ডা. মঈনের মৃত্যু আমার কাছে কবি হেলাল হাফিজের কবিতার একটি লাইনের মতো “... নাকি সে আমার মত খুব ভালোবেসে পুড়েছে কপাল তার আকালের এই বাংলাদেশে।..”
একটি মৃত্যু যেন আদি চিন্তার খোরাক হয়ে অনন্তকালের সাক্ষী হয়ে রইল শুধুই অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার দৃষ্টান্ত স্বরূপ। একটি মৃত্যু অব্যবস্থাপনায় হাজারো মানুষের ভবিষ্যৎ শেষ পরিণতির ইঙ্গিত দিয়ে গেল।
বৈশ্বিক সংকট চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে; কোভিড-১৯ ভাইরাসের বারবার জিন পরিবর্তন এবং মানবদেহের ফুসফুসকে অকার্যকর করে মৃত্যুর পথে নিয়ে যাওয়ায়, সময় এখন যন্ত্রণাকাতর এবং নৈরাশ্যময়।
মহামারির কালে আমাদের মানবসভ্যতার একমাত্র সহায় এখন সেবা। করোনা আক্রান্ত রোগ নিরাময়ের জন্য কার্যকর কোনো ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কৃত না হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবাই একমাত্র নিরাময়ের উপায়। চিকিৎসকরাই সংকটকাল জয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন; যার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গরিবের ডাক্তার নামে খ্যাত সিলেটের ছাতকে জন্ম নেয়া ডা. মঈন উদ্দিন। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মঈন উদ্দিন নিজ পেশাকে মহিমান্বিত করেছেন ত্যাগ এবং নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে।
এ মহাসঙ্কটের কালে মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে তাকে বেদনা বিধৌত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়েছে। এই মৃত্যুশোক বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়কে অশ্রুজলে সিক্ত করেছে; দুর্নিবার চিন্তার অতলে জেগে উঠেছে আর্তনাদ আর প্রশ্ন। রাষ্ট্র কি ডাক্তার মঈন উদ্দিনের প্রতি সঠিক দায়িত্ব পালন করেছিল? চিকিৎসকরা যদি প্রয়োজনীয় তড়িৎ সেবা উপকরণ না পায়, তবে বাংলাদেশের সংকটকালীন চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা কি ঝুঁকিপূর্ণ নয়?
তার ফেসবুকের কথোপকথন থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে সংকটকালীন সময়ে আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থাপনা কতটা দুর্বল এবং নিষ্ঠুর। ফেসবুকের প্রথম স্ক্রিনশটে তিনি করোনা আক্রান্ত হওয়ার আগে একজনকে বলছেন,
“আমার জন্য দোয়া করো। হাসপাতালে পিপিই ছাড়াই কাজ করতে হচ্ছে। আপাতত কিছু পিপিই শুধু জুনিয়রদের দেওয়া হয়েছে, কারণ তারা তো রোগীর সামনে বেশি এক্সপোজ হয়”
দ্বিতীয় স্ক্রিনশট টি তিনি করোনা আক্রান্ত হওয়ার পরের। সেখানে তিনি রোগাক্রান্ত অসুস্থ অবস্থায়, নিরুপায় হয়ে মেসেজ করেছেন, (আমাকে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ট্রান্সফার করার জন্য কি একটি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করা সম্ভব?)।
শেষ পর্যন্ত ডা.মঈন এর ভাগ্যে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা কোনো সরকারি অ্যাম্বুলেন্সই জোটেনি। পরিবারের সহযোগিতায় তাকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ এপ্রিল ২০২০ বুধবার সকালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুটা কষ্টের! তার চেয়েও বেশি কষ্টের এবং লজ্জার হচ্ছে রাষ্ট্র ব্যর্থ একজন ডা. মঈনকে সহায়তা প্রদান করতে।
৫৬ হাজার আক্রান্ত রোগীর ওপর চালানো এক জরিপ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে যে, এই রোগে ৬ শতাংশ মানুষ কঠিনভাবে অসুস্থ হয় যাদের ফুসফুস বিকল হওয়া, সেপটিক শক, অঙ্গবৈকল্য এমনকি মৃত্যুর সম্ভাবনাও তৈরি হয়। ১৪ শতাংশ আক্রান্ত মানুষের মধ্যে তীব্রভাবে উপসর্গ দেখা যায় যাদের শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা তৈরি হয় এবং ৮০ শতাংশ মানুষের এর মধ্যে হালকা উপসর্গ দেখা দেয়। এদের জ্বর, কাশি ছাড়াও কারো কারো নিউমোনিয়ার উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে যারা অ্যাজমা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এ ভুগছেন তাদের কেউ আক্রান্ত হলে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে। তবে আক্রান্ত ব্যক্তি যদি শ্বাস-প্রশ্বাসের সহায়তা পায় এবং তার দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যেন ভাইরাসের মোকাবিলা করতে পারে তা নিশ্চিত করাই থাকে চিকিৎসকদের উদ্দেশ্য।
যেহেতু প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি সেহেতু দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোই মূল লক্ষ্য। আর এর একমাত্র উপায় হচ্ছে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা।
একটি মৃত্যুই জাতিকে জানান দিয়ে গেছে যে, করোনা প্রতিরোধে আলাদা কোনো সরকারি ব্যবস্থাপনাই এখনো গড়ে ওঠেনি। পর্যাপ্ত পিপিই, মাস্ক নেই; থাকলেও তা যথেষ্ট করোনা প্রতিরোধক নয়; পর্যাপ্ত আইসোলেশনের ব্যবস্থা নেই, থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা প্রদানের ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত কার্যকর নয়। চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় উপকরণ দিতে যে ব্যবস্থা ব্যর্থ তাদের পক্ষে কথা দিয়ে চিড়ে ভেজানো ছাড়া আর কিছুই করার নেই।
বর্তমানে প্রায় দেড় শতাধিক চিকিৎসক কোভিড-১৯ পজিটিভ, ২ জন মৃত আর স্বাস্থ্যসেবীদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ছে।
যেসব পিপিই পাওয়া গেছে সেগুলোর বেশির ভাগই খুবই নিম্নমানের যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত নয়। এন-৯৫ নাম দিয়ে যেসব মাস্ক চিকিৎসকদের দেওয়া হয়েছে সেগুলোর অধিকাংশই নকল।
মার্কেটে বা সরকারের স্টকে এন-৯৫ নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য চিকিৎসা উপকরণ পাঠানো হয়েছিল ব্যবহারের জন্য। সেখানে কার্টনের ওপরে লেখা এন-৯৫ কিন্তু ভেতরে নিম্নমানের কাপড়ের মাস্ক। এ ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিব্রত হলেও প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। (সূত্র:১১ এপ্রিল ২০২০, প্রথম আলো অনলাইন)
এটি একটি সংবাদ এবং এই সংবাদে যা ঘটেছে তা হচ্ছে প্রতারণা; অর্থাৎ এই সংকটকালে রাষ্ট্র নিজেই জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। অন্যায়ভাবে ক্ষমতা প্রয়োগের ধারাবাহিক নমুনাতে যদিও আমরা অভ্যস্ত তারপরও ভিন্ন পরিস্থিতিতে ক্ষমতার অসহায় প্রেষণা কমেনি একটুও। নোয়াখালীর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের সহকারী সার্জন (অ্যানেসথেটিস্ট) হিসেবে কর্মরত চিকিৎসক আবু তাহের ১৬ এপ্রিল ২০২০ এ নিজের ফেসবুকে লিখেছেন, “রোগীর সবচেয়ে কাছে থেকে আমি চিকিৎসা দিই। গত এক মাসে প্রতিদিন হাসপাতালে গিয়েছি। এখন পর্যন্ত আমিসহ আমার বিভাগের কেউ একটিও এন-৯৫ মাস্ক পাইনি। তাহলে স্বাস্থ্যসচিব মিথ্যাচার কেন করলেন, উনি এন-৯৫ মাস্ক দিচ্ছেন? তাও প্রধানমন্ত্রীকে মিথ্যা বলতেছেন? এই মিথ্যাচারের শাস্তি কী হবে? গত এক মাসে আমার বিভাগের আটজনের জন্য দুইটি পিপিই দেওয়া হয়েছে। অথচ এই সময়ে ১৫০টির বেশি অপারেশন আমি করেছি।” (সূত্র: ১৮ এপ্রিল ২০২০, প্রথম আলো অনলাইন)
স্বাস্থ্যসচিবের বিরুদ্ধে সেবাদানের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলায় উল্টো চিকিৎসককে শোকজ করা হয়েছে। এখানে শোকজটি কিন্তু করা হয়েছে অন্যায়কারীর পক্ষে। অর্থাৎ যে দেশে যথাযথ চিকিৎসাপণ্য সরবরাহ না করে উল্টো চিকিৎসককে শোকজ দেয়া হয় সেখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা কি গণমানুষের জন্য কার্যকর হয়ে উঠতে পারবে?
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রামের সরকারি হাসপাতালে নেই কোনো আইসিইউ এবং ভেন্টিলেটর। চট্টগ্রামে ১২টি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ ব্যবহার করা যাবে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বলা হয়েছে কিন্তু কোনো হাসপাতালেই রোগী ভর্তি করানো হচ্ছে না। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন বলেন “ করোনা প্রতিরোধে যে ব্যবস্থাপনা করা দরকার সেখানে শুভংকরের ফাঁকি রয়ে গেছে” (সূত্র: যমুনা টিভি) । নারায়ণগঞ্জের সিপিবি নেতা, ১৪ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সাধারণ সম্পাদক বিকাশ সাহা গত ১৮ এপ্রিল রোববার কুর্মিটোলা হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছেন। বিকাশ সাহার সন্তান অনির্বাণ সাহা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, তার বাবাকে কোনো চিকিৎসাসেবাই দেওয়া হয়নি। শ্বাসকষ্ট থাকা সত্ত্বেও বেলা ১টায় হাসপাতালে নিয়ে গেলে ভর্তি নেন বিকেল ৪টায়। (সূত্র: ১৯ এপ্রিল ২০২০, মানবজমিন অনলাইন)
একজন মুমূর্ষু করোনা আক্রান্ত রোগী ভর্তি নিতেই যদি ৩ ঘণ্টা সময় লাগে তবে জরুরি চিকিৎসা সেবাদানের স্বরূপ আর আলাদা করে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন নেই। এই পরিস্থিতিতে কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়েও আরও দুজন ডাক্তার, মিটফোর্ডে ৪৪ জনসহ প্রায় দেড় শতাধিক ডাক্তার কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছেন। পিপিই ছাড়া কিংবা ভুল পিপিই (যা হু স্বীকৃত নয়) তা দিয়ে যদি দায়িত্বরত চিকিৎসকরা সেবা দিতে থাকেন তবে আরো ভয়ংকর ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। অর্থাৎ করোনা প্রতিরোধে সত্যিকার অর্থেই রাষ্ট্রীয় প্রণোদনায় জরুরি সেবা ব্যবস্থাপনা আসলে অন্ধের ষষ্ঠী’র মতো হয়েছে। যা কিছু হয়েছে মুখে মুখে হয়েছে, আর মন্ত্রী সাহেবদের কল্পনায় হয়েছে।
৮ মার্চ ২০২০ প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে আর এত দিনেও বিশ কোটি জনসংখ্যার দেশে পাঁচ লাখ রোগীর জন্যও আইসোলেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়নি। সারা দেশে কোভিড-১৯ শনাক্তের পর্যাপ্ত কিট পৌঁছানো হয়নি; নেই পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থাও। আবার করোনা টেস্ট করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ নেই কারণ সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রায় ১১ বছর ধরে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদে নিয়োগই হয়নি। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ মতে প্রতি চিকিৎসকের অনুপাতে পাঁচজন টেকনোলজিস্ট থাকা প্রয়োজন কিন্তু বাংলাদেশে রয়েছে গড়ে একজন। মাস্ক আর পিপিই নিয়ে তো কেলেঙ্কারির শেষ নেই; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই খবর গুলো ভাইরাল হয়েছে। চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যসেবা দানকারীদের আলাদা থাকার ব্যবস্থা, যানবাহনের ব্যবস্থা কিছুই করা হয়নি। আসলে করোনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের যুদ্ধটা শুরুই হয়নি, আসলে করোনা মাঠে নেমে গেছে কিন্তু আমরা এখনো খেলার মাঠে পৌঁছাতে পারিনি। আমাদের কার্যকর চিকিৎসাসেবা পাওয়াটা হীরক রাজার দেশের হিরা পাওয়ার মতো, যা একজন গোপী এবং একজন বাঘা নাজিল হওয়া ব্যতীত সম্ভব নয়।
শুধুই ব্যতিক্রম ইতিহাস হয়ে রইল ডা. মঈন উদ্দিন; যিনি দায়িত্বপালনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন মানুষের জন্য তিনি মৃত্যুকে বরণ করেছেন মানুষের জন্য; সর্বজনীন চেতনাকে লালন করে নির্লোভ উৎসর্গীকৃত জীবন দর্শনে আপ্লুত ছিলেন তিনি। তার প্রতি রইল অসীম শ্রদ্ধা ।
লেখক : শিক্ষক, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি।
