যাত্রী হয়রানি ও ভাড়ায় নৈরাজ্য বন্ধের পদক্ষেপ কোথায়

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:৩৫ এএম

দেশের গণপরিবহনে যাত্রী হয়রানি, ভাড়ায় নৈরাজ্য, পরিবহনের বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা আর সড়ক দুর্ঘটনায় একের পর এক প্রাণহানি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। যাত্রীর স্বার্থ এখন পদে পদে ভূ-লুণ্ঠিত। বেসরকারি খাতের পরিবহনগুলোতে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে। যাত্রী অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে অথবা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে প্রতিবাদ করলে যাত্রী সাধারণকে কথায় কথায় অপমানিত করা হচ্ছে। এক কথায় দেশের যাত্রী সাধারণ এখন গুটিকতক দুর্বৃত্ত পরিবহন মালিক-শ্রমিকের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এহেন পরিস্থিতিতে যাত্রী অধিকারের বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের সামনে আনতে প্রতি বছর ১৩ সেপ্টেম্বর যাত্রী অধিকার দিবস পালন করে আসছে দেশের যাত্রী অধিকার ও সড়ক নিরাপত্তায় নিয়োজিত সামাজিক সংগঠনগুলো।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে দেশে ৩য় বারের মতো যাত্রী অধিকার দিবস পালিত হচ্ছে এবার। নাগরিকদের যে কোনো গন্তব্যে যাতায়াতের জন্য গণপরিবহন ব্যবহার করতে হয়। সুতরাং প্রতিটি নাগরিকই কোনো না কোনো পরিবহনের যাত্রী। যদিও আমরা স্বল্প সময়ের জন্য পরিবহনের যাত্রী হই। এই অল্প সময়ের যাত্রায় নিরাপদ ও নির্বিঘে্ন যাতায়াত দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডকে গতিশীল করতে অনন্য ভূমিকা পালন করে। গণপরিবহনে যারা দুর্ব্যবহারের শিকার হয় তারা কর্মস্থলে গিয়েও খিটখিটে মেজাজে অফিসের কাজকর্ম করতে গিয়ে সেবা প্রত্যাশীদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করেন। ফলে জাতীয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে গণপরিবহনে চাঁদাবাজি, নৈরাজ্যসহ নানা কারণে পরিবহন চালক-শ্রমিকরা উগ্র মেজাজের হয়ে ওঠে। এতে সড়ক দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। যা জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি বিকশিত করার ক্ষেত্রে বিরাট অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত।

সরকার পরিবহন সেক্টরের উন্নয়নে নানাবিধ কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করে আসছে। বিশ^ব্যাংক মুখ ফিরিয়ে নিলেও দেশের নিজস্ব অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ নিয়ে স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন উদ্বোধনের দ্বারপ্রান্তে। রাজধানীতে মেট্রো রেলের ট্রায়াল চলছে। বিআরটি প্রকল্পের অগ্রগতিও দৃশ্যমান। নতুন নতুন সড়ক ও সেতু নির্মাণসহ সড়কে চলছে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প। কিন্তু মানবিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থতার কারণে সড়কে প্রতিদিন ঝরছে অগুনতি প্রাণ। সড়কে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার কারণে সরকারের বড় বড় অর্জনগুলো ম্লান হয়ে যাচ্ছে। দেশের এত অগ্রগতির পরেও রাজধানী ঢাকার রুগ্ণ, বিবর্ণ ও রংচটা বাসগুলো এদেশের অতীতের দারিদ্র্যের সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে আজও। ফলে বিদেশিদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশকে আজও একটা অনুন্নত রাষ্ট্রের পরিচয়ই বহন করতে হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশের গন্ডি পেরিয়ে উন্নয়নশীল মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হচ্ছে। দেশের প্রতিটি নাগরিক এই সংগ্রামের অংশীদার। ফলে বাংলাদেশের গার্মেন্টস, মৎস্য, পশু পালনসহ বহু খাত এখন বিশে্ব নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জনের পথে রয়েছে।

অন্যদিকে, শুধু দেশের গণপরিবহনের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে আমরা কোথায় যেন আটকে যাচ্ছি। এমন চিন্তা থেকেই সময়ের এই দাবি পূরণের লক্ষ্য নিয়ে কতিপয় দেশপ্রেমিক নাগরিকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে দেশের যাত্রী সাধারণকে গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা-অনিয়ম ও হয়রানি থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি’ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।

বহু প্রতিকূলতার পরও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি যাত্রী সাধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও যাত্রী হয়রানি, ভাড়ায় নৈরাজ্য প্রতিরোধ ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আপসহীন আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। এক্ষেত্রে দেশের শীর্ষ মানবাধিকারকর্মী, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, সরকার ও গণমাধ্যমের যথেষ্ট সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও উৎসাহ যাত্রী অধিকার প্রতিষ্ঠার এই আন্দোলনকে বেগবান করেছে। আনন্দের বিষয় সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেশ কয়েকটি সংগঠন যাত্রী অধিকার ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে সোচ্চার হয়েছে। যাত্রী অধিকার নিয়ে দীর্ঘ দুই দশকের আন্দোলন-সংগ্রামের ফলে ইতিমধ্যে দেশের যাত্রী সাধারণ ও সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের মধ্যে যাত্রী অধিকারের বিষয়টি সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে।

 

গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, ভাড়ায় নৈরাজ্য ও সড়ক নিরাপত্তায় ধারাবাহিক কার্যক্রমের ফলে সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকেও সাম্প্রতিক সময়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এসেছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এক্ষেত্রে সরকার সর্বাত্মক আন্তরিক বলে আমরা মনে করি। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহলের অপতৎপরতায় যাত্রীস্বার্থ বারবার ভূ-লুণ্ঠিত হচ্ছে। সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। বিশৃঙ্খল পরিবহনের ফলে প্রতি বছর যানজটে হাজার কোটি টাকার শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এই সেক্টরে চাঁদাবাজি ও অনিয়ম জিইয়ে রেখে সুবিধা আদায়কারী কিছু কায়েমি স্বার্থবাদীদের কারণে সরকারের আন্তরিকতা ও সামগ্রিক প্রচেষ্টা ভূ-লুণ্ঠিত হচ্ছে।

দেশের গণপরিবহন খাতে সুশাসন ও যাত্রী অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি মালিক-শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের সামনে আনতে এবারও ‘যাত্রী অধিকার দিবস’ পালন করা হচ্ছে। এবার দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘যাত্রী হয়রানি ও ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধের পদক্ষেপ চাই’। দেশের অধিকারহারা যাত্রীদের প্রতীকী দিবস হিসেবে ১৩ সেপ্টেম্বরকে যাত্রী অধিকার দিবস হিসেবে ঘোষণার জন্য আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

লেখক : মহাসচিব, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত