আন্তর্জাতিক নারী দিবস

বিশ্ব নারী দিবস এলে বারবার আমার মাকে দেখি

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২২, ১০:৪৬ পিএম

আমি ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছিলাম। খুশি হয়ে মা-বাবা আমাকে একটা সাইকেল কিনে দেন। ১১ বছরের কিশোরীর কাছে সেই সাইকেল হয়ে ওঠে উড়তে জানা পাখির মতো। ছোট বোন আর কাজিনকে একসঙ্গে সামনে-পেছনে বহন করায় এলাকার লোকে আমাকে ডাকত, বাপের ব্যাটা সাদ্দাম। আমার মজা লাগত। স্কুল, বাজার, ব্যাংকসহ নানা অফিসে সংসারের নানা কাজে এই সাইকেল আমাকে দিয়েছিল বাড়তি স্বাধীনতা। দেশের একদম  উত্তরের জেলা, তার একটি থানা রানীশংকৈলে কেটেছে আমার শৈশব-কৈশোর । মাসহ আমরা তিন ভাইবোন থাকতাম ভাড়া বাড়িতে। বাবা সঙ্গে না থাকায় বাড়ির সব কাজই মা করত। সহসা কারও সহযোগিতা নিতেন না মা। এ কারণে এলাকার অনেকেই আমাদের আলাদাভাবে জানত।

আমাদের সমাজ তো এমনই, নারীরা একা চলতে চাইলে যত না কথা হয়, সহযোগিতা নিয়ে মাথা নিচু করলে তার অনেকটাই কম হয়। আমি দেখতাম, আমরা কোথাও গেলে, কারো বাসায় গেলে মানুষ সেগুলো লক্ষ্য করত। আমরা কার সঙ্গে মিশতে পারি, কার সঙ্গে কথা বলতে পারি, কোথায় যেতে পারি, নানা গুঞ্জন সমালোচনার মাধ্যমে এগুলো সব ঠিক করে দিতে চাইত প্রতিবেশী-আত্মীয়। কিন্তু আমার মাকে কোনো দিন দেখিনি সেগুলো নিয়ে কারো কাছে জবাবদিহি করতে। বরং নিজের অধিকার, নিজস্বতা নিয়ে বরাবরই  সবার সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমার চরিত্রে এসবের ছাপ স্পষ্ট।  দীর্ঘ সময় অর্থনৈতিক এবং পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতা আমাদের লেখাপড়ায় অনেক বড় প্রভাব ফেলে। তবে বাবা-মার সহযোগিতায় যতটুকু পড়েছি, তা দিয়ে যে লড়াই আমি বা আমার পরিবার এখনো করি তা আমার মায়ের কাছ থেকে শেখা হার না মানা এক রোখা স্বভাবের কারণে।

বিশ্ব নারী দিবস এলেই আমার ব্যক্তিগত লড়াইগুলোর কথা যখন ভাবি, আমি বারবার আমার মাকেই দেখি। অথচ সময় আর ব্যক্তিগত যুদ্ধের মাঠে আমার মা আজ পিছিয়ে যাচ্ছে। আমার মা সমাজের নানা টানাপোড়েনকে ভয় পায় এখন। নিজের অধিকার নিয়ে যে নারী এক সময় সোচ্চার ছিল, আজ সে কেন উল্টো পথে হাঁটছে। কেন মেয়ের লড়াইয়ের পাশে সে দাঁড়াতে চাইছে না। মাঝে মাঝে এমন খবর কেন দেখি, শ্বশুর বাড়ির নির্যাতনে আত্মহত্যা করেছেন বউটি। কেন মানসিক নির্যাতনের সময় আমাদের মারা মানিয়ে নেয়ার কথা বলেন। কেন একজন মা, তার মেয়েকে সমস্ত কাজে পুরুষের চেয়ে কম পারদর্শী মনে করেন, কেন একজন মেয়ের বিয়ে করে থিতু হওয়াকেই অগ্রাধিকার দেন তারা?

সমাজের সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আপনার পরিবারে যে নারীটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে খেয়াল করে দেখুন, তার বেশিরভাগ পরিবারে সবচেয়ে অবহেলিত নারীটি তার মা। 

এখনো তার দিন কাটে শুধু সংসারের খাওয়া-থাকার ব্যবস্থাপনা করে। ডিজিটাল মিডিয়ায় ঘরে বসে আপনি গোটা দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছেন, তখন হয়তো আপনার মায়ের তেমন কিছু করার নেই। আপনার জগতে আপনি বুঁদ থাকায় তার সঙ্গে কথা বলার মতো সময় হয় না কারো। যে নারী দিবসে আপনি বেগুনি বসনে রাজপথ স্লোগানে মুখর করছেন, আপনার মা ঘরে বসে হয়তো সেসব আয়োজনের সমালোচনা করছেন। মেয়েরা রসাতলে যাচ্ছে বলে ক্ষোভ জানাচ্ছেন। 

এই যে মানুষগুলোর সঙ্গে চিন্তাভাবনার এত ফারাক তৈরি হয়ে যায়, যে ঘরের সঙ্গে লড়াই করতে করতে আপনি হাঁপিয়ে ওঠেন, পিছিয়ে পড়তে হয় অনেক। অথচ সেই নারীটি আপনার সবচেয়ে বড় বন্ধু  হওয়ার কথা ছিল। আমরা অন্যের জন্য কতশত মোটিভেশনাল কথা বলি। কিন্তু এই একই কথা আমাদের মাকে আমরা বোঝাতে পারি না! আপনার পোশাক, কথা বলা, মেলামেশা, চাকরির ধরন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মানে–যা কিছু আপনি ভাবছেন তা কোনোভাবেই আপনার মায়ের চিন্তার সঙ্গে মিলছে না। চিন্তার ফারাক থাকতেই পারে নানা কারণে। কিন্তু প্রতিনিয়ত আপনাকে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্যে যেতে হয় তা কেন? কেন মা-ই আপনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন!

সত্যি বলতে আমরা সামাজিক যোগাযোগের সুন্দর ড্রয়িং রুমে বসে আমরা সব দেখছি। ভাবছি এই তো আমার লিস্টের এতগুলা নারী আজ বেগুনি শাড়ি পরেছে। এই যে সমতার জন্য কত পোস্ট, কত অনুষ্ঠানে নারীদের হাস্যোজ্জ্বল ছবি; কিন্তু আমরা ঠিক সেভাবে বের হতে পারিনি আজও।

নারী আন্দোলনের কত ঢেউ পার হচ্ছে, আজও আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কী করছেন, দেরি করে ফিরলে প্রতিবেশী-আত্মীয় তো আছেই, বাড়িতেও নানা হেনস্তার শিকার হতে হয়। কারণ নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির বদল এখনো কেবল একটা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ।  

কারণ পুরোনো চিন্তা আঁকড়ে ধরে নিশ্চিত জীবন যাপনের যে স্বস্তি তার থেকে পরিবার বের হতে দিতে চায় না​। চাইলে পুরো সমাজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে আপনাকে। শেষ জীবনে এত ঝামেলা আর নিতে চান না​ তারা।

আপনি চারুকলায় পড়তে চান, আপনি ব্যবসা করতে চান, আপনি স্লিভলেস জামা-কাপড় পরতে চান, সব জায়গায় তারা মনঃক্ষুণ্ন হন। এবং এই মন খারাপ যতটা না নিজের তার চেয়ে বেশি লোকে কী বলবে! এই যে লোকে কী বলবের মধ্যে নিজেদের মর্যাদা ইজারা দিয়ে রাখেন আমাদের মায়েরা, আমাদের পরিবার, সমাজ–তার আর আমাদের মুক্তি আসলেই অনেক কঠিন, যত দিন না তারা এ চিন্তা থেকে বের হয়ে আসেন। আমার সবচেয়ে কাছের নারী বন্ধু আমার মাকে পেছনে ফেলে আমার সামনে এগিয়ে যাওয়া আসলেই কঠিন। আর মাকে ফেলে তো আমার লড়াইও কোথাও না কোথাও অপূর্ণ থেকে যায় তাই না। তাই আগে মাকে বলি মুক্তির কথা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত