বৃক্ষে, পত্র-পল্লবে নতুন আগমনী বার্তা জানান দেয় ঋতুরাজ বসন্ত এসে গেছে। প্রকৃতিও নতুন সাজে সেজেছে। ঋতুরাজ বসন্তেই জন্ম নিয়েছিলেন বাঙালি জাতির মুক্তিদাতা, এই জাতির বটবৃক্ষ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
এ বসন্তের আরেক খবর হলো, ২০২০ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নতুন বই ‘আমার দেখা নয়া চীন’। বসন্তের নতুন পাতার মতো বইটি পড়ার পর আমার নতুন উপলব্ধি হয়েছে, বঙ্গবন্ধু রাজনীতিবিদ না হলে সাহিত্যিক হতেন। এতে অনেকের সন্দেহ বা দ্বিমত থাকলেও আমি প্রায় নিশ্চিত।
১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে ‘পিস কনফারেন্স অব দ্য এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক রিজিনস’ এ পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে চীন সফর করেন তিনি। তারপর সেই ভ্রমণকাহিনি ১৯৫৪ সালে কারাবন্দী অবস্থায় লিপিবদ্ধ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
একজন নৃবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে পড়তে পড়তে বঙ্গবন্ধুর ‘আমার দেখা নয়া চীন’কে নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বা নৃবৈজ্ঞানিক বোঝাপড়ার জায়গা থেকে বুঝতে চেয়েছি। আমার মনে হয়েছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু একজন নৃবিজ্ঞানী। কেন আমি এ কথা বলছি, তা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বোঝানো চেষ্টা করি!
মানুষের দৈনন্দিন কাজকে বুঝতে হলে perticipent observation বা অংশগ্রহণমূলক পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন! অর্থাৎ আপনি তৎক্ষণাৎ যা বললেন তা-ই একজন নৃবিজ্ঞানী মেনে নেবে বিষয়টা এত সরল বা সহজ নয়। আপনার কথা ও কাজের মধ্যে মিল বা অমিলের জায়গাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করাই হলো নৃবিজ্ঞানীর কাজ। বঙ্গবন্ধুর ‘নয়া চীন’ পর্যবেক্ষণে আমি তা স্পষ্ট দেখতে পাই। চীনে গিয়ে তিনি শুনেছেন শ্রমিক শ্রেণি চুরি বা ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত নয়। এ কথা তিনি চীনা নাগরিকদের কাছে শুনলেও তাদের কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করেননি। নিজ চোখে দেখে এবং অনেকের সঙ্গে কথা বলে তাদের বক্তব্যের সত্যতা মিলিয়ে দেখেছেন। শুধু তাই নয়, কেন তারা আর আগের পেশায় (ভিক্ষাবৃত্তিতে) নেই, তা উদ্ঘাটনের চেষ্টাও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান করেছেন!
নৃবিজ্ঞানী ম্যালানসকির মতে, একটা সমাজ কেন নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে চলে তা জানতে হলে কীভাবে প্রশ্ন করার চেয়ে কেন এই প্রশ্ন করলে পুরো পদ্ধতি সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু প্রশ্নের মধ্যে আমি সে কৌশল দেখতে পাই। সেই চীনে, সেই সময়ে এমন কোনো বিষয় নেই যা জানার বা দেখার বা বোঝার আগ্রহ তার মধ্যে জাগেনি বা উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেননি। যৌন ব্যবসা নির্মূলে মাও সে তুং সরকার আইনের চেয়ে সামাজিক প্রচারণায় জোর দিয়ে যে সফল হয়েছেন তাও তিনি তুলে ধরেন তার লেখায়।
দেহ ব্যবসা আইন করে কেন বন্ধ করা হলো না এমন প্রশ্নের জবাবে চীনা এক কথক বঙ্গবন্ধুকে জানান, ‘অত্যাচার বা আইন করে তুলে দেওয়া হয়নি, এদের তো বাঁচতে হবে! এদের খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা করে দিলেই তারপর আইন করা যায়, শুধু আইন করলেই কোনো কাজ হয় না।’(পৃ. ৯৭)।
বাঙালির জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখলেন, ‘সরকার প্রথম বুঝাল, সামাজিক অর্থাৎ কর্মসংস্থান ও বসবাসের নিরাপত্তা প্রদানসমেত সমাজে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা করার ফলস্বরূপ অনেকেই আজ এই পেশায় নেই, যৎসামান্য থাকলেও তা প্রকাশ্যে নয়’।
নারীর ক্ষমতায়নে চীনা দোভাষী জাতির পিতাকে বলেন, ‘একটা জাতির অর্ধেক জনসাধারণ যদি ঘরের কোণে বসে শুধু বংশবৃদ্ধির কাজ ছাড়া আর কোনো কাজ না করে তাহলে সেই জাতি দুনিয়ার কোনো দিন বড় হতে পারে না’। (পৃষ্ঠা. ৯৯)
এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে চীনা পুরুষরা তাই অন্যায়-অত্যাচার করেন না নারীদের ওপর, প্রকারান্তরে বঙ্গবন্ধু আক্ষেপের সুরে বাংলায় নারীদের এমন সহাবস্থান নেই বলেও দুঃখ প্রকাশ করেন।
ধর্ম, রাজনীতি, সংস্কৃতি, বিবাহ ব্যবস্থা, নারী-পুরুষ সম্পর্ক সবকিছুই আমরা পাই ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইয়ে। নৃবিজ্ঞানীদের ভাষায় যাকে বলে সামগ্রিক গবেষণা। ধর্মের ক্ষেত্রেও তিনি সহাবস্থান দেখতে পেয়েছেন চীনে। সংখ্যালঘুদের সংখ্যাগরিষ্ঠদের দ্বারা নির্যাতনের কোনো খবর মাও সেতুংয়ের সময়ে ঘটেনি বলে অনেক মুসলমান বসবাসকারী বঙ্গবন্ধুকে জানান। এমনকি মুসলমান অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও কর্মরত ছিলেন তখনকার চীনে।
সেখানে তখন থেকেই চাকরি হয় যোগ্যতায় (যেমন সিং কিয়াং প্রদেশের গভর্নর জনাব বোরহান শহীদ, পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হালিম)। বঙ্গবন্ধুর মতে, ‘মানুষ যদি সত্যিকারভাবে ধর্ম ভাব নিয়ে চলতো তাহলে আর মানুষে মানুষে এবং রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুগ যুগ ধরে সংগ্রাম হতো না! কিন্তু মানুষ নিজেদের স্বার্থরক্ষা করার জন্য ধর্মের অর্থ যার যেভাবে ইচ্ছা সেইভাবে চালাতে চেষ্টা করছে’। (পৃষ্ঠা:১০৮)
পরবর্তী সময়ে যার নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখেছিলেন, বেকার সমস্যা দূরীকরণে মাও সেতুং সরকার কুটির শিল্পের ওপর নজর দিয়েছেন। এ ছাড়া সরকার জনগণের সাহায্যে বড় বড় শিল্প গড়ে তুলছে, তাতে হাজার হাজার লোক কাজ পাচ্ছে।(পৃ: ৯৪)
বঙ্গবন্ধু বেকার সমস্যা নিয়ে ওই দেশের জনগণ ও সাংবাদিকের সঙ্গেও কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু চীনাদের ভাষার প্রতি প্রেম দেখে বেশ অবাক হন। তাদের অনেকে খুব ভালো ইংরেজি জানা সত্ত্বেও তারা নিজ ভাষা ছাড়া কথা বলেন না। বঙ্গবন্ধু লেখেন, ‘চীনে অনেক লোকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে, অনেকেই ইংরেজি জানেন, কিন্তু কথা বলেন না। দোভাষীর মাধ্যমে কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ইংরেজি জানেন, কিন্তু আমাদের অভ্যর্থনা করলেন চীনা ভাষায়। যদিও তিনি ভালো ইংরেজি বলতে পারেন, একেই বলে জাতীয়তাবোধ। একেই বলে দেশের ও মাতৃভাষার উপরে দরদ’। (পৃ: ৪৪)
ম্যাক্স ওয়েবার তার ‘The Protestant ethics & the spirit of capitalis’ (১৯০৫) বইয়ে দেখিয়েছিলেন কীভাবে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকান জনগণ (প্রোটেস্ট্যান্টরা) চার্চ কেন্দ্রিক ধর্ম থেকে সরে এসে নিজ নিজ কর্মকে ধর্ম হিসেবে নিয়ে শিল্পায়নের বিস্তার ঘটিয়েছিল। তা তিনি দেখিয়েছেন।
বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু তার দেখা ‘নয়া চীনে’ বইয়েও চীনা কুটির শিল্প ও বড় বড় শিল্পকারখানায় শ্রমিকদের পরিশ্রম, দেশপ্রেম, ধর্মীয় কুসংস্কারকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য তুলে ধরেছেন নিজস্ব অনুসন্ধানে।
যা বুঝতে পেরেছেন বাংলাদেশের আরেক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘চীন বর্তমানে বিশ্বে অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশ হিসেবে স্থান নিয়েছে। ১৯৫২ সালে চীন ভ্রমণের সময় গভীর দৃষ্টি নিয়ে নয়া চীন পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সে-কথাই বাস্তবে রূপ পেয়েছে’।(শেখ হাসিনা, পৃষ্ঠা: ১৬)
পরিশেষে বলতে হয়, বঙ্গবন্ধুর চীন সম্পর্কিত পর্যবেক্ষণ ও বর্তমান বাস্তবতা কিংবা তার ভবিষ্যদ্বাণী- সবই আজ দিবালোকের মতো সত্য।
চীনা সমাজ বা সংস্কৃতির গবেষণাপূর্বক ওই জনগোষ্ঠীর মতামতের ভিত্তিতে তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপনা করে সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেছিলেন বাঙালি জাতির পিতা।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন তাদের উজ্জ্বলতম ও অভূতপূর্ব উন্নয়নের। এই মহাজনের বাক্য আজ সর্বাংশে সত্য হয়েছে! একজন গবেষক বা পর্যবেক্ষক হিসেবে বঙ্গবন্ধু সফল। তার ‘আমার দেখা নয়া চীন’ ভ্রমণকাহিনি হলেও এতে তিনি একজন নৃবিজ্ঞানীর গবেষণার পদ্ধতি বা method ব্যবহার করেন (indeepth interview,focus group discussion ইত্যাদি।)
বইটি পড়লেই বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধু তা করেছেন সজ্ঞানে। তাই তো ১৯৫২ সালে চীনাদের যে চারিত্রিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, ভাষার প্রতি প্রবল প্রেম সর্বোপরি দেশপ্রেমের যে চিত্র তুলে ধরেছিলেন- আমরা বর্তমান সময়েও তা দেখতে পাই।
অনুমাননির্ভর কথা নৃবিজ্ঞানীরা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। সমাজের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে তার বাস্তব অবস্থান সবার মাঝে তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই গবেষণা করে থাকেন নৃবিজ্ঞানীরা। বঙ্গবন্ধুর নয়া চীন পড়ে তেমনই একজন বাংলাভাষী নৃবিজ্ঞানীর দেখা আমি পেয়েছি।
রায়হান কবির: সাবেক শিক্ষার্থী, নৃৃবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
