মতপ্রকাশের আংশিক স্বাধীনতা

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২১, ১০:১৯ পিএম

একজন কার্টুনিস্ট ফেইসবুক পেজে কার্টুন আঁকলেন। তার ক্যাপশন লিখলেন একজন লেখক। ফলে তাদের দুজনকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাসা তল্লাশির নামে তছনছ করা হয়েছে। ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। ৬৯ ঘণ্টা বা প্রায় তিন দিন অজ্ঞাত স্থানে রাখা হয়েছে, যাকে আমরা গুম বলে থাকি (সূত্র : জামিনে মুক্ত কার্টুনিস্ট কিশোর : অজ্ঞাত স্থানে ৬৯ ঘণ্টা রেখে কার্টুন নিয়ে প্রশ্ন, মারধর, ০৫ মার্চ ২০২১, প্রথম আলো অনলাইন)। তারপর গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এরপর রিমান্ড, নির্যাতন, জেলবাস, জামিন না দেওয়া ইত্যাদি। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটল তা হলো মতপ্রকাশের জন্য একজন লেখককে জেলে রেখে হত্যা করা হলো। কেউ কেউ এটাকে মৃত্যু বললেও মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান লেখক মোশতাকের মৃত্যুকে একটি ‘হত্যাকান্ড’ বলেই অভিহিত করেছেন। সে হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আবার হামলা, মামলা, নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের শিকার হতে হয়েছে অনেককে। সর্বশেষ কার্টুনিস্ট কিশোরকেও মুক্তি দেওয়া হয়েছে সাংঘাতিক অসুস্থ অবস্থায়। কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর ও লেখক মোশতাক আহমেদের এই পরিণতি নির্দেশ করে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মানদন্ড।

সম্প্রতি ডয়েচে ভেলে তাদের এক রিপোর্টের শিরোনাম করেছে ‘করোনার এক বছর : সুপারহিট দুর্নীতি, সংকুচিত বাকস্বাধীনতা’। তাতে লেখা হয়েছে, করোনার এক বছরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু এই দুর্যোগের সময় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অবাধ তথ্যপ্রবাহ। করোনাকালে সংবাদমাধ্যম ত্রাণ, চিকিৎসা থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার খবর প্রকাশ করতে গিয়ে চাপের মুখে ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়। সমালোচনা সহ্য করার ক্ষেত্রে সরকার ও ক্ষমতবানদের অসিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটেছে। আর তা করতে গিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ বেড়েছে।

আর্টিকেল ১৯ এর হিসাব অনুযায়ী ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে এই আইনে মামলার পরিমাণ বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। ২০২০ সালে ১৯৮টি মামলায় আসামি করা হয় ৪৫৭ জনকে। এরমধ্যে ৪১টি মামলায় ৭৫ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়। ৩২ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলায় সাংবাদিক ছাড়াও চিকিৎসক, শিক্ষক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, কার্টুনিস্ট  ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অ্যাক্টিভিস্টদের আসামি করা হয়। ২০১৯ সালে মামলা হয় ৬৩টি।

ডয়েচে ভেলের দেওয়া এই তথ্য ও পরিসংখ্যান মিলে যায় বিবিসি বাংলা অনলাইনে প্রকাশিত ‘রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা একদমই কম বাংলাদেশে, বলছে বৈশ্বিক প্রতিবেদন’ রিপোর্টটির সঙ্গে (৪ মার্চ ২০২১)। এতে লেখা হয়, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফ্রিডম হাউজ নামের সংস্থাটির ২০২১ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বিশ্বের ২১০টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ‘আংশিক স্বাধীন’ দেশগুলোর মধ্যে তলানিতে বাংলাদেশের অবস্থান। এ বছর বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়িয়েছে ৩৯ (১০০ এর মধ্যে)। এর মধ্যে বাংলাদেশ রাজনৈতিক অধিকারে ৪০-এ ১৫ এবং নাগরিক স্বাধীনতায় ৬০ এর মধ্যে ২৪ পেয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হচ্ছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে একই অবস্থানে থাকলেও ২০১৯ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৪১, ও তার আগের বছর ২০১৮ সালে ছিল ৪৫ এবং ২০১৭ সালে ছিল ৪৭। যেসব দেশ ও অঞ্চলের স্কোর গড়ে ১ থেকে ৩৪ এর মধ্যে, তাদের ‘স্বাধীন নয় ((not free)’, ৩৫ থেকে ৭১ হলে তাদের ‘আংশিক স্বাধীন (partly free)’ এবং ৭২-এর বেশি হলে তাদের ‘স্বাধীন (free)’ হিসেবে রিপোর্টে বলা হচ্ছে।

ফ্রিডম হাউজের দেওয়া স্কোরে বাংলাদেশের অবনতি হচ্ছে প্রতি বছরই। ৪৭, ৪৫, ৪১, ৩৯ গত চার বছরে স্কোর নামছে এভাবেই। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী বছরের মধ্যেই হয়তো আমরা ‘আংশিক স্বাধীন’-এর তলানি থেকে বেরিয়ে ‘স্বাধীন নয়’ গ্রুপে প্রবেশ করব।

অনেকেই স্বীকার করবেন, এক সময় বাংলাদেশের সংবাদপত্রে কার্টুন ছিল নিয়মিত বিষয়। রনবীর কার্টুনের কথা অনেকেরই হয়তো মনে আছে। ‘উন্মাদ’ ম্যাগাজিনের কার্টুন অনেককেই মজা দিত। কিন্তু রাজনৈতিক কার্টুনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন আসিফুল হুদা ও শিশির ভট্টাচার্য। সাপ্তাহিক যায় যায় দিনে নিয়মিত কার্টুন এঁকে অনেক পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করেন হুদা। রাজনৈতিক কার্টুন এঁকে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ভোরের কাগজ ও প্রথম আলোতে কার্টুন এঁকে বিখ্যাত হন শিশির। আরও অনেকে কার্টুন আঁকলেও এ দুজনের কার্টুনের জন্য অপেক্ষায় থাকা পাঠকের সংখ্যা বাড়ছিল হু-হু করে। কিন্তু তাদের কার্টুন আজ কোথায়? তারা কেন আজ কার্টুন আঁকছেন না?

তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং সরকারের অসহিষ্ণু আচরণ শুধু তাদের হাতই নয়, মস্তিষ্কও চেপে ধরেছে। তাই তারা আর আগের মতো কার্টুন আঁকতে পারছেন না। তাদের কার্টুন ছাপার মতো কোনো সংবাদপত্রও আর এদেশে অবশিষ্ট নেই। অন্যদের অবস্থাও একই।

যে কিশোরকে ফেইসবুকে কার্টুন আঁকার অপরাধে গুম, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও জেলবাসের শিকার হয়ে আজ অসুস্থ জীবন যাপন করতে হচ্ছে, সেই কিশোর কিন্তু এক সময় প্রিন্ট মিডিয়ায় অনেক নামি-দামি রাজনীতিবিদদের নিয়েও কার্টুন আঁকতেন। বিএনপি সরকার আমলে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়াসহ অনেক শীর্ষ রাজনীতিবিদকে নিয়ে কার্টুন আঁকা হতো। প্রধানমন্ত্রীকে কার্টুনের সাবজেক্ট করার জন্য তখন কার্টুনিস্টকে মামলার শিকার হয়ে জেলে যেতে হয়নি। এমনকি কারও ধমক পর্যন্ত খেতে হয়নি বলেই জানি। এখন পরিস্থিতি পুরোটাই ভিন্ন।

কিন্তু দেশের লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবীদের একটি অংশ পর্যন্ত এ ভয়াবহ পরিস্থিতিকে শুধু মেনেই নেননি, এর পক্ষে নির্লজ্জ ওকালতি করছেন লিখে ও বলে। এর মধ্যে যারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন তাদের মধ্যে আছেন ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। ডেইলি স্টার বাংলা অনলাইনে ‘কারাবন্দির ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এখন মৃত্যুরও কারণ’ শিরোনামের নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘লেখক, সচেতন নাগরিক, মধ্যপন্থি বিরোধী কণ্ঠস্বর এবং চলমান ঘটনার পর্যবেক্ষক ও সমালোচক মুশতাক আহমেদ এখন মৃত। ময়নাতদন্তের পরে তার মৃত্যুর কারণ বিষয়ে ধারণা পেয়েছি। কিন্তু, মৃত্যুর আসল কারণ আমরা ইতিমধ্যেই জানি- একটি নিষ্ঠুর ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে যে কাউকে তুলে নেওয়া যায়, কারাবন্দি করা যায়, অস্পষ্ট ‘অপরাধ’-এর অগণিত অভিযোগ আনা যায় এবং মাসের পর মাস বিনা বিচারে, জামিন না দিয়ে, কোনো কারণ ব্যাখ্যা না করেই কারাগারে আটকে রাখা যায়। আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা আছে যার কারণে ব্যক্তিস্বাধীনতা এখন ক্ষমতাসীনদের খেলার পুতুলে পরিণত হয়েছে। এসব ঘটনার যেন প্রতিকার নেই।’

আসলেই এসবের কোনো প্রতিকার নেই। এর প্রতিকার আশা করাও অন্যায়। অথচ এদেশের প্রথম সারির জাতীয় দৈনিকগুলোর সম্পাদকরা এবং টেলিভিশনের মালিকরা যদি এক হয়ে চান যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ স্বাধীন মতপ্রকাশের ধারাকে ব্যাহত করে এমন আইন বাতিল করতে হবে, তবে যত বড় কর্তৃত্ববাদী সরকারই হোক না কেন, সে আইন বাতিল করতে তারা বাধ্য।

লেখক চিকিৎসক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত