রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

শিক্ষায় অনৈতিক মানুষ গড়ার রাজনীতি

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:১৯ পিএম

বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ইডেন মহিলা কলেজ। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কী হচ্ছে বা কী হয়েছে ইডেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে? এটা এখন মানুষের মুখে মুখে। কেউ জানতে চান ব্যঙ্গের হাসি হেসে পাশের অপরিচিত নারীর দিকে তাকিয়ে, কেউ জানতে চান উৎকণ্ঠা থেকে কারণ তার কোনো স্বজন পড়ছেন ইডেনে অথবা কেউ জানতে চান একটা বুকভাঙা বেদনা নিয়ে, কারণ তাদের স্মৃতিতে আছে ইডেনের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস।

সেপ্টেম্বর মাসে দুটো খুব গুরুত্বপূর্ণ দিন আছে। একটি হলো ১৭ সেপ্টেম্বর। ১৯৬২ সালের এই দিনে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে এসেছিল, ‘শিক্ষা সস্তায় পাওয়া যাইবে না’, এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে। শিক্ষার অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না, শিক্ষাকে ব্যবসার পণ্য বানানো যাবে না এই দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে জীবন দিয়েছিল মোস্তফা, বাবুল ও ওয়াজিউল্লাহ। পরে এই দিনকে অভিহিত করা হয়েছে ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে। আর একটি দিন হলো ২৪ সেপ্টেম্বর। এই দিন দেশের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রথম নারী শহীদ ছিলেন তিনি। ছাত্রসমাজের কাছে এই দিন দুটোর তাৎপর্য ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে শাসকগোষ্ঠী। দেশকে ভালোবেসে সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করতে নারীরাও পিছিয়ে থাকবে না এই চেতনা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, প্রীতিলতা ছিলেন ইডেন কলেজের ছাত্রী। ছাত্রদের জন্য সংগ্রাম ও ঐতিহ্যের সেপ্টেম্বর মাসে ইডেন কলেজে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ে এ ধরনের কথা শুনতে তো খারাপ লাগারই কথা। দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে অনেকে বলছেন, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে ইডেন কলেজের ছাত্রীদের ভূমিকা, ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রীদের ভূমিকা আর এখন ছাত্রলীগের নেত্রীদের ভূমিকা কোনোভাবেই মেলানো যায় না।

বাংলাদেশে মেয়েদের সর্ববৃহৎ কলেজ এই ইডেন কলেজ। কলেজের শিক্ষার্থীসংখ্যা ৩৫ হাজার কিন্তু এর বিপরীতে আবাসিক সিট আছে মাত্র ৩ হাজার ৩১০টি। ফলে সিটের ভীষণ সংকট। মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের যে মেয়েরা অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে ইডেনে পড়তে আসে তারা ঢাকায় থাকবে কোথায়? একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নামে প্রশাসন থেকে কোনো সিট বরাদ্দ করা হয় না। এই সুযোগে ইডেন কলেজে ছাত্রলীগ টাকার বিনিময়ে সিট দিয়ে থাকে, যেসব কক্ষে চারজন শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা, সেখানে ১০ জন পর্যন্ত ওঠানো হয়। প্রত্যেক ছাত্রীর কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার করে টাকা নেওয়া হয়, এরপর প্রতি মাসে আবার টাকা দিতে হয়। থাকার জন্য টাকা তো দিতেই হবে আবার দলীয় কর্মসূচিতেও যেতে হবে। কেউ কোনো কারণে কর্মসূচিতে যেতে না পারলে বা না চাইলে তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। ভুক্তভোগীরা বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে ছাত্রলীগ নেত্রীদের এই চাঁদাবাজির তথ্য প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন মাসে নেত্রীরা একেকজন ৬ লাখ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করে থাকেন। ভাবুন একবার! কলেজে পড়তে এসে নেত্রী হওয়ার সুবাদে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করা!

