সিরিয়ার ইউফ্রেতিস নদীর তীরবর্তী শহর রাকার প্রধান সড়কে বন্ধুর মাথাবিহীন দেহ দেখার দুঃসহ অতীত স্মরণ করলেন সামের। ২০১৫ সালে গ্রীষ্মের উত্তপ্ত সেই দিনটি জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) অধীনে তার সময়ের স্মারক। আনুমানিক ২৫ বছর বয়সী সামেরের বন্ধু ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন। তাকে ‘অ্যাকটিভিজমের’ জন্য হত্যা করা হয়। বন্ধুর মরদেহ নিয়ে সামের বলেন, ‘কাউকে এটি (মরদেহ) স্পর্শ করতে কিংবা যথাযথ স্থানে নিয়ে দাফনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।’
গোপনীয়তার স্বার্থে নিজের আসল নাম না বলা এই ব্যক্তি বলেন, ‘যা দেখেছি, তা বর্ণনা করতে পারব না। কারণ এটি বর্ণনা করার মতো ভাষা নেই। জনতার ভিড়ে আমি মূর্ছা যাই। এর পরপরই আমাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।’
আলজাজিরার খবরে জানানো হয়, আইএসের স্বঘোষিত রাজধানীতে প্রকাশ্যে গলা কেটে হত্যা ছিল নিয়মিত বিষয়। সেখানে বিরোধীদের দমনে বর্বর এই কৌশল নেওয়া হতো, যাতে করে স্থানীয়দের মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়া যায়।
২০১৫ সালের জানুয়ারিতে দখলদারিত্বের উত্তুঙ্গে থাকা আইএস সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তাদের দখলকৃত ভূমি ছিল যুক্তরাজ্যের আয়তনের কাছাকাছি। এমন বাস্তবতায় সংগঠনটিতে যোগ দেয় ৪০ হাজার বিদেশি যোদ্ধা।
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আইএইচএস মারকিটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে এসে আইএস প্রায় ১০০ শতাংশ ভূমির দখল হারিয়েছে। বর্তমানে সিরিয়ার দেইর আজ জোর প্রদেশের বাঘুজ শহরে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সঙ্গে লড়ছে আইএসের হাতে-গোনা কিছু যোদ্ধা। এর পতনের মধ্য দিয়ে সর্বশেষ ঘাঁটিটি হাতছাড়া হবে আইএসের। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বাঘুজের পতন মানে শক্তি হিসেবে এ অঞ্চলে আইএসের পতন নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্টাডিজের পরিচালক জশোয়া ল্যান্ডিস বলেন, ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসের লুকিয়ে থাকা সদস্যদের চোরাগোপ্তা হামলা অব্যাহত থাকছে। সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আইএসের ধ্বংস সুদূরপরাহত।
ইরাকে আল-কায়েদার শাখা হিসেবে তৎপরতা শুরু করে আইএস। ২০০৬ সালে এটি ইসলামিক স্টেট অব ইরাক (আইএসআই) নাম ধারণ করে। ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক সংঘাত বাড়াতে আল-কায়েদা নেতাদের পরিচালিত আন্দোলনটি বড় ভূমিকা রাখে। ওই সময়ে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে প্রাণঘাতী হামলা চালায় আইএসআই। তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল পশ্চিমা-সমর্থিত আদিবাসী নেতা ও যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের চৌকি। পরবর্তী সময়ে তাদের এসব এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বাহিনী।
বাগদাদের পর আইএস ঘাঁটি গাড়ে ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুলে। ২০১০ সালে আবু বকর আল-বাগদাদিকে আইএসআইয়ের প্রধান ঘোষণা করা হয়। দুই বছর পর তিনি আইএসআইয়ের সহযোগীদের সিরিয়ায় শাখা খোলার অনুমোদন দেন। ওই শাখার সদস্যরা শুরুতে জাবাত আল-নুসরা হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তী সময়ে অনেকে পক্ষত্যাগ করে আইএসে যোগ দেয়। সিরিয়া ও ইরাকের ঝুঁকিপূর্ণ, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় দ্রুত নিজেদের অবস্থান বিস্তার করতে থাকে সংগঠনটি।