তৃণমূলপর্যায়ে খেলাধুলার প্রসারে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া ‘উপজেলা মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ (২য় পর্যায়) ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে কচ্ছপগতিতে। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৩৭ শতাংশ। একই সঙ্গে প্রকল্পের প্রায় পাঁচ কোটি টাকার অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়নি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রকল্পের আওতায় আট বিভাগের ৫৮ জেলার ২০১ উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রধান কাজের মধ্যে রয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ, মাঠ উন্নয়ন, প্যাভিলিয়ন ভবন, গ্যালারি, টয়লেট ব্লক, ড্রেনেজ, সীমানাপ্রাচীর, সোলার প্যানেল, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ। ২০২১ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০২৫ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে পরে আরও দুই বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। শুরুতে প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ৬৪৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এরপর আরও এক হাজার ছয় কোটি টাকা (৭৩.১৩ শতাংশ) ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে মোট ব্যয় হচ্ছে দুই হাজার ৮৫৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
দ্বিতীয় কর্মপরিকল্পনা অনুসারে, সময় বাড়ানোর পর এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের মোট বাস্তব অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল ৬২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অথচ এ সময়ে মাত্র ৩৭ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। একই সময়ে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ২৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যয় হয়েছে ৮২০ কোটি ৫৯ লাখ ৫৭ হাজার টাকা।
আইএমইডির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষা শেষে মোট চার কোটি ৭৭ লাখ ৫৭ হাজার টাকার অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই এক কোটি ৩৮ লাখ ৮৮ হাজার ৪৭৪ টাকার একটি আপত্তি রয়েছে। প্রায় পাঁচ কোটি টাকার অডিট আপত্তিগুলোর কোনোটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির প্রধান কারণ হিসেবে ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতার বিষয়টি উঠে এসেছে। আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন উপজেলায় এখনো ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হয়নি। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় ভূমি অধিগ্রহণ প্রস্তাবে ত্রুটি থাকায় তা সংশোধন করে আবার পাঠাতে হয়েছে। অন্য উপজেলাগুলোতেও রয়েছে বিভিন্ন জটিলতা। শরীয়তপুরের চামটায় স্থানীয়দের বাধায় কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময়ে নির্মাণসামগ্রী লুটপাটের কারণেও প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও গুরুতর ঘাটতি রয়েছে। আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, এত বড় অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের জন্য পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (ইআইএ) করা আবশ্যক হলেও তা হয়নি। এ ছাড়া প্রকল্প শেষে স্টেডিয়ামগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টেকসই পরিকল্পনা বা এক্সিট প্ল্যানও এখনো তৈরি করা হয়নি।
সার্বিক অবস্থা মূল্যায়ন করে প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, বর্তমান গতিতে চলতে থাকলে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যেও কাজ শেষ হবে না। এ জন্য অবিলম্বে একটি সংশোধিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (ক্রীড়া) মোহাম্মদ আমিনুল এহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পে ১২৫টি স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হয়। এতে আলাদা করে কোনো গ্যালারি ছিল না। তবে ৩৫টিতে পার্কের বেঞ্চের মতো বানানো হয়। এবার বসে খেলা দেখার জন্য ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্যরে গ্যালারি ও প্যাভিলিয়ন নির্মাণের কথা রয়েছে। এ ছাড়া নতুন করে ড্রেনেজব্যবস্থা নির্মাণ করা হয়েছে। তাই আগের প্রকল্পের তুলনায় কাজ বেড়েছে।’
তিনি জানান, প্রথম পর্যায়ে ১২৫, দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০১ এবং তৃতীয় পর্যায়ে ১২১ উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কাজের ধীরগতির কারণ সম্পর্কে আমিনুল এহসান বলেন, ‘দ্বিতীয় পর্যায়ের এই প্রকল্পে ২০১ মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭৮টি খাসজমিতে এবং ১২৩টি অধিগ্রহণ করা জমিতে নির্মিত হচ্ছে। জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।’