 প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর

ইতিবাচক যাত্রা অর্থনৈতিক কূটনীতিতে

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৫ এএম

অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে জাপান সফর শেষে দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থাপনের পর একাত্তরের যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে টানা ৫৪ বছর দেশটি উন্নয়ন সহযোগিতা দিয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে দুই দেশেই। বৈশ্বিক অবস্থাও ঠিক আগের মতো আর নেই।

বিশে^র চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপানে জনসংখ্যা বর্তমানে কমছে। বয়স্ক মানুষ বাড়ছে। ফলে শ্রমশক্তির সংকটে পড়েছে তারা। জাপানের কোম্পানিগুলো এখন বিশ্বব্যাপী নতুন বাজার, উৎপাদন কেন্দ্র এবং শ্রমিকের সন্ধান করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রয়োজন বৈদেশিক পুঁজি, শিল্প প্রযুক্তি, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান।

উভয় দেশের চাহিদার মধ্যে এক ধরনের পরিপূরক সম্পর্ক রয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রচলিত পন্থা থেকে সহায়তার গুণগত মানের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করছে দুই দেশই। এই চাহিদা মেটাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপান্তরের সূচনা পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে প্রধানমন্ত্রীর সফরের মূল লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং টয়োটা ও মারুবিনিসহ দেশটির বড় কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারেক রহমান। বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানো, জাপানে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান, একই সঙ্গে জাপান থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ বিভিন্ন খাতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে সফরের যৌথ ঘোষণায়। সফরের আগেই দুই দেশ ‘অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ (ইপিএ) স্বাক্ষর করে। আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর ওই লক্ষ্য বাস্তবায়নের ভিত্তি ইতিমধ্যে স্থাপিত হয়েছে। এতদিন জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে ছিল ঋণ ও অনুদান দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক। এখন এই সম্পর্ক রূপান্তরিত হয়ে বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি খাতের সরাসরি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং যৌথ উৎপাদন কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে উৎপাদনমুখী সহযোগিতার দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। জাপানি বিনিয়োগ বাড়লে দেশে নতুন শিল্পকারখানায় বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থানের আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ আগামী তিন বছর পর উন্নয়নশীল দেশ হতে চলেছে। এতে আগের মতো অনুদান ও সহজ শর্তে ঋণ গ্রহণের সুযোগ কমবে। তার আগেই রপ্তানি বহুমুখী, বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি শিল্পায়ন ও দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগানো প্রয়োজন হবে।

জাপানের ভোক্তা ও শিল্প বাজারে উচ্চমূল্যের পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা ও বিশেষায়িত শিল্পপণ্যের চাহিদা রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগানোতে মূল চ্যালেঞ্জ হলো, পোশাক খাতের বাইরে নতুন রপ্তানি পণ্য তৈরিতে নজর দেওয়া। আমরা মনে করি, দেশের সরকার ও বেসরকারি খাতকে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা প্রয়োজন। 

সানায়ে তাকাইচি বাংলাদেশে ব্যবসা ও শিল্পের পরিবেশ উন্নত করার ওপর জোর দিয়েছেন। ইউরোপসহ অন্য দেশগুলোও একই কথা বলছে। দেশের ভেতরে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা, স্থিতিশীল করব্যবস্থা, দক্ষ বন্দর সুবিধা এবং কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী পাওয়াসহ ব্যবসার পরিবেশে দৃশ্যমান উন্নতি আনা এখন সময়ের দাবি।

বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বিগ-বি জাপানের অর্থায়নে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে বড় অবকাঠামো ও আঞ্চলিক সংযোগের হাব গড়ে তোলার কথাও বলা হচ্ছে, যেখানে জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, আধুনিক লজিস্টিকস এবং শিল্প করিডর স্থাপিত হবে। কৌশলগত এই উদ্যোগ ও ব্যবস্থায় দুই দেশই নিজেদের মতো করে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ উন্মুক্ত রেখেছে। ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। 

অন্যদিকে জাপানের দরকার শিল্পকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সেবার জন্য দক্ষ জনবল। জাপানি ভাষা ও প্রযুক্তি-প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ তরুণ কর্মী পাঠিয়ে দেশটির চাহিদা মেটানোর সুযোগ দেখছে। বাংলাদেশ ২০২৬ থেকে ৫ বছরে ১২টি অগ্রাধিকার খাতে সহজ শর্তে অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সমন্বয়ে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের একটি বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজ চেয়েছে।

বিদেশি সহায়তার ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল ঋণে অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়া, বৈদেশিক মুদ্রাসহ সম্পদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি সহায়তা গ্রহণের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ানোয় সহায়ক হতে পারে। সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। বৈদেশিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে রূপান্তরের এই সময়ে আমরা মনে করি, বাংলাদেশের কৌশলগত এবং স্পর্শকাতর দিকগুলোও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত