বঙ্গবন্ধু টানেলকে কেন্দ্র করে আনোয়ারা-উপকূলের জমির দাম হু হু করে বাড়ছে। দশ বছর আগেও পটিয়া, আনোয়ারা-বাঁশখালী (পিএবি) সড়কের পাশের জমির দাম কমই ছিল। সে জমির দাম এখন বেড়ে ১০ থেকে ১২ গুণ। টানেলকে ঘিরে এ অঞ্চলে চলছে জমি কেনাবেচার হিড়িক। আনোয়ারা আগামীর অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে এ বিবেচনায় সবার চোখ এখন আনোয়ারা-উপকূলের জমিতে। বদলে যাচ্ছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা।
একসময় উপকূল বললেই নাক সিটকাতেন অনেকে। সেখানে জমি কেনার কথা লোকজন ভাবত না। বরং ঘূর্ণিঝড় আতঙ্কে উপকূলের ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেকে উঁচু এলাকায় থিতু হন। এখন সেই উপকূলেই ভিড়ছে মানুষ। দক্ষিণ চট্টগ্রামের কর্ণফুলী-আনোয়ারা-বাঁশখালী হচ্ছে উপকূলীয় উপজেলা। এখানে মানুষ গড়ে তুলছে আবাসিক ভবন। শিল্প-কারখানাও হচ্ছে। এই বদলের পেছনে আছে একটি স্থাপনা ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’।
টানেলকে টার্গেট করে উপকূলীয় ইউনিয়ন রায়পুরে জমি কিনেছে সামিট পাওয়ার গ্রুপ, আনন্দ শিপ ইয়ার্ড, সাঙ্গু শিপ ইয়ার্ডসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। পারকি সৈকত এলাকায় জমি নিয়েছে জব্বার অ্যান্ড কোম্পানি, সিপিডিএল, ফোরটিজ গ্রুপ, মাসুমা প্রপার্টিজ, ফোর এইচ গ্রুপ প্রভৃতি এবং ঢাকা-চট্টগ্রামের বেশ কিছু ধনাঢ্য ব্যক্তি। আনোয়ারা-কর্ণফুলীতে এস আলম গ্রুপ, পিএইচপি গ্রুপ, সাদ মুছা গ্রুপ, মোস্তফা-হাকিম গ্রুপ, আয়ুব ব্রাদার্স, সিপিডিএলসহ অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান জমি কিনেছে।
জব্বার অ্যান্ড কোম্পানির প্রতিনিধি মো. নুরুল আনোয়ার জানান, তার মাধ্যমে ২০০০ সালের দিকে পারকি সৈকত এলাকায় জব্বার কোম্পানি ১০ একর জমি কেনে। তখন শতকপ্রতি জমির দাম ছিল ২০ হাজার টাকারও কম। এখন হয়েছে শতকপ্রতি ৮-১০ লাখ টাকা। যে পরিমাণে জমির দাম বেড়েছে, সে পরিমাণে কিন্তু মৌজা-রেট বাড়েনি। এ কারণে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
আনোয়ারা-কর্ণফুলীতে আগেই সরকারি-বেসরকারি অনেক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল), ডাই অ্যামোনিয়া ফসফেট ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল), কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো), কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড), চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চল, কর্ণফুলী ড্রাইডক ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, সাদ মুছা শিল্প পার্ক, এইচএস কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড, এইচএম স্টিল মিলস, জেসি ফুড প্রোডাক্টস, ইউনাইটেড বিদ্যুৎকেন্দ্র, পারটেক্স অয়েল রিফাইনারি, সুপার অয়েল রিফাইনারি, স্টার সিমেন্ট লিমিটেড, এসএ গ্রুপ ট্যাংক টার্মিনাল, জুলধা পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রভৃতি।
আনোয়ারা উপজেলার কালাবিবি দীঘির মোড় এলাকায় গড়ে উঠেছে ইউনিটেক্স গ্রুপের বিশাল পোশাক কারখানা। এ কারখানার উৎপাদিত পণ্য খুব কম সময়ে টানেল দিয়ে পৌঁছানো যাবে চট্টগ্রাম বন্দরে। আশপাশে রয়েছে সাদ মুছা শিল্প পার্কসহ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখাও হয়েছে এ এলাকায়। এমন চিত্র কয়েক বছর আগে কল্পনা করেনি স্থানীয়রা।
ইউনিটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. হানিফ চৌধুরী বলেন, ‘এ জনপদে আর্থিক সমৃদ্ধির বিরাট সুযোগ সৃষ্টি করেছে বঙ্গবন্ধু টানেল। সুযোগটি কাজে লাগাতে আমার মতো অনেক উদ্যোক্তাই জমি কিনে প্রতিষ্ঠান গড়ছেন। আমি যে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করেছি তাতে চার-পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।’
শুধু শিল্প নয়, অনেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল করার জন্যও জমি কিনছেন। পটিয়ার মীর মোশাররফ হোসেন শেভরণ আনোয়ারা শাখার ম্যানেজিং পার্টনার। তিনি চাতরী-চৌমুহনী বাজারে বিশেষায়িত হাসপাতাল করার জন্য দুই কোটির বেশি টাকার সালামিতে কয়েকটি কক্ষ ভাড়া নিয়েছেন। আশপাশের কোথাও হাসপাতাল গড়ার জন্য জমি পাচ্ছেন না তিনি।
টানেল সড়কের জন্য যখন জমি অধিগ্রহণ করা হয় তখন জমির মূল্যের দেড়গুণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও পরে সরকার আইন পাল্টে ক্ষতিপূরণের হার তিনগুণ করে, এতে লাভবান হন জমির মালিকরা। স্থানীয় লোকজনের ধারণা, টানেল এলাকায় নানা প্রকল্পে আরও জমি অধিগ্রহণ করা হবে। তাই টানেল এলাকার কাছের জমিগুলোর বিক্রেতা তেমন নেই।
আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চল এলাকায় কয়েক বছর আগে স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম প্রতি শতক জমি বিক্রি করেন এক থেকে দেড় লাখ টাকায়। সেখানে তার আরও কিছু জমি রয়েছে। জমিগুলো কিনতে অনেকেই শতকপ্রতি ৮-১০ লাখ টাকা হাঁকাচ্ছেন। আরিফ জানান, অনেকে বেশি দামে জমি কিনতে চেয়েও পাচ্ছেন না।
আনোয়ারা উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘কয়েক বছর আগের তুলনায় জমি রেজিস্ট্রি অনেক বেড়েছে। বলা যায়, টানেল হওয়ার কারণে জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে জমির দামও বাড়ছে।’
কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মামুনুর রশিদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু টানেল হয়েছে “ওয়ান সিটি টু টাউন”-এর কথা ভেবে। বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বিস্তৃতি ঘটবে। ব্যবসা ও শিল্প-সমৃদ্ধ হবে। মজবুত হবে আমাদের অর্থনীতির ভিত।’
আনোয়ারা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আনোয়ারা-কর্ণফুলী আন্তর্জাতিক বিজনেস হাবে পরিণত হবে।’
