রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০৫:১৬ পিএম

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশ, অর্থনীতি ও সমাজের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। কিন্তু দেশের রাজনীতির কি কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়েছে? রাজনীতি নষ্ট আবর্ত থেকে বেরোতেই পারছে না যেন! বরং ক্ষমতার রাজনীতির পথে হাঁটা পক্ষ-প্রতিপক্ষ দলগুলোর দেশপ্রেমহীন দলতন্ত্র এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার উৎকট মোহ গণতন্ত্র বিকাশের সম্ভাবনাকে প্রতিদিন অন্ধকারে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। জামায়াতমুক্ত হতে না পারায় বিএনপি সাধারণ মানুষের চোখে অনেকটা ব্যাকফুটে রয়েছে। গত নির্বাচনোত্তর হতাশা বিএনপি নেতৃত্বকে বিভ্রান্তির ভেতরে ফেলে দিয়েছে। তাই সুস্থ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছেন না নেতারা। তারা অন্যায়, দুর্নীতির অতীত পাপের জন্য ক্ষমা চেয়ে শুদ্ধ হওয়ার সুযোগ গ্রহণ করেনি। এসব যুক্তি ও দলীয় নানা দুর্বলতার কারণে বারবার চেষ্টা করেও আন্দোলনের মাঠে তেমন সুবিধা করতে পারছে না বিএনপি। ক্রমেই আন্দোলনের বাস্তবতাও ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।

এ দেশের বিগত দিনের রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে যত দূর তাকানো যাবে, এ বিষয়টি স্পষ্ট হবে, রাজনীতিকদের হাতে জনগণ সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হয়েছে। রাজনীতি আর নির্বাচনের হাতিয়ার হিসেবে ‘জনগণ’ শব্দটির বহুল ব্যবহার হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে রাজনীতিবিদরা খুব কমই মূল্য দিয়েছেন। তারা সেøাগান দিয়েছেন ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।’ কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দলগুলো অনেক বেশি করে দল, ব্যক্তি ও পরিবারতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। সুবিধার ভাগবাটোয়ারা পেয়েছেন দলীয় নেতারা। কর্মীরা কখনো এর ছিটেফোঁটা পেয়েছেন, কখনো না পেয়েই অন্ধ মোহজালে জড়িয়ে প্রাণপাত করছেন। অতি সাম্প্রতিক কোনো কোনো রাজনৈতিক বাস্তবতা বাদ দিলে দেশ ও জনগণের দিকে রাজনীতির নায়করা অনেকেই ফিরে তাকাননি। এই দেশ এবং দেশের মানুষ তো এই ক্ষমতাশালী ও ক্ষমতাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে বস্তুগত কিছু চায় না; তারা চাঁদাবাজির অর্থের ভাগ চায় না, দখল করা খাসজমি, মার্কেট, নদী-খালের ভাগ চায় না। জনগণ চায় একটি নিভাঁজ-নিপাট গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করুক রাজনৈতিক দলগুলো। এ জন্য কাউকে গণতন্ত্রের কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে না। নিজেদের শুধু পরিশুদ্ধ হতে হবে। অন্তরে হতে হবে দেশপ্রেমিক। ব্যক্তিপূজা, দল বন্দনা বাদ দেওয়া যাবে না জানি, দলের প্রতি ভালোবাসা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধ বিষয় নয়, তবে সবার আগে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক আচরণ তো ঘর থেকেই শুরু করতে হয়। কিন্তু সে চেষ্টা দু-তিন দশকে কি আমরা দেখেছি?

নির্বাচন না করে, বৃহত্তর নেতাকর্মীদের অনুমোদন ছাড়া বড় দলগুলোর প্রধান পদ মৌরুসি-পাট্টা হয়ে যায়। গণতন্ত্রের পথে হেঁটে কেউ আজীবন পার্টিপ্রধান থাকায় তো কোনো অন্যায় নেই। তৃণমূলপর্যায় থেকে জাতীয় কমিটি পর্যন্ত সর্বস্তরে বছরের পর বছর কাউন্সিলবিহীন পড়ে আছে। উচ্চতর পদাধিকারীদের ইচ্ছায় বারবার নানা পদে ব্যক্তি মনোনীত হচ্ছেন। দেশজুড়ে থাকা অধিকাংশ নেতাকর্মীর তাতে সায় আছে কি না তা কি কেউ পরীক্ষা করেছেন?

গণতন্ত্র না থাকায় বিএনপিতে দলপ্রধান আর আওয়ামী লীগে দলপ্রধানের সিদ্ধান্তের ওপর কথা বলার খুব একটা সুযোগ থাকে না। বিএনপির কথা না হয় বাদ দিলাম, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগ বর্তমান নেতৃত্বের কল্যাণে অনেকটা শহুরে এলিট দলে পরিণত হয়েছে। তৃণমূলপর্যায়ে ত্যাগী নেতাকর্মীদের কতটা মূল্যায়ন করে তারা? গণতান্ত্রিক আচরণ অব্যাহত রাখতে পারলে আওয়ামী লীগের ধমনিতে রক্ত সঞ্চালন বাড়ত। ফলে দেশজুড়ে বলবন্ত হতে পারত দলের জীবনীশক্তি। একসময় আওয়ামী লীগ নেতাদের শহরকেন্দ্রিক বণিক মনোবৃত্তির কারণে ধীরে ধীরে সুবিধার ফসল ঘরে তুলতে তৎপর হতে পেরেছিল জামায়াত আর বিএনপি। পরে অবশ্য এ ঘোর অনেকটা কাটাতে পেরেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব।

সাম্প্রদায়িক দল জামায়াত আর ভুঁইফোড় দল বিএনপির পক্ষে সাধারণ মানুষের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া সহজ ছিল না। আওয়ামী লীগের গণতন্ত্র চর্চাবিহীন পথচলা বরং জামায়াত-বিএনপির পায়ের নিচে মাটি পাওয়ার বাস্তবতা নিশ্চিত করে দিয়েছিল। কার্যপদ্ধতি ও আচরণে এই অগণতন্ত্রী দলগুলো জনকল্যাণ বিচ্ছিন্ন হলেও হাস্যকরভাবে জনগণের দোহাই দিয়েই তারা নিজেদের বক্তব্য উত্থাপন করে। দলগুলোর দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক আচরণে মানুষ আস্থাহীনতায় ভুগছে। দলীয় কর্মী-সমর্থকরাও বিভ্রান্ত। যে কারণে বারবার আন্দোলনের কথা বলেও কর্মীদের মাঠে নামাতে পারছে না বিএনপি নেতৃত্ব। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপি-আওয়ামী লীগ কেন গণতান্ত্রিক আচরণ করতে পারছে না? বিএনপির বিষয়টি বোঝা যায়। একটি বড় রাজনৈতিক শূন্যতার সময় সামরিক অঞ্চলের ভেতর থেকে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। তাই তার গড়া দল স্বাভাবিকভাবেই গণতান্ত্রিক আচরণ নিয়ে যাত্রা শুরু করতে পারেনি। পরবর্তী সময়েও নিয়মতান্ত্রিক পথে দলটির বিকাশ ঘটেনি। ডান-বাম-সাম্প্রদায়িক দল সব অঞ্চলের সুবিধাবাদী মৌমাছিরা বিএনপি নামের মৌচাকে এসে জায়গা করে নিতে থাকে। স্বার্থবাদী মানুষদের দিয়ে গণতন্ত্রের চর্চা হতে পারে না। এ কারণে বিএনপির ‘গণতন্ত্র’ বক্তৃতা আর স্লোগানেই রয়ে গেল। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকায় অর্থ আর প্রভাববলয় দিয়ে একসময় বিএনপি দ্রুত সারা দেশে সংগঠনটিকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল। এই দলটি গ্রামগঞ্জে পৌঁছে দেখল তাদের প্রতিহত করার মতো কোনো গণতান্ত্রিক শক্তি আর সেখানে অবশিষ্ট নেই।

গণতন্ত্রচর্চা যেকোনো দলকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেলহত্যার পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের আচরণ বুঝিয়ে দিল হত্যাকারীরা কতটা মেধাবী পরিকল্পনায় হেঁটেছে। তারা আওয়ামী লীগের কর্মক্ষম হাত-পাগুলো ভেঙে দিয়েছিল। তাই পরবর্তী নেতৃত্ব ব্যক্তিগত গুণাগুণের কারণেই আত্মবিশ্বাসী হতে পারেননি। নয়তো নতুন বেড়ে ওঠা ভুঁইফোড় দল বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করার জন্য যেখানে গণতান্ত্রিক বোধ নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করার কথা, সেখানে প্রতিযোগিতার রাজনীতিতে নেমে পড়ল। যে কারণে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের আচরণে গণতন্ত্র দৃঢ়ভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি সে সময়।

তবে অসহায় দেশবাসী শেষ পর্যন্ত আশা নিয়ে বাঁচতে চায়। সবকিছুরই শেষ থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোরও নিশ্চয় দোদুল্যমানের অবসান ঘটবে। এসব দলের নেতৃত্বে থাকা মহাজনদেরও উপলব্ধি হওয়ার কথা। গণতান্ত্রিক আচরণহীন স্বার্থবাদী রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কারও জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। তাই ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে এ সময়ে আমাদের জীবনেও কেন সুবাতাস বইবে না? এটি তো ঠিক, রাজনীতিবিদদের মেধা-চিন্তা-সততার পথ বেয়েই সার্বিক কল্যাণ হতে পারে। আমাদের বিপুল জনশক্তি, মেধাবী মানুষ, উর্বর কৃষিভূমি, গ্যাস-কয়লার মতো খনিজসম্পদ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া কঠিন কিছু নয়।

আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে অনেকটা এগিয়েছে এ সত্য দৃশ্যমান। তবে এ সাফল্য আরও গতিশীল হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, জনকল্যাণমূলক প্রশাসন আর গণতন্ত্রের সুপ্রতিষ্ঠা। এ সাফল্য অর্জন করার পূর্বশর্ত হচ্ছে কলুষমুক্ত দেশপ্রেমিক রাজনীতি। রাজনীতিবিদদের অধিকাংশ যদি চিন্তা-কর্মক্ষেত্রে সৎ হতে পারতেন, তাহলে অনুসারী বা তালেব এলেম নেতাকর্মীরা সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, অন্যের সম্পদ দখলকারী মস্তান হতে পারত না। নেতাকে অনুসরণ করে দেশ কল্যাণে নিবেদিত হতে পারত। দেশ ও দেশবাসীর কল্যাণের ব্রত নিয়ে যারা রাজনীতিতে টিকে যেতেন, রাজনীতির দরজা শুধু তাদের জন্য খোলা থাকত। এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলেই আরও গতিশীলভাবে এগিয়ে যেতে পারত দেশ।

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকালে অনেক ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি নেতিবাচক উপাদানও যুক্ত হয়েছে। প্রশাসনিক অদক্ষতা আর দুর্নীতিকে লুকোনো যাচ্ছে না। মানুষের যাপিত জীবনে স্বস্তি ফিরে আসার সুযোগ কম। সড়ক অব্যবস্থাপনাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আইনের শাসন স্বস্তিকর হয়নি এখনো। দলীয় সন্ত্রাস মানুষকে ক্ষুব্ধ করছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে গৃহীত নীতিমালা স্বস্তিকর নয়। দিগ্ভ্রান্তের মতো মাঝে মাঝে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী-এমপিদের অনেকে অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছেন। সমালোচনাকারী সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী সবাইকে শত্রুজ্ঞান করে প্রকাশ্য বক্তব্য রাখছেন।

অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য দেখাতে পারলেও আওয়ামী লীগ সরকারের এ ধরনের দুর্বলতা প্রগতিবাদী মানুষের কাম্য নয়। আওয়ামী লীগ দুর্বল হয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সবল করুক তা জাতি কামনা করে না। এ কারণে এ দেশের আশাবাদী মানুষ প্রত্যাশার দীপ জ্বালিয়ে রাখতে চায়। আওয়ামী লীগ সঠিক দিকনির্দেশনায় এগিয়ে যাবে, এটিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাস্নাত মানুষ আশা করে। আওয়ামী নেতৃত্ব বচনে চলনে আরও হিসেবি এবং মার্জিত আচরণ করবে এখন জাতির এমনটিই প্রত্যাশা। দেশপ্রেমের শক্তিতে যদি দুর্নীতিমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে পারে বর্তমান সরকার আর এর প্রশাসন, তাহলে ভবিষ্যতে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে নানা ঘুরপথ খুঁজতে হবে না আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে। তাই এ সময় প্রয়োজন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের ধৈর্যশীল হওয়া এবং সমালোচনা শোনার সহ্যশক্তি বাড়ানো। কারণ অধিকাংশ সমালোচনার ভেতর থাকে পথের দিশা। প্রগতিবাদী এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ বর্তমান বাস্তবতায় চাইবে আওয়ামী লীগ সরকার দৃঢ় পায়ে এগিয়ে চলুক। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনই শুধু এই সম্ভাবনার বাস্তবায়ন করতে পারে। দল নয় জনগণের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারলে তার প্রতিদান আওয়ামী লীগ অবশ্যই পাবে। আর এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ অনন্যোপায় হয়ে হলেও তেমন প্রত্যাশা বাঁচিয়ে রাখছে।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত