কুর্দিস্থান ইন্সটিটিউট অব প্যারিসের ২০১৭ সালের হিসাবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন কুর্দ জনগোষ্ঠী। চতুর্থ বড় নৃগোষ্ঠী কুর্দিরা মধ্যপ্রাচ্যে। তাদের কোনো স্বাধীন দেশ নাই, জাতি-রাষ্ট্র নাই। পশ্চিম এশিয়ার বড় রাষ্ট্ররা তাদের স্বাধীনতা দিচ্ছে না কৌশলগত ভৌগলিক অবস্থানের কারণ দেখিয়ে। তুরস্ক ইরান ইরাক সিরিয়ার দখলে থাকা কুর্দ জনগোষ্ঠীর পাহাড়ি সে অঞ্চলের নাম কুর্দিস্তান। কিন্তু আছে ভাগ হয়ে চৌদিকের দেশগুলোর ভিতরে। মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৫% মুসলিম সুন্নি। উল্লেখ্য, ১১৮৭ সালে দ্বিতীয় ক্রুসেডে কুর্দি সুন্নি মুসলিম বীর সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার ইউরোপীয় জোটকে পরাজিত করে জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেছিলেন। এই গাজী সালাহউদ্দিন আইয়ুবিই ‘আইয়ুবি রাজবংশ-র প্রতিষ্ঠাতা। যে রাজবংশ ১১৭১ সাল থেকে ১২৬০ সাল পর্যন্ত বিস্তারিত আরব অঞ্চল শাসন করেছিল। রাজধানী ছিল তিন জায়গায়—কায়রো, দামেস্ক, আলেপ্পো। কিন্তু গাজী সালাহউদ্দিনের নৃগোষ্ঠী কুর্দিদের স্বাধীন দেশ নাই।
প্রশ্ন হল, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান কেন কুর্দিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে আসছেন? তুরস্কের জন্যে নিরাপত্তার হুমকি? দেশভিত্তিক তুর্কি জাতির নিরাপত্তা? মানে দেশভিত্তিক জাতীয়তার প্রয়োজনে কি কুর্দিদের স্বাধীনতার আন্দোলন দমন করছে তুরস্ক? ব্যাপারটা এমন হয়ে গেল না যে, নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্ব ধরে রাখতে অন্যদেরকে সার্বভৌম হতে না দেয়া? এই কারণেই প্রায় তিন লাখ কুর্দিকে তাদের বাড়ি-ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে? নাকি সুন্নি মুসলিম ভাতৃত্ববোধ বড় নয়, বড় বিষয় হল ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ধরে রাখা? তুরস্কের ভিতরে পূর্ব-দক্ষিণে ও পূর্ব আনাতোলিয়ায় কুর্দিরা থাকেন। তুর্কি সরকার তাদেরকে বলে ‘পাহাড়ি তুর্ক’। এ অঞ্চলে লাগোয়া উত্তর সিরিয়ায় কুর্দিরা সবচেয়ে বড় নৃগোষ্ঠী। তুরস্কের জনসংখ্যার ১৮%, মানে কুর্দি-তুর্কি প্রায় ১৮ মিলিয়ন। এরদোগান ইসলামের দোহাই দিচ্ছেন কুর্দি স্বাধীনতাকামীদের ঠেকাতে। ইরাক নিয়ন্ত্রিত কুর্দিস্তানের রাজধানী আর্বিলের জলিল খায়াত মসজিদের ইমাম মাসউদ জুমআর নামাজের খুৎবায় বলছিলেন, ‘ইস্তাম্বুল ও আংকারার যেসব আলেম কুর্দি হত্যার পক্ষে ফতোয়া দিচ্ছেন, তারা মিথ্যা বলছেন’। ইমাম সাহেব মুসল্লি-ভরা বড় মসজিদটির খুৎবায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের একটি টুইটের জবাব দিচ্ছিলেন। এরদোগান বলেছিলেন কুর্দিদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাওয়া সব সৈন্য ‘মুহাম্মদের সৈন্য’। তিনি তাদের কপালে চুমু দিয়ে পাঠিয়েছেন। ব্যাপারটা হয়ে গেল, সৌদি জোট কর্তৃক ইয়েমেনে আক্রমণের পক্ষে সৌদি মুফতির রায় দেয়া এবং এ জোটের বিপক্ষে থাকা কাতারের মুফতি কর্তৃক সৌদি জোটের বিপক্ষে ফতোয়া দেয়া। মানে ক্ষমতার পক্ষে ও বিপক্ষে ধর্মের দলিল প্রদর্শন। ইমাম মাসউদ তাঁর বক্তব্যে রায় দিচ্ছিলেন এভাবে, ‘ইরাকের কুর্দিস্তান কুর্দিদের ভূমি, তুর্কি কুর্দিস্তান কুর্দিদের ভূমি, সিরিয়ার কুর্দিস্তান কুর্দিদের ভূমি, এসব ভূমি আপনাদের, যারা এ ভূমি দখল করতে আসবে, তাদের হত্যা করুন বেদরদি হয়ে’। তবে এটাও ঠিক যে কুর্দিস্তানগুলোর অনেক ইসলাম ধর্মীয় নেতা তুর্কি অভিযানের বিরুদ্ধে কিছু বলেন না। আর্বিল হল, ইরাকের চারটি বড় শহরের একটি। বাগদাদ, বসরা, মসুল ও আর্বিল। খৃষ্টপূর্ব ৬ হাজার বছর আগেও এ শহরে মানুষের বসতি ছিল। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন শহরগুলোর একটি। ওসমানীয় শাসনামলে কুর্দিস্তান স্বায়ত্বশাসিত ছিল।
উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে এরদোগান মসজিদুল আকসা ইসরাইলের দখলমুক্ত করার অঙ্গিকার ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এক সময়ের জেরুজালেম পুনরুদ্ধারকারী গাজী সালাহউদ্দিন আইয়ুবি যে নৃগোষ্ঠী থেকে এসেছেন, সেই গোষ্ঠীর স্বাধীনতাকামীদের উপর কেন বোমা ফেলছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান?
বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব আনাতোলিয়ায়, ইরানের উত্তর-পশ্চিম, ইরাকের উত্তরাংশ, এবং সিরিয়ার উত্তরাংশ জুড়ে রয়েছে কুর্দি মানুষের আবাস্থল। ইরাকের উত্তরের কুর্দিস্তানের প্রায় সাত মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর স্বশাসিত সরকার ব্যবস্থা ১৯৭০ থেকে। কিন্তু ইরাকের সার্বভৌমত্বের অধীন।
পুরো কুর্দিস্তানের কুর্দিরা শত শত বছর ধরে নিগ্রহের শিকার। ইউরোপ আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া আরব আফ্রিকায় ছড়িয়ে আছে দেড় মিলিয়নের বেশি ডায়াসপোরা কুর্দ। ডায়াসপোরা মানে যারা কোনো কারণে মাতৃভূমি ছেড়ে, আপন সংস্কৃতির বাইরে অন্য দেশে অন্য সংস্কৃতির মাঝে থাকে। কুর্দি নারী পুরুষের দেহের গঠন বলিষ্ঠ ও সুন্দর।
ষোড়শ শতকে ইরানের সাফাভি রাজবংশ তাদের বিদ্রোহ দমন করেছে কঠোর হাতে। শাস্তি দিয়েছে মারাত্মকভাবে। পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে খোমেনির নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে বিপ্লব পর্যন্ত শাহ পাহলভি রাজবংশের নির্যাতন চলে কুর্দ নৃগোষ্ঠীর উপর। ১৯৮৮-তে আল আনফাল ক্যাম্পেইনে সাদ্দাম হোসেনের সেনারা প্রায় এক লাখ আশি হাজার কুর্দি খুন করেন। ১৯৯১-এ সাদ্দাম আবারও প্রায় এক লাখ বিদ্রোহী হত্যা করেন।
বিচারের সময় সাদ্দাম দাবী করেন, "কুর্দিদের প্রতি বৈষম্য করি নি আমি। আমার রিপাবলিকান গার্ডের দুটি ব্রিগেড শুধু কুর্দিদের দ্বারা গঠন করেছিলাম। কিন্তু পরে আমি প্রমাণ পেলাম তারা আরব—কুর্দ বিবাদ লাগাতে তৎপর। তাছাড়া, তারা ইরানের সাথে ইরাকের যুদ্ধের সময় ইরানের পক্ষে থাকে।"
সাদ্দামের বিচারের সময় আমেরিকান কুর্দি ক্যাটরিন ইলিয়াস মিখাইল কোর্টে জানান, ১৯৮৭ সালের ৫ জুন সাদ্দাম হোসেনের সৈন্যরা কুর্দিস্তানের কালিজেওয়া শহরে বিমান থেকে কেমিক্যাল ওয়েপন ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করে। সাদ্দাম বলছিলেন কুর্দিদের হত্যার ব্যাপারে তার ও ইরাকের জনগণের অনুতপ্ত হওয়ার কিছু নাই। কারণ তার মতে কুর্দিরা বিশ্বাসঘাতক, দোষী। আসলে কুর্দিদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে ঐ নেতারা, যারা ছিল কুর্দি আর্মি অফিসার এবং তারা সাদ্দামের সহযোগী ছিল। পরে ১৪৮ শিয়া হত্যার দায়ে সাদ্দামসহ সাত জনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়।
কুর্দিস্তানের বিদ্রোহীরা চৌদিক থেকে মার খাচ্ছে। কিছু দিন পর পর ইরাক ও সিরিয়ার কুর্দি যোদ্ধাদের মারছে তুরস্ক। তুরস্ক চায় না কুর্দিদের আলাদা রাষ্ট্র হোক। তুরস্কের আছে তাদের টিকে থাকার যুক্তি। তাছাড়া কুর্দি মিলিশিয়ারা পরাশক্তির সাহায্য-যে নিচ্ছে নিজেদের দরকারে তাও সত্য। ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় কুর্দিস্তানে তুরস্ক সামরিক অভিযান চালিয়েছে গত বছরও। কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকে’র শীর্ষ পর্যায়ের এক গেরিলা নেতা হালমাত দিয়ার নিহত হয়েছেন। তারা ১৯৮৪ সাল থেকে আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করছে।
আমার দুজন ইরাকি কুর্দি কবিবন্ধু ছিলেন। তারা ইরাকের কুর্দিস্তানের বাসিন্দা। ইরাকে সাদ্দামকে সরানোর জন্যে আমেরিকার জোটের অভিযানের আগে তাদের সাথে কথা বলতাম অনলাইনে দু'চার দিন পর পর। তারা ছদ্মনামে অনলাইনে আসতেন। ইংরেজিতে কথা বলতাম আমরা। আরবি তারা খুব কম জানে। তাদের ভাষা ফারসি ঘেঁষা। আরবি ও প্রাচীন আরামায়িক ভাষার প্রভাবও আছে। একজন ভার্সিটিতে ফিজিক্সের ছাত্র ছিল। কবিতাও লিখত বেশ স্পর্শ করে এমন। খুব হতাশা প্রকাশ করতো মাঝে মাঝে। যাতনাভরা জিবনের কথা বলতো। আমি তাকে আশাব্যঞ্জক কথা বলতাম। বলতাম পুরোদমে স্বাধীন কোথাও কেউ না। পাখিরাও আকাশে সীমাতেই ওড়ে। বায়ুমণ্ডল ছেড়ে, পৃথিবীর অভিকর্ষের এরিয়া পার হয়ে আউটার স্পেসে কোনো পাখি ইচ্ছা করলেও যেতে পারে না। স্বাধীন দেশগুলোও বেশিভাগ অর্থনৈতিকভাবে পরনির্ভরশীল। মানুষের মন নানাভাবেই পিঞ্জরের পাখি। একবার ইশারায় বলল আমাকে ইউরোপ আমেরিকায় মানুষ কতো স্বাধীন। আমি জানাই, ওখানেও স্বাধীনতা সীমিত। বাইন্ডিংস আছে এবং হতাশাও আছে। কোনো রাষ্ট্রই জনগণকে একেবারে বেপরোয়া চলতে দেয় না। তুমি স্বচ্ছন্দে নিরাপদে গাড়ি চালাবার জন্যেই তোমাকে ট্রাফিক আইনের সীমাতে চলতে হবে। সে আমার পজেটিভ কথার প্রশংসা করতো।
২০০৩ এর ইরাক যুদ্ধের সময় মাঝে মধ্যে টুকটাক কথা হতো। পরে আর তাদের দেখা পাই নি। তারা কি বেঁচে আছে এই সংঘাতমুখর পৃথিবীতে? জানি না!
আলাপ শেষে গুড বাই বলতো কুর্দিশ ভাষায়— 'বি খাতেরে ওয়ে'। গুড মর্নিং তাদের ভাষায়— 'সিবে খের'। আরবিতে 'সুবাহ আল খায়র'। তাদের ভাষায় অকে = তেমাম, আই এ্যাম সরি = 'বি বোরে'। জিরো = 'সিফর'। আরবিতে সাফার। গণনা তাদের— ইয়েক দো সে চার পেঞ্চ...। গণনা প্রায় ফারসি, কয়েকটা কেবল ভিন্ন উচ্চারণ। কুর্দিশ ভাষারও কিছু উপভাষা আছে।
চৌদিকে বড় রাষ্ট্র থাকায় এবং বড়দের জন্যে ঐ অঞ্চল স্ট্রাটেজিক পয়েন্ট হওয়ার কারণে তারা কুর্দিদের স্বাধীন হতে দেয় না। কুর্দিরা স্বাধীন কুর্দিস্তান প্রতিষ্ঠা করবে কবে কে জানে। ইতিহাস দেখায়, এক সময়ের খুব ছোট নৃগোষ্ঠী পরবর্তীতে বিশাল জনগোষ্ঠী হয়েছে। আবার এক সময়ে বিশাল জনগোষ্ঠী ছোট নৃগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। যেমন: সিরিয়ার আরামায়িক ভাষার মানুষগুলো। এক সময় বিস্তারিত মধ্যপ্রাচ্যে লিংগুয়া ফ্রাংকা ছিল আরামায়িক ভাষা। ঈসা আ: নবির ভাষা ছিল আরামায়িক। এখন তো বাইশটি আরব দেশ মিলে আরব বিশ্ব। প্রাচীন আরব এ্যাথনিক গ্রুপ ছিল ছোট একটি
ভবঘুরে বেদুইন গোত্র, যারা বর্তমান সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে বাস করতেন। অঞ্চলটি হেজাজ নামে পরিচিত। এখন চার শ পঞ্চাশ মিলিয়নের বেশি মানুষ আরবি ভাষায় কথা বলে এবং আরব দুনিয়া ঘিরেই বিশ্ব রাজনীতির অর্থনীতির হিসাব।
লেখক: সারওয়ার চৌধুরী, অনুবাদক ও কবি।
