এ কথা নতুন করে বলার কিছু নেই যে, পোশাক খাতের উপর আমরা কতটা নির্ভরশীল। আমাদের সর্বোচ্চ ও প্রধান রপ্তানি পণ্য এই তৈরি পোশাক। শুধু তাই না, পোশাক রপ্তানিতে বর্তমানে আমরা বিশ্বে তৃতীয়। কয়েক দিন আগেও যা ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) ২৭ বিলিয়নেরও বেশি আয় করা এই খাতে বিশ্বে প্রথম অবস্থানে রয়েছে চীন এবং দ্বিতীয় অবস্থানে ভিয়েতনাম।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের এই ক্রমবিকাশকে কোভিড-১৯ মহামারি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এমন এক সময়ে করোনা আঘাত হেনেছে যখন জাতি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে। শুধু তাই নয়, এ বছরই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে। ২০২৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এর স্বীকৃতি মিলবে।
এলডিসিভুক্ত দেশ হওয়ায় রপ্তানিতে বাংলাদেশ জেনারেলাইজড সিস্টেম অফ প্রিফারেন্সেস (জিএসপি) সুবিধা পেয়ে থাকে। এর ফলে বিনা শুল্কে বাংলাদেশি পণ্য ওই বাজারে প্রবেশ করতে পারে। আমেরিকা বাংলাদেশের জন্য এই সুবিধা বাতিল করলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশ এই সুবিধা পাচ্ছে, যা ২০২৯ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে এই জোটের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া ইইউ থেকে সদ্য বিচ্ছেদ হওয়া যুক্তরাজ্যও বাংলাদেশের জন্য এই সুবিধা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার কথা ঘোষণা দিয়েছে। মোট রপ্তানির ৬৪ শতাংশ এই দুই বাজারেই হয়ে থাকে। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু দেশে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পেয়ে থাকে, যা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পরেই বন্ধ হয়ে যাবে। কথা হলো, ২০২৯ সালের পর কি হবে?
পোশাক কারখানা মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সম্প্রতি একটি গবেষণা করে। সেখানে দেখা যায়, জিএসপি সুবিধা বাতিল হলে বাংলাদেশ তার পোশাকের বাজারে বাৎসরিক ৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি কমে যাবে বা লোকসান হবে। এমনটা হলে যে শুধু পোশাক খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে তেমন না।
পুরো অর্থনীতির ওপরই এর প্রভাব পড়বে। সুতরাং এ কথা বলতেই হয়, আমাদের হয় জিএসপি সুবিধা ধরে রাখতে হবে অন্যথায় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে হবে। তবে এফটিএ করলে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় প্রভাব পড়বে। এ জন্য আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো রাস্তা হলো জিএসপি অব্যাহত রাখা।
বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিজিএমইএর সভাপতি টিপু মুনশি ইতিমধ্যে ইইউ’তে ২০২৯ পরবর্তী জিএসপি প্লাস সুবিধার আওতায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আবেদন করেছেন। তবে, জিএসপি প্লাস সুবিধার যে পরিধি ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনুমোদন করেছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ তার চেয়ে বেশি।
অবশ্য, বাণিজ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণে তৈরি পোশাক খাতের যে বাস্তব অবদান রয়েছে তা বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য জিএসপি প্লাস সুবিধা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে যুক্তি প্রদান করেন।
অনেকটা বর্তমান জিএসপি সুবিধার মতোই এই জিএসপি প্লাস। এর ফলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭ দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার রয়েছে তা অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত হবে। তবে, এই নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে বেশ কিছু নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের বিষয় রয়েছে, যার মধ্যে শ্রম আইন, কর্মস্থলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, শ্রমিক কল্যাণ সমিতি বা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও শিশু শ্রম সংক্রান্ত বিধি-বিধান রয়েছে।
২০০৬ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইন প্রণয়ন করা হয়, যার সবশেষ সংশোধন হয় ২০১৫ সালে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পেরেছে বলেই আমি মনে করি। শ্রমিকেরা এখন সময়মতো বেতন তো পাচ্ছেই, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতেও কাজ চলছে।
দেশের কারখানাগুলো এখন অনেক আধুনিক। ইতিমধ্যে ৫ শতাধিক কারখানা আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণী এলইইডি বা গ্রিন কারখানার সনদ পাওয়ার জন্য আবেদন করেছে। দেশে মোট এলইইডি সনদপ্রাপ্ত কারখানা ১৪৫টি এর মধ্যে পোশাক খাতেরই শতাধিক। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০টি কারখানার মধ্যে ৭টিই এখন বাংলাদেশে। এ ছাড়া রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) এলাকার জন্য আলাদা আইনের মাধ্যমে শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে।
পোশাক খাতের মূল ধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে আমাদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের মধ্যে একটি হলো – এই শিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন বাধ্যতামূলক অনুমোদন প্রদানের ধারণা। কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি তো দূরের কথা, বাংলাদেশের ব্যর্থ ও সমস্যাগ্রস্ত ট্রেড ইউনিয়নের ইতিহাস রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক খাতে নিবন্ধিত ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা ৮০ এবং ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সংখ্যা ১৫ এবং এখানে মোট সদস্য সংখ্যা ৫০ হাজার ১৪৯ যা এই খাতে মোট কর্মরত শ্রমিকের মাত্র ২ শতাংশ। দশকের পর দশক ধরে কাজ করা শ্রমিকরাও ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চাচ্ছে না বা তাদের এই সম্পর্কিত ধারণা নেই। কিন্তু রপ্তানিকারকদের শর্তের কারণে আমাদের ট্রেড ইউনিয়নকে রাখতে হবে এবং বেশ কিছু অগ্রগতি সাধন করতে হবে।
ক্রেতাদের শর্ত মানতে আমাদের আবার শ্রম আইন সংশোধন নিয়ে কাজ করতে হবে। একজন আইনজীবী হিসেবে আমি মনে করি, উভয় ক্ষেত্রেই আমার অনেক কিছু করার আছে। যে কোনো সংশোধনী হতে হবে এমন যাতে শ্রমিক ও ইউনিয়ন উভয়ই লাভবান হয়। দুটোরই স্বাধীন অস্তিত্ব থাকা অত্যাবশ্যক।
এই সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো - একটি ইউনিয়ন বান্ধব পদ্ধতির সফল বাস্তবায়ন। ট্রেড ইউনিয়নের যথাযথ কার্যকারিতা ও বাস্তবায়ন দেখভাল করার জন্য নিয়োগকৃত নেতৃবৃন্দ নিজেরাই প্রায়ই ইউনিয়নের মৌলিক বিধিবিধান লঙ্ঘন করে থাকেন। গতানুগতিক ট্রেড ইউনিয়নের লালনের মধ্যে উভয় পক্ষের কল্যাণ না থাকার পাশাপাশি এটি ক্রমপরিবর্তনশীল রপ্তানি খাতের সঙ্গেও খাপ খাওয়াতে পারছে না। তৈরি পোশাক খাত হলো দেশের প্রধান রপ্তানি খাত। তাই এখানকার ট্রেড ইউনিয়ন এমন হওয়া প্রয়োজন যার মাধ্যমে অর্থনীতি ও সাধারণ শ্রমিক উভয়ই লাভবান হয়। গুটি কয়েক মানুষের স্বার্থ হাসিলের জন্য এত ঝক্কির প্রয়োজন কি? আমাদের আইনের সংশোধনী যদি আনতেই হয় সেক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর হয় এমন সংশোধনী আনতে হবে।
এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী সংকট মোকাবিলায় আমাদের জন্য যেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হলো পণ্যের বৈচিত্র্য আনা।
আমেরিকা, যুক্তরাজ্য ও ইইউর বাইরে আমাদের রপ্তানির পরিমাণ খুবই কম। তাই আমাদের যতটা সম্ভব নতুন বাজার বৃদ্ধির চেষ্টা করতে হবে। করোনা পরবর্তী নতুন পৃথিবী তারাই টিকে থাকবে, যারা বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। পণ্যে বৈচিত্র্য আনা ও নতুন বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। যেসব ক্রেতা চীন ছাড়ছে যেকোনো মূল্যে তাদের বাংলাদেশে আনতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে আমাদের পণ্য হতে হবে গুণগত মানসম্পন্ন ও বৈচিত্র্যতার নিরিখে উৎকৃষ্ট।
আমরা এলডিসি থেকে উত্তরণ করতে যাচ্ছি কিন্তু আমাদের কারিগরি সক্ষমতা কতটুকু বেড়েছে এই প্রশ্ন থেকে যায়। বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দিকে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আধিক্য সর্বত্র। কিন্তু আমাদের কারখানাগুলো এখনো এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে। এ জন্য আমাদের পণ্যের উৎপাদন মূল্য বেড়ে যাচ্ছে। পিছিয়ে পড়ছি প্রতিযোগিতা থেকে। সমস্যা হলো কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতার অভাবে আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দিকে যেতে পারছি না।
বিশ্বে এখন ম্যান মেইড ফাইবারের পণ্য বেশি চলছে। অথচ বাংলাদেশে মাত্র ২৫ শতাংশ ম্যানমেইড ফাইবারের পণ্য উৎপাদন হয়। এমন পিছিয়ে থেকে আমরা প্রতিযোগিতায় টিকবো কীভাবে? অথচ এলডিসি উত্তরণের পর আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ অগণিত। তাই যত দ্রুত সম্ভব আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবিলায় আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থাপনার প্রতিযোগিতায়ও টিকতে হবে।
আমি মনে করি, ইইউসহ অন্যান্য দেশে জিএসপি প্লাস সুবিধা অব্যাহত রাখতে একটি কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। কেন আমরা এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য সেই বিষয়টি প্রমাণ ও যুক্তি সহকারে উপস্থাপন করতে হবে। শ্রমিক অধিকার ও কারখানার আধুনিকায়নে আমরা যে কাজ করেছি সেগুলো তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। তাদের জানাতে হবে, কেবল শ্রমিকের নিরাপত্তার জন্যই আমরা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছি।
করোনাকালে যখন ক্রেতারা তাদের ক্রয়াদেশ বাতিল করেছে আমরা তখনো শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিয়েছি। আর এখানে ট্রেড ইউনিয়নের কোনো ভূমিকা ছিল না। আমাদের এটাও বোঝাতে হবে, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে ট্রেড ইউনিয়নের শতভাগ বাস্তবায়নের অবস্থানে আমরা নেই। কিন্তু আমরা ট্রেড ইউনিয়ন কার্যকরের ক্ষেত্রে সহায়ক।
আমাদের এখানকার যারা ইউনিয়ন করে তারা বিনা বাধায়ই করতে পারছে। প্রত্যেকটি কমিটিতে তাদের অংশগ্রহণ আছে। আমরা যদি এখনই সমন্বিত পরিকল্পনা করে এগোতে না পারি তাহলে এলডিসি উত্তরণ আমাদের জন্য বিপজ্জনক হবে বলেই মনে করি।
লেখক: ব্যারিস্টার শেহরিন মুর্শেদ ঐশী
পরিচালক, এনভয় গ্রুপ
