বাংলাদেশের প্রাচীন জনপদ বরেন্দ্রভূমি রাজশাহী একসময় শিল্প ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে ছিল। কৃষিভিত্তিক শিল্প ও বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগ ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা, শিল্পপণ্যের অনিশ্চিত বাজার, গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ জ্বালানির চরম অনিশ্চয়তা, ব্যাংক ঋণ ও এলসির জটিলতা এবং কোনো খনিজ সম্পদের ক্ষেত্র না থাকার কারণে শিল্পের বিকাশ ঘটেনি। তবে বিগত দু'দশকে এসব সমস্যার অনেকটাই কাটিয়েছে রাজশাহী। ফলে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের ক্ষেত্রে নানা সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি হবার কারণে এই এলাকার সার্বিক অর্থনীতি দৃঢ়তা ও ঊর্ধ্বগতি পেয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাণিজ্যিক উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে রাজশাহীকেই নিরাপদস্থল মনে করছেন। নানা সুযোগ-সুবিধার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে বিভাগীয় শহরটি। ইতিমধ্যে দেশের সবচেয়ে সুন্দর ও সাজানো-গুছানো শহরের খ্যাতিও পেয়েছে পদ্মাপাড়ের রাজশাহী।
পদ্মানদীর বিস্তীর্ণ জলরাশিবেষ্টিত বিপুল সম্ভাবনাময় বরেন্দ্রভূমি রাজশাহী জেলার আয়তন দুই হাজার ৪ শ বর্গকিলোমিটারের বেশি। এ জেলার জমির পরিমাণ দুই লাখ ৪২ হাজার হেক্টর যার এক লাখ ৫৭ হাজার হেক্টর আবাদি। এর মধ্যে সোয়া এক লাখ হেক্টর জমি সেচ সুবিধাপ্রাপ্ত। আট হাজার কিলোমিটার রাস্তার অধিকাংশই পাকা ও আধাপাকা। রেলপথ রয়েছে ৭৩ কিমি এবং নদীপথ ৯৭ কিমি। বিমানবন্দর রয়েছে একটি। কৃষি উন্নয়নের পূর্বশর্তই হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, যোগাযোগের সুবিধার জন্য রাস্তাঘাট এবং উন্নত পরিবহন ব্যবস্থাসহ যথোপযুক্ত উন্নয়ন অবকাঠামো। যমুনা ব্রিজ নির্মাণের ফলে জেলার সাথে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপিত হয়েছে। ফলে কৃষি ফসল ও কৃষিজাত পণ্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিবহন সহজতর হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে আধুনিক প্রযুক্তিসহ অন্যান্য উপকরণ এই জেলায় নিয়ে আসা সহজ হয়েছে। এ ছাড়া গোদাগাড়ি উপজেলার সুলাতানগঞ্জে নির্মীয়মাণ নৌবন্দর রাজশাহীর আন্তর্জাতিক ব্যবসা সম্প্রসারণে নতুন মাত্রা যোগ করছে। ফলে বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ।
শিক্ষানগরী হিসেবে খ্যাত বিভাগীয় এ শহরে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী ছিলেন অনেকে। কিন্তু গ্যাস সংযোগ আসার পর এখানে বিনিয়োগ বেড়েছে শিল্প খাতে। দেশি-বিদেশি নাম করা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখন আগ্রহী রাজশাহীতে বিনিয়োগে। এরই মধ্যে অনেকে বিনিয়োগ করেছেন, আবার অনেকে বিনিয়োগের প্রাথমিক কাজ সেরে রেখেছেন। ফলে কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে রাজশাহীকে ঘিরে। কৃষিনির্ভর রাজশাহীর অর্থনীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে ক্রমেই। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আকর্ষণ করছে রাজশাহী। শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য অন্যান্য এলাকার তুলনায় রাজশাহীতে জমির মূল্য ও শ্রমিকদের মজুরি কম। এটি বড় সাশ্রয়ী ব্যাপার। এর মধ্যে টাটা মোটরসের সহযোগিতায় রাজশাহীতে প্রথম মোটর শিল্পপ্রতিষ্ঠান করেছে নিটল-নিলয় গ্রুপ। এখান থেকে বছরে ৪০ হাজার টেম্পো বডি তৈরির সম্ভাব্যতা রয়েছে। এসিআই ও ভারতীয় প্রতিষ্ঠান গোদরেজ রাজশাহীর দামকুড়ায় ১৫২ কোটি টাকা বিনিয়োগে ফিশ ফিড শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছে। নাহার অটোমোবাইল কারখানা ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এরই মধ্যে উৎপাদনে এসেছে। হাশেম গ্রুপ ও প্রাণ গ্রুপসহ বিভিন্ন বড় বড় শিল্প গ্রুপ এখন ছুটছে রাজশাহীতে তাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য।
বর্তমানে রাজশাহী শিল্প-বাণিজ্যে নেতৃত্বের আসনে উঠে এসেছে নাবিল গ্রুপের হাত ধরে। নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। গ্রুপটি কৃষি ও ভোগ্যপণ্য আমদানি, উৎপাদন এবং সরবরাহের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে আসছে। ট্রেডিং, এগ্রি বিজনেস, ফূড অ্যান্ড বেভারেজ এবং পরিষেবা এ চারটি আঙ্গিকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে গ্রুপটি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক কৃষিবিদ আমিনুল ইসলাম নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী ২০০৬ সালে তার ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু করেন। ২০০৮ সালে তিনি আন্তর্জাতিক বাজারে তার কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেন। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন ইউক্রেন, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা থেকে গম, ভুট্টা, চাল, মসুর, ডাল, ছোলা, সয়াবিন বীজ, চিনি, রেপসিড এবং পাম তেল আমদানি করছেন। সেই সাথে উরুগুয়ে, মিয়ানমার, ব্রাজিল এবং ভারত থেকে তার প্রতিষ্ঠান কয়লা, চুনাপাথর এবং বেলেপাথরও আমদানি করে। নাবিল গ্রুপ শীর্ষ আমদানিকারক কোম্পানি হিসেবে দেশের খাদ্য সরবরাহে সিংহভাগ অবদান রাখছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯-এর সংকটকালীন যখন অন্যান্য সংস্থা খাদ্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন শুধু মাত্র নাবিল গ্রুপই খাদ্য সংকট মোকাবিলায় খাদ্য আমদানির মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরবরাহে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।
উৎপাদন শিল্পেও নাবিল গ্রুপ অনন্য অবদান রেখে চলেছে। রাজশাহীর পবা উপজেলার দাউকান্দিতে ১৬০ একর জমির ওপর অবস্থিত গ্রুপের শিল্পাঞ্চল নাবিল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক। এখানে অটো-রাইস মিলের দুটি ইউনিট প্রতিদিন ৫৫২ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার মানসম্পন্ন চাল উৎপাদন করছে। ময়দা মিলের দুটি ইউনিট প্রতিদিন ১০০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার মানসম্পন্ন ময়দা উৎপাদন করছে। নাবিল ডাল মিলগুলো প্রতিদিন ৮৫০ মেট্রিক টন মসুর ডাল এবং মটর ডাল উৎপাদন করছে। নাবিল ফিড মিল নিয়মিতভাবে প্রতিঘণ্টায় ১৭০ মেট্রিক টন উন্নতমানের ফিশ ফিড, ক্যাটল ফিড ও পোল্ট্রি ফিড উৎপাদন করছে। এ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে প্রায় ১৫০০০ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
নাবিল গ্রুপের গোদাগাড়ীর ঝিকরাপাড়ায় ৪০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বড় মাপের একটি পোল্ট্রি ফার্ম রয়েছে। এ ফার্মটি মালয়েশিয়ান বিগডাস্ম্যান এবং ইতালিয়ান ফ্যাকো কোম্পানির অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত। এটি সম্পূর্ণ জৈব-সুরক্ষিত এবং স্বয়ংক্রিয় একটি লেয়ার ফার্ম। এ ফার্মের প্রতিদিন ৮ লাখ ডিম উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে।
রাজশাহীর মাহিন্দ্রা, পবায় অবস্থিত এ গ্রুপের গরুর খামারে আড়াই হাজার উন্নত মানের গবাদি পশু লালন পালন করা হচ্ছে। যেখানে প্রিমিয়াম মানের গরুর মাংস, তাজা দুধ এবং দই উৎপাদন করা হয়। সেই সাথে খামারের গোবর গ্রুপের সার কারখানায় ব্যবহার করে দৈনিক ১৫ টন মান সম্মত জৈবসার উৎপাদন করা হয় । নাবিল গ্রুপের আরেকটি সফল ব্যবসায়িক উদ্যোগ নাবা ক্রপ কেয়ার উন্নত জাতের বীজ সংগ্রহ ও উৎপাদন করছে। হাই-টেক কৃষি উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য রাজশাহীর খড়খড়িতে বিশ্ব মানের মলিকিউলার ল্যাব স্থাপন করেছে এ ব্যবসায়িক গ্রুপ। বছরব্যাপী বিভিন্ন জাতের লাখো কলা ও ফুলের চারা উৎপাদন করা হচ্ছে এই অত্যাধুনিক টিস্যুকালচার ল্যাবে যা কৃষি বিপ্লবের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
রাজশাহী অঞ্চলে আরও কয়েকটি সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক খাত রয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইনসুলেটর অ্যান্ড স্যানিটারি ওয়্যার ফ্যাাক্টরি, লেদার প্রসেসিং অ্যান্ড লেদার গুডস ম্যানুফ্যাকচারিং, দুগ্ধজাত পণ্য, হাউজিং ইত্যাদি। বিসিআইসির পরিচালনাধীন বাংলাদেশ ইনসুলেটর অ্যান্ড স্যানিটারি ওয়্যার ফ্যাাক্টরি ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে ফুওয়াং টাইলস, আরএকে স্যানিটারি ওয়্যার ও টাইলস, মধুমতি টাইলস, ধীরান ইনসুলেটর, ন্যাশনাল সিরামিক, বেঙ্গল সিরামিক, মুন্নু সিরামিক প্রভৃতি অনেকগুলো স্যানিটারি ওয়্যার, টাইলস, ইনসুলেটর ও চীনামাটি সামগ্রী ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। কিন্তু এগুলোর একটিও রাজশাহী তথা উত্তরাঞ্চলে নেই। এ সব ফ্যাক্টরির প্রধান কাঁচামাল চায়না ক্লে, কোয়ার্টজ, ফেল্ডস্পার, লাইম স্টোন, বিজয়পুর ক্লে, সিলেট ক্লে, মিরপুরের রেড ক্লে প্রভৃতি। রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রচুর রেড ক্লে পাওয়া যায়। এই রেড ক্লে ও অন্যান্য কাঁচামাল দিয়ে রাজশাহী অঞ্চলে স্যানিটারি ওয়্যার সামগ্রী, রেড ফেসিং টাইলস, ওয়্যার টাইলস, ফ্লোর টাইলস, ডেকোরেটিভ টাইলস, ইনসুলেটর সামগ্রী, এমনকি চীনামাটির সামগ্রী কাপ-প্লেট-মগ প্রভৃতির কারখানা গড়ে উঠতে পারে।
গরু, মহিষ ও ছাগলের চামড়া অন্যান্য এলাকার মতো রাজশাহী অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিসম্বলিত অথবা পুরাতন প্রযুক্তির কোনো ট্যানারি এই এলাকায় নেই। অথচ এই শিল্প এই অঞ্চলে স্থাপন করা হলে গরু ও ছাগলের চামড়া প্রক্রিয়াজাতপূর্বক বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এ শিল্পের পাশাপাশি পশুর শিং ও ক্ষুর থেকে লৌহজাত পিগমেন্ট উপাদান, হাড় থেকে ক্যালসিয়াম ফসফেট সার উৎপাদন করা যায়। হাড় এবং চামড়ার বর্জিত অংশ থেকে ফার্মাসিউটিক্যাল ক্যাপসুল, উৎকৃষ্টমানের খাবার জিলেটন, জেলি, কনফেকশনারি, আইসক্রিম প্রভৃতি তৈরি করা হয়। তাছাড়া টেকনিক্যাল গ্রেট জিলেটন ও গরু চামড়ার বর্জিত অংশ থেকে উৎপাদিত হয়। যা দিয়াশলাই, প্লাস্টিক, কাগজ, জুট, কটন, প্রভৃতি কারখানায় মূল্যবান রাসায়নিক দ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রাজশাহী অঞ্চলে অনেক অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপক, প্রযুক্তিবিদ, রাসায়নিক প্রকৌশলী দেশের অন্যান্য অঞ্চলে তথা বিদেশেও কর্মরত আছেন। তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে রাজশাহী অঞ্চলে শিল্প বিকাশের প্রসার ঘটানো যায়। তাছাড়া প্রতিবছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী টেকনিক্যাল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক কলেজ, টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার প্রভৃতি থেকে অনেক প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তি বের হয়ে আসছে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা ও মানোন্নয়ন করে শিল্পে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
রাজশাহী জেলায় সাম্প্রতিককালে ব্যাপকহারে গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি ও দুগ্ধ খামারের সম্প্রসারণ ঘটেছে। বর্তমানে এর সংখ্যা প্রায় ৩ শ। বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও এনজিও ঋণে এই খামার গড়ে উঠেছে। এর ফলে মাংস ও দুধের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। দুগ্ধ খামারগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। রাজশাহীতে দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবার প্রেক্ষিতে এই খাত হয়ে উঠেছে বহুমুখী শিল্প সম্ভাবনাময়। কিন্তু এখানে কোনো দুগ্ধ ক্রয় কেন্দ্র আজও গড়ে ওঠেনি। এ ব্যাপারে রাজশাহী শিল্প ও বণিক সমিতিসহ নেতৃবৃন্দের একটি উদ্যোগের কথা জানা যায়। বাঘাবাড়ি মিল্ক ভিটার একটি কেন্দ্র স্থাপনের জন্য রাজশাহীতে সম্ভাব্যতা যাচাই ও জমি দেখাশোনার কাজ চলে। এ বিষয়টি এখনো আশ্বাসের পর্যায়ে রয়েছে। সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারির পরিসংখ্যান বলছে, রাজশাহীর অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। কৃষি উৎপাদনে সরাসরি জড়িত রাজশাহীর বিপুল সংখ্যক গ্রামীণ নারী। এ ছাড়াও ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, ব্যবসা, চাকরি এমনকি শিল্প কারখানায় পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন এ অঞ্চলের নারীরা।
এ অঞ্চলের শিল্প বাণিজ্যের এ অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে বিশেষজ্ঞ মহল বেশ কিছু সুপারিশ করেছেন। কৃষি বিশেষজ্ঞদের অভিমত, উচ্চমূল্য ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং কৃষি পণ্যের ব্যবসা ত্বরান্বিত করে। তাই দারিদ্র্য বিমোচন ও জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে অবদান রাখার লক্ষ্যে সময়মতো কৃষকদের ঋণ প্রদানের মাধ্যমে উচ্চমূল্য ফসল উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এ ছাড়া সীমান্তে গোলযোগ, বৈধ পণ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হওয়া, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট, চাঁদাবাজি, বিদ্যুতের লোডশেডিং প্রভৃতি দূর করলে সুস্থ ধারার ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি হবে। ভারত থেকে প্রতিবছর চোরাচালানের মাধ্যমে অন্তত ৫০ কোটি টাকার পণ্য অবৈধভাবেই আমদানি হয় সে জন্য রাজশাহী অঞ্চলে শিল্প উৎপাদন ও পণ্য বাজারজাতকরণ কর্মকাণ্ড মার খেয়ে যাচ্ছে সুতারাং চোরাচালান বন্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্রুত বাজারজাতকরণের সমস্যা দূরীকরণ ও রপ্তানিমুখী ব্যবস্থা তৈরির জন্য রাজশাহীতে রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ জোন (ইপিজেড) স্থাপন করা গেলে এ অঞ্চলে শিল্প বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ও কৃষি উন্নয়নকে কর্মসংস্থানের মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াও অতি গুরুত্বপূর্ণ। অনুরূপ পণ্য বাজারজাতে সমস্যার কারণেও বহু শিল্প শেষ পর্যন্ত উঠে দাঁড়াতে পারে না। বিশেষ করে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈদেশিক বাজার সৃষ্টিতে সরকারি উদ্যোগের অভাব এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তিতে জটিলতা, ফাইলের সহজ সঞ্চালন না হওয়া, চলতি মূলধনের অভাব, সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিসগুলোর যথাযথ তত্ত্বাবধান না হওয়া প্রভৃতি বিষয় খুবই সমস্যার সৃষ্টি করে থাকে বলে শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়। এসব সমস্যা ও সংকটের সুষ্ঠু সমাধান করতে পারলে উদীয়মান সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আর শাহ মখদুম সিল্ক, শিখা ফ্যান ইন্ডাষ্ট্রিজ, অ্যারোমা বিস্কুট ফ্যাক্টরি, অ্যাডকো ওষুধ ফ্যাক্টরি, শুকুর জর্দ্দা ফ্যাক্টরি, আজিজ ম্যাচ ফ্যাক্টরি প্রভৃতি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মতো রাজশাহীর শিল্প অঙ্গন থেকে কোনোদিন হারাতে হবে না।
লেখা : মো. বদরুদ্দোজা (লেখক ও গবেষক)