এই টাকা আয় করতে গিয়ে সিট-বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি নিয়ে ছাত্রলীগ নেত্রী কেমন ‘অপ্রতিরোধ্য’ হয়ে উঠেছিলেন, সেটি প্রকাশ পায় তার ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ড থেকে। গত আগস্টে কলেজের হলের এক রুমে ছাত্রীদের এভাবে হুমকি দিয়েছিলেন, ‘বেশি চ্যাটাং চ্যাটাং করতেছিস। এক পায়ে পাড়া দিমু, আরেক পা টাইনা ধইরা ছিঁড়া ফেলমু। ...কে কে টাকা জমা দিছিস? আমারে দিছিস? আমি যদি একটা সিট না দিই, তোদের কোন বাপ সিট দেবে? ম্যাডামরা (হল প্রশাসন) দেবে? ক্ষমতা আছে ম্যাডামদের? কে কে টাকা জমা দিছিস? আমারে দিছিস?’ এই অডিও রেকর্ড কে করেছে তা জানা না গেলেও একে অস্বীকার করেননি তামান্না। বরং এই অডিও রেকর্ড ফাঁস হওয়ার কারণে সমালোচনার মুখে পড়ায় দুই ছাত্রীকে মানসিক নির্যাতন করে আবারও খবর হন তিনি। নির্যাতনের একপর্যায়ে বিবস্ত্র করে সেই ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল করার হুমকিও দেন তিনি। পরে সাধারণ ছাত্রীদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছিলেন কিন্তু কাজ বন্ধ রাখেননি।

এতে বাঁধ ভেঙে যাওয়া স্রোতের মতো একের পর এক খবর বেরিয়ে আসতে থাকে। একটার চেয়ে আরেকটি ভয়াবহ। সবগুলো ঘটনাই টাকা এবং ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু আর একটি অভিযোগ লজ্জা, অপমান এবং ঘৃণাই শুধু নয় ভাবিয়ে তুলেছে জনসাধারণকে, উদ্বিগ্ন করে তুলেছে নৈতিকভাবে। তা হলো, ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের শীর্ষ নেত্রীদের বিরুদ্ধে ক্যান্টিনের চাঁদাবাজি, ইন্টারনেট সার্ভিস থেকে চাঁদাবাজি, কলেজের মুদি দোকানে চাঁদাবাজির চেয়েও ভয়াবহ অভিযোগ হচ্ছে বিভিন্নভাবে ছাত্রীদের কুপ্রস্তাব দেওয়া। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সামিয়া আক্তারের (বৈশাখী) একটি বক্তব্য ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভীষণ আলোড়ন তৈরি করে। যেখানে তিনি বলছেন, সুন্দরী মেয়েদের রুমে ডেকে নিয়ে জোর করে আপত্তিকর ছবি তুলে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে সেগুলো ব্যবহার করে জোরপূর্বক অনৈতিক কাজ করতে তাদের বাধ্য করা হয়। আর এক সংবাদ সম্মেলনে কলেজ ছাত্রলীগের সহসভাপতি সুস্মিতা বাড়ৈ বলছেন, ‘আমাদের কানে বারবার আসে যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে তাদের (তামান্না ও রাজিয়া) মেয়েরা নাকি কাজ নিয়ে আসে, বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করে...।’

অন্য কেউ বললে হয়তো সমস্বরে সবাই বলতেন, এসব বিরোধীদের ষড়যন্ত্র, ভাবমূর্তি ধ্বংসের চক্রান্ত। কিন্তু যখন ছাত্রলীগের অভ্যন্তর থেকেই এসব অভিযোগ আসছে তখন এটা ধরে নেওয়া স্বাভাবিক যে সহ্য করতে করতেও কখনো কখনো সহ্যের বাঁধ ভেঙে যায়। এখন মনে হয় একটা বাঁধ ভাঙার কাল চলছে। ধৈর্যের বাঁধ, লজ্জার বাঁধ ভেঙে অপমানের স্রোত যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অতীতের সব অর্জন আর ভবিষ্যতের স্বপ্নকে। কীভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার রাজনীতি, দখল করার, দখলে রাখার মানসিকতা তৈরি হলো ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে? কীভাবে ছাত্রনেতা হওয়ার সঙ্গে টাকা রোজগারের অনৈতিক পথে যুক্ত হলো ছাত্রছাত্রীরা সে প্রশ্ন তুললে বলা শুরু হবে, আমরা নই ওরা প্রথম শুরু করেছে। কিন্তু ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে যে আওয়ামী লীগ তাদের ছাত্র সংগঠন যখন এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে আছে তখন অতীতের উদাহরণ দিয়ে দায় এড়ানো যাবে কি? বিশেষ করে ২০১১ সালেও ইডেন কলেজের তৎকালীন নেত্রীদের বিরুদ্ধে যে ব্যাপক অভিযোগ ও আন্দোলন গড়ে উঠেছিল সে ব্যাপারে কী ভূমিকা নেওয়া হয়েছিল সে প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে। ইডেন কলেজের প্রিন্সিপালের কি কোনো দায় আছে? নিশ্চয়ই আছে। কারণ তাকে সব সময় দেখা গেছে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে সাফাই গাইতে। বিশেষ করে হল প্রশাসনকে তাচ্ছিল্য করে অডিও ফাঁস হওয়ার পরও তাদের সম্মানে বা আত্মমর্যাদায় এতটুকু আঘাত লাগল না দেখে বিস্ময় জাগে।

শুধু কি ইডেন কলেজ? কত উদাহরণ চারপাশে। কোনটা ছেড়ে কোন উদাহরণটা নেবেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা, গোপালগঞ্জ, কুমিল্লা, ইসলামীসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একের পর এক সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। এসব সংবাদ শিক্ষা গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য নয়। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে সংঘাত, সংঘর্ষ নিয়ে। সেই সংঘাত আবার আদর্শগত বিষয় নিয়ে নয়। প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে অবধারিতভাবে যুক্ত আছে আর্থিক ভাগবাটোয়ারা। প্রথমে বিরোধী সংগঠন ও মতকে দমন করো, তারপর নিজেরা সংঘাতে লিপ্ত হও, এই নীতিতেই চলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দখলদারিত্ব। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রতীকী অর্থেই বলেছেন, ১৮ জনের কাছে জিম্মি ২৮ হাজার ছাত্রছাত্রী। তিনি উচ্চারণ করেছেন, কিন্তু এটা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে অনুচ্চারিত সত্য। আবার দেশের ৫২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন ইউজিসি। তাহলে কী দেখছে এবং কী শিখছে আমাদের শিক্ষার্থীরা? জাতীয় ক্ষেত্রে দুর্নীতি, লুটপাট, ক্ষমতার দম্ভ, ভোট নিয়ে জালিয়াতি, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ, বাণিজ্যিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বানিয়ে মুনাফা, যাদের কাছে নীতিকথা শোনে তারাই যখন আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হওয়ার জন্য দলাদলি এমনকি ছাত্রনেতাদের দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনা, তখন তার প্রভাব কি পড়ে না শিক্ষার্থীদের মধ্যে?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জীবন ও জগৎ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানসম্মত ও যুক্তিগ্রাহ্য জ্ঞানে শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ করে। ফলে সেখানে যুক্তি এবং সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে প্রতিযোগিতা তো থাকতেই হবে। তা না হলে সমাজের ও ব্যক্তির অগ্রগতি হবে কীভাবে? কিন্তু দমন, দখলদারিত্ব, দুর্নীতি শিক্ষার মূল মর্মবস্তুকে ধ্বংস করে দেয়। যার কুফল হয় সুদূরপ্রসারী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যুক্তির পরিবর্তে কর্র্তৃত্ব বা ক্ষমতা দেখানোর পরিবেশ তৈরি হলে লোভ আর ভয়ের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে একটি অনুগত জনগোষ্ঠী তৈরি হতে পারে কিন্তু আধুনিক মানুষ তৈরি হবে না। ইডেনসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যা চলছে তা দেখে মন খারাপ করে বসে থাকলে তো সমস্যার সমাধান হবে না। এগুলো হচ্ছে লক্ষণ। এর কারণ আছে রাজনীতিতে। যে রাজনীতি একটা সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীকে অনৈতিক মানুষে পরিণত করে তার পাল্টা রাজনীতি গড়ে তুলতেই হবে।

দেশি-বিদেশি শোষণ আর স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এক দিন ছাত্র আন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রচিত হয়েছিল। আজ দেশের প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত চলছে শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা। ফলে ছাত্ররাজনীতিকে যদি কলুষমুক্ত করতে হয় তাহলে শিক্ষা-বাণিজ্য, দেশের সম্পদ লুণ্ঠন আর ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট

[email protected]  

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত