বিদায় রাজনীতির মায়েস্ত্রো, দ্য লিডার

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:৩৫ পিএম

আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও জাতীয় সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী আর নেই। গতকাল রবিবার রাত ১১টা ৪০ মিনিটে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠকের বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তিনি তিন ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রহী রেখে গেছেন। 

সংসদ উপনেতার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন।

দুঃখ প্রকাশ করেন দেশের প্রতিষ্ঠিত লেখক, সাংবাদিক এবং তার ঘনিষ্ঠজন। বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও নিজেদের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে এই লেখাগুলো প্রকাশ পায়, জনসমক্ষে আসে।

জাতীয় সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর মৃত্যুতে তাকে নিয়ে নিজের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল ফেসবুকে একটি লেখা প্রকাশ করেন তার গুণগ্রাহী সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টি। লেখাটি দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো... 

'শেখ হাসিনা দেশের বাইরে গেলে দলের দায়িত্ব কেন সব সময় সাজেদা চৌধুরীকে দিয়ে যেতেন? এই প্রশ্ন একদিন এক প্রবীণ রাজনীতিবিদকে করেছিলাম, বললেন, দায়িত্ব নেওয়ার জন্য চওড়া কাঁধের আর কাউকে দ্যাখ তুমি? আমার প্রিয় মানুষ, চওড়া কাঁধের, রবীন্দ্রনাথকে প্রাণ সঁপে দেওয়া আর রাজনীতিকে জীবন উৎসর্গ করা সাজেদা চৌধুরী চলে গেলেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি অংশ নিয়েছিলেন বন্দুক হাতে, ওষুধ হাতে আর শরণার্থী শিবিরে রাতদিন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দানকারী হিসেবে। বহু পদ দিয়ে খেতে ভালোবাসা মানুষটি খাওয়াতে ভালোবাসতেন, একা খেতে পারতেন না। প্রাণের সংগীটি যখন বেঁচে ছিলেন তখন দুজনে মিলে আপ্যায়ন করতেন। সাজেদা আপা রাজনৈতিক কাজে বাইরে গেলে ছেলেমেয়েদের দ্যাখাশোনার কাজ করতেন আকবর সাহেব। সংসার জীবনেও দোর্দণ্ড প্রতাপ নিয়ে বেঁচে ছিলেন আমার প্রিয় আপা।

মায়ের কাছে গল্প শুনেছি, একবার নগরকান্দার তালমায় এক বাড়িতে সন্ধ্যাবেলা গম গম করে কে যেন কথা বলছিলেন, এক ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করছিলেন, 'ও বিটা (ভদ্রলোক) কিরারে অমন কইরা কতা কয়?' প্রশ্নকারিণীর দিকে তাকিয়ে উত্তরদাত্রী বলেন, 'আরে উনি বিটা না বিটার (পুরুষের) বাপ সাজেদা চৌধুরী, যার সামনে কোনো বিটা সাহস কইরা খাড়াবার পারে না'। আপাগো আর কার কাছে গিয়ে দাঁড়াব? কারে গিয়া বলব যে, অমুকরে একটু বইলা দ্যান আপা, অমুকের ভাইয়ের চাকরিডা জানি অয়। ফোনটা তুলে সংগে সংগে বলবেন, দ্যাখরে বাবা চাকরিটা ছেলেডার খুব দরকার, দ্যাখো তো কিছু করা যায় কিনা? নগরকান্দা থানাটা মডেলের মতো হয়ে গেল সাজেদা চৌধুরীর হাতে, ইস্কুল-রাস্তা-মাদরাসাসহ কত সরকারি প্রতিষ্ঠান যে তিনি ওখানে নিয়ে গেলেন মানুষের কাজে আসবে বলে!

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নাকি সাজেদা আপার দ্যাখা হয়েছিল ইস্টিমারে, গোয়ালন্দ ঘাটের কাছে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, রাজনীতিতে আসতে, তিনি এসেছিলেন। কোনোদিন বঙ্গবন্ধু পরিবার আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে বেঈমানি করেননি। যখন রাষ্ট্র নিষেধ করে দিয়েছে শেখ হাসিনাকে পানি খাওয়ানো যাবে না, নিতান্ত প্রয়োজনে শৌচালয় ব্যবহার করতে দিতে ভীত বোধ করেছে মানুষ তখন যে মানুষটি শেখ হাসিনাকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন তিনি সাজেদা চৌধুরী। জীবন তার পূর্ণতায় ভরা, আর পূর্ণতার সঙ্গেই শূন্যতার সহাবস্থান। প্রকৃত রাজনীতিবিদশূন্য হওয়া এ দেশের একালের নিয়তি। সাজেদা চৌধুরী সবকিছু শূন্য করেই গেলেন আজ। রাষ্ট্র হারালো একজন বিরলপ্রজ রাজনীতিবিদ, একজন বলিষ্ঠ নারী-কণ্ঠস্বর আর ব্যক্তিগতভাবে আমি হারালাম আমার প্রিয়তম আপাকে।

বিদায় রাজনীতির মায়েস্ত্রো, দ্য লিডার সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত