এক বছরের ব্যবধানে দেশে আমন মৌসুমের চালের উৎপাদন বেড়েছে ৫ দশমিক ১ শতাংশ। একই সময়ে বেড়েছে পেঁয়াজের উৎপাদন, যা প্রায় ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে কমেছে আলু ও গমের। এর মধ্যে আলুর উৎপাদন কমেছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং গমের ১ দশমিক ২ শতাংশ।
গতকাল রবিবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ‘ফসলের পরিসংখ্যান ও কৃষিশ্রমিকের মজুরিবিষয়ক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন (এপ্রিল-জুন ২০২৬)’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফসলের আবাদি জমি ও উৎপাদনের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এ প্রতিবেদন।
বিবিএসের তথ্য বলছে, আমন উৎপাদনে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে আমন উৎপাদিত হয়েছিল ১ কোটি ৬৫ লাখ ১৪ হাজার টন। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৯ হাজার টনে। অর্থাৎ এক বছরে আমনের উৎপাদন বেড়েছে ৮ লাখ ৪৫ হাজার টন বা ৫ দশমিক ১ শতাংশ। এ সময়ে আমনের আবাদি জমিও বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ।
একইভাবে উৎপাদন বেড়েছে পেঁয়াজের। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছিল ৩২ লাখ ২১ হাজার টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ লাখ ২০ হাজার টনে। অর্থাৎ এক বছরে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে ৫ লাখ ৯৮ হাজার টন বা ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ। উৎপাদনের পাশাপাশি পেঁয়াজের আবাদি জমিও বেড়েছে। আগের অর্থবছরে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫৯৯ একর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছিল। সর্বশেষ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৭ একরে।
পেঁয়াজের পাশাপাশি রসুন ও শীতকালীন মরিচের উৎপাদনও বেড়েছে। রসুনের উৎপাদন ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬৮২ টন থেকে বেড়ে ৬ লাখ ৫ হাজার ৪৪৬ টন হয়েছে। অন্যদিকে শীতকালীন মরিচের উৎপাদন ৫ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৭ টন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৬ হাজার ৩৪০ টনে।
তবে আলুর উৎপাদনে দেখা গেছে বিপরীত চিত্র। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ১ কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার টন আলু উৎপাদিত হলেও গত অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ ৭২ হাজার টনে। অর্থাৎ এক বছরে আলুর উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩ লাখ টন বা ২ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে আলুর আবাদি জমিও কমেছে।
গমের উৎপাদনও কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০ লাখ ৪১ হাজার টন গম উৎপাদিত হলেও সর্বশেষ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২৮ হাজার টনে। এতে উৎপাদন কমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে গমের আবাদি জমি ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৭২৪ একর থেকে কমে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ১৫৬ একর হয়েছে।
অন্যান্য ফসলের মধ্যে শীতকালীন ভুট্টার উৎপাদন ৪৮ লাখ ৭৩ হাজার টন থেকে বেড়ে ৫০ লাখ ৪৮ হাজার টন হয়েছে। সয়াবিনের উৎপাদনও ১ লাখ ৮ হাজার টন থেকে বেড়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। তবে আখের উৎপাদন সামান্য কমেছে।
ফসলের উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষিশ্রমিকের মজুরিতে নারী-পুরুষের বড় ব্যবধানের চিত্রও উঠে এসেছে বিবিএসের প্রতিবেদনে। গত জুনে খাবার ছাড়া একজন পুরুষ কৃষিশ্রমিকের দৈনিক গড় মজুরি ছিল ৬৪৮ টাকা। একই সময়ে নারী শ্রমিকের মজুরি ছিল ৪৭৮ টাকা। অর্থাৎ পুরুষের তুলনায় নারী শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা বা প্রায় ২৬ শতাংশ কম।
মার্চ মাসে পুরুষ কৃষিশ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ৬২৮ টাকা এবং নারী শ্রমিকের ৪৬১ টাকা। তিন মাসে পুরুষের মজুরি বেড়েছে ২০ টাকা, আর নারীর বেড়েছে ১৭ টাকা। ফলে এ সময়ে নারী-পুরুষের মজুরির ব্যবধান ১৬৭ টাকা থেকে বেড়ে ১৭০ টাকা হয়েছে।
খাবারসহ মজুরির হিসাবেও নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। জুনে এক বেলা খাবারসহ পুরুষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ৬২২ টাকা, নারীর ৪৩৭ টাকা। দুই বেলা খাবারসহ পুরুষের মজুরি ছিল ৬৩৯ টাকা এবং নারীর ৪৬০ টাকা। আর তিন বেলা খাবারসহ পুরুষ শ্রমিক পেয়েছেন ৬৬৪ টাকা, নারী শ্রমিক ৫১৫ টাকা।
বিবিএস জানিয়েছে, দেশের প্রতিটি উপজেলা থেকে নমুনাভিত্তিতে ১০ জন কৃষিশ্রমিকের সাক্ষাৎকার নিয়ে মজুরির তথ্য সংগ্রহ করা হয়। শ্রমিক পাওয়া না গেলে কৃষিকাজে দৈনিক শ্রমিক নিয়োগ করেছেন এমন কৃষকদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হয়।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়লেও কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হবেন।
আলুর উৎপাদন বেশি হওয়ার পরও কৃষকদের লোকসানের মুখে পড়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি সরকারি উদ্যোগে আলু সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পরামর্শ দেন। তার মতে, ধান-চালের মতো আলুও সরকারিভাবে সংগ্রহ করে সারা বছর বাজারে সরবরাহ করা গেলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন। একই সঙ্গে বাজারে দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে সরকারি মজুদ থেকে আলু ছাড়ার সুযোগ থাকবে।