পায়রা ও তিলাঘুঘু নিয়মিত দেখলেও বালু-বাদামি রঙের ঘুঘুটিকে এবারই প্রথম দেখলাম।
প্রাকৃতিক পরিবেশে এই পাখিটির প্রথম ছবি তুলি ২০১১ সালের অক্টোবরে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। পঞ্চগড়ের বিভিন্ন স্থানে ওরা আছে বেশ, এমনকি ওরা তিলাঘুঘুর থেকেও বেশি। পরের বছর দেখলাম ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। এরপর পাখিটির সঙ্গে বহুবার দেখা হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে, এমনকি ঢাকার কেরানীগঞ্জেও। সুন্দরবনেও ওরা আছে বেশ।
জাতীয় চিড়িয়াখানায় দেখা বালু-বাদামি ঘুঘুটি এদেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি ধবল ঘুঘু। মালা ঘুঘু, ধইলে ঘুঘু, কণ্ঠি ঘুঘু বা পাড় ঘুঘু (পশ্চিমবঙ্গ) নামেও পরিচিত। তবে পঞ্চগড়ের মানুষের মুখে ওর নাম নোদা ঘুঘু। ইংরেজি নাম ঊঁৎধংরধহ ঈড়ষষধৎবফ উড়াব বা ঈড়ষষধৎবফ উড়াব। বৈজ্ঞানিক নাম ঝঃৎবঢ়ঃড়ঢ়বষরধ ফবপধড়পঃড়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, কোরিয়া, জাপান, চীন প্রভৃতি দেশে ঘুঘুটিকে দেখা যায়।
ধবল ঘুঘুর দেহের গড় দৈর্ঘ্য ৩২ সেন্টিমিটার ও ওজন ১২৫-২৪০ গ্রাম। প্রথম দর্শনে লাল ঘুঘুর মতো মনে হলেও রঙটা আরও হালকা ও আকারে বেশ বড় হয়। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের ওপরটা বালু-বাদামি ও নিচটা হালকা গোলাপি-ধূসর। ঘাড়ে অর্ধচন্দ্রাকৃতির একটি কণ্ঠহার থাকে। পেট ও তলপেট ছাই-ধূসর। ডানার পেছনের পালক কালচে ও নিচটা সাদা। লেজতল গাঢ় ধূসর ও লেজের শেষাংশ সাদাসহ পট্টি কালচে। চোখ গাঢ় লাল। ঠোঁট বাদামি-কালো। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল গাঢ় গোলাপি। নখ কালো। পায়রা-পায়রি দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্কগুলোর পালকে হলদে আভা থাকে। তবে ঘাড়ে কোনো কণ্ঠহার থাকে না।
এদেরকে খোলা মাঠ, গ্রাম বা আশপাশে বড় বড় গাছ আছে এমন কৃষিজমি, শুষ্ক পাতাঝরা বনের প্রান্ত ও বাদা বনে দেখা যায়। সাধারণত একাকী, জোড়ায় বা ছোট দলে বিচরণ করে। চষাজমি, ঘেসো মাঠ বা বনের প্রান্তে হেঁটে হেঁটে আগাছার বীচি ও শস্যদানা খায়। পায়রা মনের আনন্দে ‘কুককুউ-কুককুউ-কুক ---’ শব্দে ডাকে। ভয় পেলে পায়রা-পায়রি উভয়েই ‘কুঁ-কুঁ-কুঁ ---’ শব্দ করে।
ফেব্রুয়ারি থেকে মে প্রজননকাল হলেও সারা বছরই ছানা তুলতে দেখা যায়। প্রধানত ছোট আকারের গাছ ও ঝোপঝাড়ে কাঠিকুটি দিয়ে অন্য ঘুঘুর মতোই ঢিলেঢালা বাসা বানায়। বাসা বানানো, ডিমে তা দেওয়া ও ছানাদের লালনপালনের কাজ পায়রা-পায়রি মিলেমিশে করে। পায়রি সাদা রঙের দুটি ডিম পাড়ে যা ১৪-১৮ দিনে ফোটে। ছানারা ১৫-১৯ দিনে উড়তে শিখে। আয়ুষ্কাল পাঁচ থেকে ছয় বছর।
দেখতে বেশ সুন্দর হওয়ায় পোষাপাখির ব্যবসায়ীদের নজরে পড়েছে ওরা। ঘুঘু শিকারিদের বদৌলতে সহজেই বিভিন্ন পোষাপাখির দোকানে, বিশেষ করে ঢাকার কাঁটাবনে, চলে আসছে। কাজেই পোষাপাখির ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ওদের রক্ষা করতে না পারলে ওরাও হুমকির মুখে পড়বে।
লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ।