সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচন সবার মধ্যে আশা জাগিয়েছিল যে, এবার ক্যাম্পাসগুলোতে চলমান ছাত্ররাজনীতিতে প্রত্যাশিত গুণগত পরিবর্তনের সূচনা ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে সেটা দেখা যাচ্ছে না। ঘটনাবহুল নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠিত হলো, সেটি ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা জাগাতে পারেনি। উপরন্তু, এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানোয় ছাত্র সংগঠনগুলোর পারস্পরিক সহাবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘ঢাবিতে ছাত্রদলের ওপর ছাত্রলীগের হামলা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই হামলায় ছাত্রদলের অন্তত ১১ নেতাকর্মী এবং তিনজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বর, দোয়েল চত্বর ও টিএসসিতে কয়েক দফায় ওই হামলা চালানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতির নেতৃত্বে ওই হামলা হয়েছে দাবি করে ছাত্রদল নেতারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে। তবে ছাত্রলীগ নেতারা বলছেন, অতি উৎসাহী কিছু ছাত্র এ ঘটনা ঘটিয়েছে, এ বিষয়ে কোনো সাংগঠনিক নির্দেশনা ছিল না। তদন্তসাপেক্ষে হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছে ছাত্রলীগ। এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর ওই হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবি করেছেন ডাকসুর ভিপি নুরুল হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর একে অপ্রত্যাশিত ঘটনা আখ্যা দিয়ে তদন্তসাপেক্ষে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
আগের দিন রবিবার জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির প্রায় দুইশ নেতাকর্মী নিয়ে মধুর ক্যান্টিনে যান ছাত্রদলের নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তারা সেখানে পৌঁছানোর আগে থেকেই মধুর ক্যান্টিনে ছিলেন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক, ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য নেতারা। ছাত্রদলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক মধুতে উপস্থিত ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছাড়া আর কেউই তাদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেননি। দীর্ঘদিন পর মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের একত্রে উপস্থিতির ঘটনা একটা আনন্দমুখর পরিবেশের জন্ম দিতে পারত। কিন্তু তেমনটা ঘটেনি, বরং মধুতে প্রবেশ করেই ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নানারকম স্লোগানের মুখে পড়তে হয় ছাত্রদল নেতাদের। বিপরীতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার নামে স্লোগান দেন। বেশ কিছুক্ষণ পাল্টাপাল্টি স্লোগানের পর ছাত্রদল নেতারা মধুর ক্যান্টিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যান। রবিবার মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের এই মুখোমুখি হওয়ার পরদিনই ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের ওপর তিন দফায় হামলার ঘটনা ঘটল।
গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হলো বহু মত ও পথের পারস্পরিক সহাবস্থান। মতাদর্শ কিংবা লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও একে অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো নিজেদের কর্মসূচি চালিয়ে যাবে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। দুঃখজনক বিষয় হলো, জাতীয় রাজনীতির মতোই ছাত্ররাজনীতিতেও পারস্পরিক সহাবস্থানের এই গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থনপুষ্ট ছাত্র সংগঠন হিসেবে এ পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য।
সবাইকে এটা মনে রাখতে হবে যে, সংঘাতের মধ্য দিয়ে কোনো সমাধান সম্ভব নয়; পারস্পরিক সহাবস্থানের মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্তরণ ঘটাতে হবে। এই সহাবস্থান কেবল ছাত্রলীগ আর ছাত্রদলের বিষয় নয়, কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিষয় নয়। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল সব ছাত্র সংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই ছাত্ররাজনীতিতে গণতান্ত্রিক চর্চার পথকে সুগম করতে হবে। সংঘাত নয়, সহাবস্থান কাম্য।