র‌্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠন বিল সংসদে উত্থাপন

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২১ এএম

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন-২০২৬’ নামের ওই বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন। শুরুতে বিল উত্থাপনের আপত্তি জানালেও পরে সমঝোতার ভিত্তিতে একমত পোষণ করেন বিরোধী দল। পরে বিলটি উত্থাপিত হলে তা অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। কমিটিকে যাচাই-বাছাই শেষ করে আগামী চার দিনের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আইন কার্যকর হলে র‌্যাব গঠনসংক্রান্ত বিধান রহিত হবে।

উত্থাপিত বিলে বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগে স্বচ্ছতা, তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

বিলের বিধান অনুযায়ী, পুলিশের আওতায় এসআরবি নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ বাহিনী, শৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্ধারিত সংখ্যক কর্মকর্তা ও সদস্যকে পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এ ইউনিট গঠন করা হবে। এর সদর দপ্তর থাকবে ঢাকায়। এসআরবির একজন মহাপরিচালক থাকবেন। বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক বা তার ঊর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সরকার তাকে নিয়োগ দেবে। মহাপরিচালক ইউনিটের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অপারেশনাল ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।

বিলে এসআরবির দায়িত্বের মধ্যে জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং মাদক, সাইবার অপরাধ, গুম ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানব পাচার ও অপহরণসহ মানবতাবিরোধী কর্মকা-ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে ইউনিটটি। আইনশৃঙ্খলা-সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তাও করবে। আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত করতে পারবে এসআরবি।

প্রস্তাবিত আইনে এসআরবিকে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত অন্যান্য আইন অনুসরণ করে প্রয়োগ করতে হবে। পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিচে নন এমন এসআরবি কর্মকর্তা তদন্তকারী কর্মকর্তার আইনগত ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রয়োগ করতে পারবেন। তবে কাউকে গ্রেপ্তার বা কোনো আলামত জব্দ করার পর তা এসআরবির হেফাজতে রাখা যাবে না। অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে বা জব্দ করা আলামত নিকটস্থ থানার হেফাজতে দিতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদনও দিতে হবে।

বিলে এসআরবি সদস্যদের কর্তব্যে অবহেলা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আইনসংগত আদেশ অমান্য, দায়িত্ব পালনকালে নেশাগ্রস্ত থাকা, সহকর্মীর সঙ্গে অসদাচরণ, অস্ত্র বা সরঞ্জাম হারানো, অবৈধভাবে অর্থ আদায়, জমি দখল, অপরাধীকে আটক করতে ব্যর্থ হওয়া এবং জুয়া বা অবৈধ মাদকের সঙ্গে জড়িত হওয়াকে শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এসব অপরাধে বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অব্যাহতি, পদাবনতি, পদোন্নতি স্থগিত এবং বেতন-ভাতা বা জ্যেষ্ঠতা বাজেয়াপ্তের মতো গুরুদ-ের বিধান রাখা হয়েছে। লঘুদ- হিসেবে জরিমানা, তিরস্কার এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আটক বা শাস্তিমূলক ড্রিলের বিধান রয়েছে। তবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনো সদস্যকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। বিভাগীয় আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগও রাখা হয়েছে বিলে।

প্রস্তাবিত আইনে এসআরবি সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিষ্পত্তির জন্য ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিনিধির পাশাপাশি বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং মানবাধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তিকে রাখার কথা বলা হয়েছে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ-সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অপরাধের ধরন পরিবর্তন এবং জাতীয় ও জননিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল একটি আধুনিক বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। সেই প্রয়োজনের তাগিদে এবং আইনের শাসন, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা, তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেই এসআরবি পরিচালনার লক্ষ্য নিয়ে বিলটি আনা হয়েছে।

বিলটি উত্থাপনের সময় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ও চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বিরোধিতা করেন। নাহিদ ইসলাম বলেন, র‌্যাব ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আয়নাঘর ইত্যাদি কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল র‌্যাব বিলুপ্ত করা হবে। বিএনপিও বলেছিল। তারা র‌্যাবের মতো আরেকটি প্রতিষ্ঠান করার কথা বলেনি। এখন নতুন মোড়কে র‌্যাব পুনর্গঠন করা হচ্ছে। ফ্যাসিবাদের চিহ্ন হচ্ছে র‌্যাব। এটা বিলুপ্ত করা হোক। বিশেষায়িত ইউনিট করতে হলে আগে সংসদে বিশদ আলোচনা করা হোক।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি যদি তখন উপদেষ্টা পরিষদে এ প্রস্তাবটি করতেন তাহলে খুশি হতেন। কিন্তু ১৮ মাসে একবারও সেটা মনে হয়নি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের প্রধান ছিলেন কুখ্যাত বেনজীর। সেজন্য কি পুলিশ বিলুপ্ত করে দেব? তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল র‌্যাব নামে কোনো সংগঠন থাকবে না। সেটা বিলুপ্ত করা হচ্ছে। কিন্তু পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট দরকার।

তখন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা র‌্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাব সমর্থন করেন। এটা বিলুপ্ত হোক। নতুন একটি সংস্থা করার বিষয়ে আরও চিন্তাভাবনা করে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। তিনি বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নতুন যে বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করছি তার মধ্যে অ্যাকাউন্টেবিলিটি ফিক্স করেছি, ট্রান্সপারেন্সি ফিক্স করেছি। ওখানে কমিটি গঠন করা হয়েছে। আপনি বিলের মধ্যে দেখবেন যে, কোনো সদস্য যদি শৃঙ্খলাবিরোধী কাজে জড়িত হয় তাদের বিচারের জন্য তদন্তের জন্য কী বডি করা হয়েছে সেটা আগে ছিল না। তিনি বলেন, ‘আপনারা স্থায়ী কমিটিতে অংশগ্রহণ করুন। ওখানে আলাপ আলোচনা হবে। যদি মতামত থাকে সেটা আমরা ওখানে গ্রহণ করব।’ এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা একাধিকবার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি সংসদীয় কমিটিতে পর্যালোচনার জন্য ২ কার্য দিবসের জায়গায় ৪ কার্য দিবসের প্রস্তাব করলে বিরোধীদলীয় তাতে সমর্থন দেয়।

আরও দুইটি বিল উত্থাপন : এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬’ নামের একটি বিল উত্থাপন করেন। এ ছাড়া ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল-২০২৬’ নামে আরও একটি বিল উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিল দুইটি অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত