জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। বাঙালি উন্নত জীবনের অধিকারী হোক, বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক, এই ছিল তার আজীবন কামনা। প্রত্যহ, জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত দেশ এবং দেশবাসীর প্রতি আত্মনিবেদনে উন্মুখ ও অবিচল থাকতেন তিনি। বঙ্গবন্ধু বারবার প্রায় মন্ত্র উচ্চারণের মতো বলেছেন, ‘আমার দেশের জনসাধারণকে আমি ভালোবাসি, তারাও ভালোবাসে আমাকে।’ এই বাক্য উচ্চারণের সময় গর্বে স্ফীত হতো তার বুক। বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য জীবনের প্রতিটি স্তরেই রয়েছে সুখী-সমৃদ্ধ, মানবিক বাংলাদেশ গড়ার ইতিবৃত্ত ও কালোত্তীর্ণ মুক্তি-দর্শনের পথ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চর্চিত ও প্রচারিত রাজনৈতিক দর্শন মুজিববাদ। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা মুজিববাদের চার মূলনীতি। ঐতিহাসিক ছয় দফার ওপর ভিত্তি করে চার মূলনীতি গড়ে উঠেছে। ১৯৭২ সালের ৭ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, আগে স্লোগান ছিল ছয় দফা, এখন ৪টা স্তম্ভ। ১৯৭২ সালের সংবিধানে মুজিববাদের চার স্তম্ভ, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছে। ৪ নভেম্বর ১৯৭২ সালে জাতীয় সংসদে সংবিধান (গৃহীত) বিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণে এই চার মূলনীতির ব্যাখা ও প্রাসঙ্গিকতা স্পষ্ট হয়। বঙ্গবন্ধুর শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ অনেক আগে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হতো।
১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধীদলের সম্মেলনের পূর্বদিন সাবজেক্ট কমিটির সভায় শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা পেশ করেন। কিন্তু সম্মেলনের উদ্যোক্তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং পরের দিন পশ্চিম পাকিস্তানের পত্র-পত্রিকা বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিত্রিত করে। ফলে বঙ্গবন্ধু ঐ সম্মেলন বর্জন করেন। ছয় দফার অন্যতম দাবি ছিল পূর্বপাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা। ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের কর্মসূচি গৃহীত হয়। ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ‘আমাদের বাঁচার দাবি: ৬ দফা কর্মসূচি’ শীর্ষক একটি পুস্তিকা শেখ মুজিবুর রহমানের নামে প্রচারিত হয়। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ছয় দফার পক্ষে দেশব্যাপী হরতাল ডাকা হয়।
শেখ ফজলুল হক মনি’র ‘ছেষট্টির সাত জুন: প্রস্তুতি পর্ব’ নিবন্ধ পাঠে জানা যায়, মওলানা ভাসানীর ন্যাপসহ আরও কিছু বাম সংগঠনের আপত্তি থাকায় ছয় দফার পক্ষে জনসমর্থন আদায় এবং হরতাল সফল করা অত্যন্ত কঠিন। তার ওপর শেখ মুজিব জেলে। ৭ জুন ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ঐ নিবন্ধে শেখ মনি বলেছেন, ‘মানিক মামার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি বললেন, ইত্তেফাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও তিনি পিছপা হবেন না। শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য তিনি সবকিছু করবেন।’ ‘এদিকে জেলখানা থেকে বঙ্গবন্ধু জানতে চেয়েছেন হরতালের প্রস্তুতি কতদূর কী হলো সেটা সম্পর্কে। গভীর রাতে পেছনের দেয়াল টপকিয়ে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গেলাম। মামিকে বিস্তারিতভাবে সবকিছু জানিয়ে বললাম, রাতের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য। হরতাল হবেই।’ ৭ জুনের হরতালকে সফল করতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শ্রমিকদের সংগঠিত করেছিলেন শেখ মনি। ঐ হরতালে পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে টঙ্গী, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ ১১ জন বাঙালি শহীদ হন।ইতিহাসবিদরা বলেন, ওই হরতাল সফল না হলে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম পিছিয়ে যেত।
ছয় দফা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকার কারণে শেখ মনি’র বিরুদ্ধে হুলিয়া জারিসহ আটটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ফলে ১৯৬৮ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়া হলেও শেখ মনি মুক্তি পাননি। কারাগারের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘ছয়দফা প্রস্তাব জনগণের সামনে পেশ করার পর থেকে সরকার আমার ওপর অত্যাচার চালাইয়া যাচ্ছে। ...আমার ভাগনে শেখ ফজলুল হক মনি ও আরও অনেকে ১৯৬৬ সাল থেকে জেলে আছে এবং সকলের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়েছে।’ বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার ওপর ভিত্তি করে ১৯৭০ সালের যে নির্বাচন, সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহার প্রণয়ন থেকে শুরু করে জয়লাভ পর্যন্ত একই প্রেরণা কাজ করেছে। ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনসহ বাঙালির অধিকার বাস্তবায়নের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নির্বাচনী ইশতেহার ও কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক, [email protected]
