কলেজছাত্রকে বিয়ে করা নাটোরের সেই শিক্ষিকার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে তিনি হয়তো আত্মহত্যা করেছেন। বা তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। বা স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে তার মৃত্যু হতে পারে। যেটিই হোক, বাঁচার স্বপ্ন দেখা কলেজশিক্ষিকা খাইরুন নাহার যে আর বেঁচে নেই, এটিই সত্য। অথচ কতই না স্বপ্ন দেখেছিলেন এই নারী শিক্ষকটি।
মামুন নামের এক দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রকে বিয়ের পর গণমাধ্যমের কাছে খাইরুন নাহার বলেছিলেন, ‘প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। মামুন আমার খারাপ সময় পাশে থেকে উৎসাহ দিয়ে গেছে এবং নতুন ক’রে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়েছে। পরে দুজন বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
এখন সেই খাইরুন নাহারের মৃতদেহের খবর আমরা নিউজ করছি।
এই দেশে বেঁচে শান্তি নেই। জানতাম আমরা। সোশ্যাল মিডিয়া আসবার পর এখন মরেও শান্তি নেই। বহু উদাহরণ আছে। দেওয়া যাবে। ভাইরাল ব্যামো কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে আমাদের। সবারই ভাইরাল হওয়া চাই। আলোচিত হওয়া চাই। এ কারণে ব্যতিক্রমী কিছু পেলেই হল, দাও পোস্ট। কুড়াও লাইক। কুড়াও বাহবা। খাইরুন সেই বাহবা ভাইরালের বলি। একবার চিন্তা করে দেখুন, সোশ্যাল মিডিয়া না থাকলে খাইরুনের বিয়ের খবর নাটোর থেকে নারায়ণগঞ্জ, ডেমরা থেকে ডিমলা, কুড়িগ্রাম থেকে কুমিল্লা— এভাবে সারা দেশে ছড়াতো কি? ছড়াতো না। না ছড়ালে আমার বিশ্বাস, তার এরকম অপমৃত্যুও ঘটতো না।
অথবা সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারকারীরা দায়িত্বশীল যদি হতেন, তার বিয়ের কথা ভাইরাল করতেন কি তারা। করতেন না। প্রত্যেক মানুষের প্রাইভেসি আছে। সবাই প্রচার চান না। বা সব প্রচারই সবার উপকারে আসে না। যেমনটা উপকারে আসেনি খাইরুন নাহারের বিয়ের খবর। তার ওই বিয়ের খবর ছড়িয়েছে, গোঁয়ার সমাজ সেটি আরও নেগেটিভলি নিয়েছে। আমি নিজে অন্তত ডজনখানেক লোকের সাথে এই বিয়ের বিষয়ে কথা বলেছি, তাদের কাছে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে আপত্তিকর সব মন্তব্য পেয়েছি। দু-একজন শুধু অ্যাপ্রিশিয়েট করেছে। সমাজটা আমাদের এখন এতটাই উচ্ছন্নে গেছে।
অথচ একটু শান্তির জন্য, সামাজিক নিরাপত্তার জন্য দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন খাইরুন নাহার। নতুন করে বাঁচতে চাওয়া সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করা হলো। এ দায় সোশ্যাল মিডিয়ার দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যবহারকারীদের।এ দায় মূলধারার গণমাধ্যমেরও। কারণ, তারাও এ দেশের পরিপ্রেক্ষিতে অসম বয়সী দুই জনের বিয়ের স্পর্শকাতর সংবাদটি সেভাবে হ্যান্ডেল করতে পারেনি। এরকম ব্যতিক্রমী বিয়েকে উৎসাহ দিয়ে যেভাবে লিখতে হয়, যেভাবে এডভোকেসি করতে হয়, সে দক্ষতা ও জ্ঞান এ দেশের মিডিয়ার খুব কম সাংবাদিকেরই আছে।
হত্যা বা আত্মহত্যা—যেটিই হোক, খাইরুন নাহারের মৃত্যুর দায় মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া কেউই এড়াতে পারে না। মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার দায়িত্বশীলতা খুব গুরুত্বের সাথে নেওয়ার সময় এসেছে।
