প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে জাপানের সঙ্গে ৪টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষ করে আজ তার বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক ফোরাম ও ব্যবসায়িক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানিয়েছেন, বাংলাদেশকে গভীরভাবে সমর্থন করে জাপান। বে অব বেঙ্গল ঘিরে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে তার সরকার আগ্রহী। তারা বেসরকারি খাতে বাংলাদেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে জোরালো সমর্থন ও অংশীদারত্বের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এখানে বেশকিছু ভাবনার বিষয় রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের ভেবেচিন্তে অগ্রসর হতে হবে। এর কারণ হচ্ছে, মাতারবাড়ী-মহেশখালীতে যে লজিস্টিকস হাব গড়ে তুলতে দুই দেশ ঐকমত্য হয়েছে, সেখানে অন্য কোনো সমস্যা তৈরি হবে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ অতীতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও এর কৌশলগত অবস্থান নিয়ে জাপান ছাড়াও, চীন এবং ভারত প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। ভারতের আগ্রহ এই কারণে ছিল, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য বা ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর জন্য বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের একটি সাশ্রয়ী বাণিজ্যিক পথ তৈরি করা। তারা মাতারবাড়ী বন্দর ব্যবহার করে খুব সহজে তাদের এই রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহন করতে পারত। যে কারণে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিজস্ব কর্মপরিকল্পনাকে সফলতার দিকে নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়াই এখানে মূল কথা। বিষয়টি আরও পরিষ্কার করা দরকার। জাতীয় স্বার্থ বলতে আমি বোঝাতে চাইছি দেশের শিল্প, কলকারখানা, উৎপাদন, বিনিয়োগ, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিসহ সবকিছুর সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। তবে বিষয়টি পুরোপুরি পরিষ্কার হবে তখনই, যখন জানা যাবে আসলে কী ধরনের শর্তসাপেক্ষে চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। বাস্তবায়ন নির্ভর করবে সেই অবস্থার প্রেক্ষিতে। তবে একটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, অন্য কোনো দেশ এসব খাতে বিনিয়োগ করতে চাইলে আমরা তা করতে দেব কি না? এখানে কিন্তু অনেকেরই আগ্রহ রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, টাকা দিলেই হলো। আমরা সেটি গ্রহণ করব। আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে হ্যাঁ, টাকা আমাদের লাগবে। তবে সেই টাকা দিয়ে কতটুকু কী করব, কতটুকু দায়িত্ব তাদের, কতটুকু আমাদের, কতটুকু লাভ হবে আমাদের এবং বাইরের প্রতিযোগিতায় কোনো ধরনের লোকসান আছে কি না সবকিছু বিবেচনা করেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে। জাপান আমাদের বে অব বেঙ্গলে বিনিয়োগ করতে চায়। আবার চীন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রও বিনিয়োগ করতে চায়। এখানে ভূ-রাজনীতি গভীরভাবে জড়িত রয়েছে। ফলে এই চুক্তি এবং এমওইউ শেষ পর্যন্ত কী ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে, তা সময়ই ভালো বলতে পারবে।
যেকোনো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। চূড়ান্তভাবে এটি বলা যাবে তখন, যখন চুক্তির শর্তগুলো পরিষ্কারভাবে প্রকাশিত হবে। ঠিক তখন আরও স্পষ্ট করে বলা যাবে বিষয়টি দেশের উন্নয়ন এবং গণমানুষের জন্য কতটুকু উন্নতি বয়ে আনবে। তবে কোনো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। একটি বিষয়ে সতর্কভাবে বিবেচনায় নিতে হবে, এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনবল যুক্ত থাকবে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশি যোগ্য এবং অভিজ্ঞ মানুষরা এখানে কী পরিমাণে এবং কতটুকু অংশগ্রহণ করতে পারবে সেটি পরিষ্কার করা দরকার। অনেক কিছু বলা যায়, এতে কোনো আপত্তি নেই। তবে কোন শর্তে, কোন দেশ, কী কারণে সম্মত হচ্ছে এটাই বড় কথা।
পূর্বে এ বিষয়ে অনেক ধরনের জটিলতা দেখা দিয়েছিল। আমাদের চাহিদা পরিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে কী না, তা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, এ বিষয়ে কিন্তু বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক দেশের আগ্রহ ছিল এবং রয়েছে। কোনো কথা বলতে সমস্যা নেই। আমরা অনেক কিছু বলতে পারি। তবে বাস্তবে কোনটি গ্রহণযোগ্য এবং বাস্তবসম্মত হচ্ছে, সেটাই বড় কথা। দেখতে হবে, এটি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক হলো কি না? যাতে কোনো দেশ বলার সুযোগ না পায়, এর চেয়ে সহজ শর্তে আমরা আরও সুবিধা দিতে পারতাম। বিষয়টি যাই হোক, সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের অভিজ্ঞদের এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ রাখতে হবে। তবে কয়েকটি বিষয় চূড়ান্তভাবে এখানে আরও পরিষ্কার করতে হবে। এখানে বিদেশি অন্য কোনো দেশ বিনিয়োগ করতে চাইলে, আমরা তা করতে দেব কি না? অথবা দেশীয় কোনো বিনিয়োগকারীর কোনো সুযোগ রয়েছে কি না। দুইটি নীতি রক্ষা করে এই চুক্তি বাস্তবায়ন দরকার। একটি হলো, অন্য কোনো দেশ যদি এখানে বিনিয়োগ করতে চায়, তা হবে কি না। আরেকটি হচ্ছে, এটি বাংলাদেশের শিল্প ক্ষমতাকে প্রতিস্থাপিত করবে না, কিন্তু তাকে অংশগ্রহণমূলক হতে হবে।
এখানে জাপানের সঙ্গে আসলে সবকিছু নির্ভর করবে, চূড়ান্তভাবে আমরা যখন এ বিষয়ে সবকিছু খোলামেলাভাবে জানতে পারব। আবারও বলছি, যেকোনো বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর বাইরে অন্য কিছু চূড়ান্তভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।