ক্যারিয়ারে মাত্র তিন দিন বেকার ছিলাম

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৩, ০৯:৫০ পিএম

বরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক কাজী হায়াৎ। বাণিজ্যিক ঘরানার চলচ্চিত্রে স্বকীয়তা তৈরি করে দারুণভাবে সফল হয়েছেন তিনি। অনেক শিল্পীকে তিনি আবিষ্কার করেছেন। ৪৫ বছরের সুদীর্ঘ ও সফল ক্যারিয়ারে পেয়েছেন বিভিন্ন শাখায় ৯টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ৩টি বাচসাস পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক একাধিক সম্মাননা। ৫২টি ছবির পরিচালক ও দুই শতাধিক সিনেমার এই অভিনেতা বর্তমানে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। প্রখ্যাত এই নির্মাতা এসেছিলেন দেশ রূপান্তর কার্যালয়ে। তার সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, বিশেষ প্রতিনিধি উম্মুল ওয়ারা সুইটি, জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক আপেল মাহমুদ ও বিনোদন সম্পাদক মাসিদ রণ। ক্যামেরার পেছনে ছিলেন ডিজিটাল প্রযোজক লিটু হাসান। গ্রন্থনা : মাসিদ রণ

মাসিদ রণ : ছোটবেলার গল্প দিয়ে শুরুটা করা যাক...

কাজী হায়াৎ : আমি একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের একটি ছেলে। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী থানার তাড়াইল গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। (ঈষৎ হেসে) আপনারা এবং পাঠকরা জানলে অবাক হবেন, আমার শিক্ষাজীবন শুরুর ঘটনা শুনলে। আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয় আমাদের রান্নাঘরে। মা তালপাতা সেদ্ধ করে পেরেক দিয়ে তাতে অ আ ক খ এঁকে দিতেন। কড়াইয়ের কালি গুলিয়ে বাঁশের কঞ্চির কলমে মেখে সেই আঁকার ওপর ঘোরানো ছিল আমার প্রাথমিক শিক্ষা। এরপর আমার গ্রামের একটি পাঠশালায় যাতায়াত। সেও এক অদ্ভুত বিষয়। ১৯৪৮-৪৯ সালের কথা। আমাদের শিক্ষক ছিলেন ঋষিকেশ মুখার্জি। আমাদের গ্রাম থেকে আরও দু-তিন গ্রাম দূরে ছিল তার বাড়ি। সেখান থেকে রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে পায়ে হেঁটে আসতেন বিনা পয়সায় আমাদের পড়াতে। আমাদের গ্রাম মূলত হিন্দু অধ্যুষিত। কিছু মুসলমানও বাস করত। তিনি জাত-পাত নির্বিশেষে শিশুদের অক্ষর জ্ঞান দান করতে এতটা কষ্ট করতেন। বর্ণপরিচয় শেষে যখন ক্লাস ওয়ানে উঠব তখন ছাত্রদের নিয়ে যেতে হতো বেতের ধামায় করে মুড়ি আর খেজুরের গুড়, কিছু ফলমূল আর একটি কাঁচা টাকা। কাঁচা টাকাটি সিঁদুর মেখে গুরুদক্ষিণা হিসেবে নিয়ে নিতেন সেই ঋষিকেশ মুখার্জি। আর বাকি খাবারগুলো সবার মধ্যে বণ্টন করে দিতেন। এই যে ত্যাগী শিক্ষক, আজকের দিনে ভাবা যায় না যে, কিছু সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে লেখাপড়া শেখানোর জন্য তিনি জীবন উৎসর্গ করে গিয়েছেন।   

মাসিদ রণ : প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা কোথায়?

কাজী হায়াৎ : প্রাইমারি শিক্ষার গ-ি পার করেছি আমাদের এলাকাতেই মডেল স্কুলে। ক্লাস ফাইভে প্রতিটি স্কুলের প্রথম সারির কয়েকজন মিলে বৃত্তি পরীক্ষা হতো। আমি বৃত্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম গোপালগঞ্জে, যদিও বৃত্তি পাইনি। তবে একটা মজার ঘটনা হলো, আমি সবার মধ্যে এত ছোট ছিলাম যে, সবাই আমাকে দেখতে আসত। শুধু তাই নয়, হাই বেঞ্চে পরীক্ষা হতো, আমি বসলে নাগাল পেতাম না। তাই পুরোটা পরীক্ষা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দিতে হয়েছিল আমাকে। এরপর মাধ্যমিক শিক্ষা মদন মোহন একাডেমিতে। ম্যাট্রিক পাস করি ১৯৬৪ সালে। এরপর ভর্তি হই পাশের গ্রামের রামদিয়া শ্রীকৃষ্ণ কলেজে।

তাপস রায়হান : কোন বিভাগে?

কাজী হায়াৎ : কমার্সে। এটিও হাসি পায় ভাবলে! আমার বড় দুই ভাই পড়েছে আর্টস নিয়ে। আমার ক্ষেত্রে একটু ভিন্নতা আনার জন্য কমার্স দেওয়া হলো আমার কোনো মতামত ছাড়াই। আমি এম.কম পাস করেছি। কমার্সের পড়াশোনা আমার জন্য এতটাই কঠিন ছিল যে, রাত জেগে অনেক পরিশ্রম করে পড়াশোনা শেষ করেছি। কিন্তু আজকে বুঝি, সেই পড়াশোনা আমার জীবনে বিন্দুমাত্র কাজে লাগেনি। যা হোক, কলেজ জীবনে ফিরি। ১৯৬৭ সালে আমি কলেজের ভিপি নির্বাচিত হই ছাত্র ইউনিয়ন থেকে। সে সময় মুসলমানদের একটা সেন্টিমেন্ট কাজ করে কলেজের নাম নিয়ে যে, বেশির ভাগ ছাত্র মুসলমান, এটার নাম কেন শ্রীকৃষ্ণ কলেজ হবে? কলেজের নাম পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন বিদ্যোৎসাহী মেম্বার। কিন্তু আমি তাতে বাধা দিই। ফলে আমাকে ফোর্স টিসি দিয়ে কলেজ থেকে বহিষ্কার করে দিলেন। বহিষ্কৃত ছাত্ররা তখন ভালো কোনো কলেজে পড়ার সুযোগ পেত না। সে এক মহাবিপদের মধ্যে পড়লাম। আমি গ্রামের ছেলে, কৃষিনির্ভর পরিবার। হয়তো আমার পড়াশোনার পাঠ সেখানেই চুকে যেতে পারত। কিন্তু আমি অবিচল ছিলাম যে, আমার আরাধ্য জায়গাতে যে করেই হোক পৌঁছব। তাই পড়াশোনা ছাড়িনি। ভর্তি হই টিঅ্যান্ডটি নাইট কলেজে। কিন্তু ক্লাস করতে গিয়ে খারাপ লাগত যে, আমার সহপাঠীরা সব দাড়িওয়ালা বয়স্ক লোক। তারা আসলে নানা চাকরিজীবী, কাজের শেষে রাতে পড়াশোনা করছে ডিগ্রি লাভের আশায়। আমার বন্ধু নিমাই দাশ জগন্নাথ কলেজে পড়ল। তার কাছে পরামর্শ চাইলাম কীভাবে সাধারণ কলেজে পড়ার সুযোগ পাব। সে আমাকে কলেজ ট্রান্সফারের পরামর্শ দেয়। সেভাবেই ভর্তি হলাম পুরানা ঢাকার সলিমুল্লাহ কলেজে। তখনো যেমন জীর্ণশীর্ণ ছিল কলেজটি, কিছুদিন আগে দেখতে গিয়েছিলাম, একই অবস্থাতেই আছে, দেখে খুব খারাপ লেগেছে। যা হোক, সেখানেও মন বসল না। দুদিন ক্লাস করার পরই ট্রান্সফার হয়ে চলে গেলাম কায়েদে আজম কলেজে। এরই মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হতে লাগল দ্রুত। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, দেশের এই অস্থির সময়ে ডিগ্রি পরীক্ষা আর হলো না। আমার আর বি.কম পাস করা হলো না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করলাম। দেশ স্বাধীনের পর যে কলেজ থেকে আমাকে বহিষ্কার করা হলো সেই কলেজের প্রিন্সিপালই আমাকে আবার ডেকে নিলেন। সেখান থেকেই বি.কম পাস করলাম। এরপর ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে এম.কম সম্পন্ন করলাম। শেষ পরীক্ষার দিন খাতা জমা দেওয়ার আগে আল্লাহর দরবারে মনে মনে বললাম, আমাকে যেন আর পরীক্ষার হলে বসতে না হয়। আমি যেন আমার আরাধ্য জায়গায় অর্থাৎ সিনেমা জগতে জায়গা করে নিতে পারি।  

উম্মুল ওয়ারা সুইটি : পরিচালক হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পেলেন?

কাজী হায়াৎ : সংস্কৃতির প্রতি দুর্বলতা, সংস্কৃতিচর্চা, সিনেমার প্রতি প্রেম এসব তো আর একদিনে হয় না। ছোটবেলা থেকেই একটা জার্নির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আমিও নানা কর্মকা-ের মাধ্যমে নিজের মধ্যে সিনেমার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও টান আবিষ্কার করেছিলাম। একটা কথা আছে, কেউ যখন কিছু মনপ্রাণ দিয়ে চায় সে সেটা পেয়ে যায়। ফলে পড়াশোনা করার পর বেশিদিন আমাকে অপেক্ষা করতে হলো না। পরিচালক হওয়ার জন্য ট্রেনিং নিতে শুরু করলাম সহকারী পরিচালক হিসেবে। এফডিসির কাছেই ছিল আমার বাসা। বিজি প্রেস কোয়ার্টারের পাশেই চাচাতো ভাই লোকমান শরিফের বাসায় থাকতাম। ভাগ্যটা ভালো ছিল বলেই হয়তো আমার সিনেমায় আসার স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। নিয়মিত এফডিসিতে যেতাম। সব পরিচালকের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করলাম আর তাদের সঙ্গে কাজের বাসনার কথা বলতাম। অনেকের কাছে কাজ চাইলেও শুরুতেই পাইনি, ঘা খেয়ে খেয়ে প্রথম কাজ পাই আমজাদ হোসেনের সঙ্গে, তবে একদিন পর আর ডাকলেন না। তারপর গেলাম আজিজুর রহমানের কাছে, তিনিও একদিনের জন্য কাজে নিয়েছিলেন। অবশেষে ১৯৭৮-এর ডিসেম্বরে যোগ দিলাম মমতাজ আলীর সহকারী পরিচালক হিসেবে, ‘সোনার খেলনা’ ও ‘কে আসল কে নকল’ ছবিতে টিকে গেলাম। কিন্তু এরপর তিনি নিজেই বেকার হয়ে গেলেন। তখন টিএসসিতে বসে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সারাদিন আড্ডা আর সমষ্টি গোষ্ঠীতে সন্ধ্যায় থিয়েটার চর্চা শুরু করলাম। তবে এফডিসির মায়া ছাড়তে পারতাম না। মাঝে মাঝে এফডিসিতে আসতাম। আলমগীর কবিরের সঙ্গে আগে থেকেই টুকটাক পরিচয় ছিল, উনার মতো গুণী পরিচালকের কাছ থেকে শিখতে চাইতাম অনেক কিছু, জানার একটা স্পৃহা ছিল আমার মধ্যে। সে জন্যই গায়ে পড়ে উনার সঙ্গে কথা বলতাম, অনেক প্রশ্ন করতাম। একদিন এফডিসিতে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, আপনি কি এখন কারও সঙ্গে কাজ করছেন। আমি বললাম, না। তিনি বললেন, আমার একটি ছবির অল্প কিছু কাজ বাকি আছে। আপনি চাইলে আমার সঙ্গে অ্যাসিস্ট করতে পারেন। সেই ছবিটিই কালজয়ী ‘সীমানা পেরিয়ে’। সেই কাজ করতে করতেই আমি ছবি পেয়ে গেলাম ‘দ্য ফাদার’। পূর্ণাঙ্গ পরিচালক হিসেবে আমার যাত্রা শুরু হলো এই ছবি দিয়ে ১৯৭৮-এ। এরপর আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পুরো ক্যারিয়ারে মাত্র তিন দিন বাদে আমাকে আর বেকার থাকতে হয়নি। শুক্রবারে ‘দ্য ফাদার’ মুক্তি পেল, সোমবারে এক প্রযোজক আমাকে ফোন করে আমার দ্বিতীয় ছবির প্রস্তাব দিলেন। ছাত্রজীবনে যেসব ছবি করতে চাইতাম তেমনি একটি ছবির গল্প নিয়ে তার অফিসে গেলাম। সেটি ছিল রবীন্দ্রনাথের ক্ষুধিত পাষাণ গল্প অবলম্বনে ‘রাজবাড়ি’ ছবিটি। সেই ছবি করাকালীনই ‘দেলদার আলী’, ‘খোকন সোনা’, ‘মনা পাগলা’ একের পর এক ছবি নির্মাণের সিরিয়াল শুরু হয়ে গেল। এ পর্যন্ত ৫২টি ছবি নির্মাণ করেছি। সর্বশেষ ছবি ‘গ্রীন কার্ড’, দ্রুতই সেন্সরে যাবে। আর অভিনয় করেছি দুই শতাধিক ছবিতে।

উম্মুল ওয়ারা সুইটি : ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের ইন্ডাস্ট্রির সিনারি কেমন ছিল? এখন সিনারি কেমন দেখছেন?

কাজী হায়াৎ : আমি যখন সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে আসি তখন আমার চোখে এর অবস্থা খুব ভালো ছিল। কারও কারও হয়তো ভিন্নমত থাকতে পারে। তখন একটি ধাঁচেই ছবি হতো ইন্ডাস্ট্রিতে। ফর্মুলা ছবি বা বাণিজ্যিক ধারার ছবি বলতে আমরা যেটাকে বুঝি সেটিই হতো। এর কারণও ছিল, যা এখনকার অনেকেই জানে না। তখন সিনেমা হলে সিনেমা নিয়ে গেলেই চালাত না। এখন তো একটি সিনেমা বানালে তা মুক্তির পর যদি ১০ টাকার টিকিট বিক্রি হয় তার মধ্যে ৫ টাকা পান প্রযোজক, বাকি অর্ধেক সিনেমা হল মালিকদের। কিন্তু তখন ‘হাউজ প্রোটেকশন’ নামে একটি টার্ম ছিল। এর মানে হলো, একটি সিনেমা হলের সাপ্তাহিক যে খরচ সেটি প্রযোজক পকেট থেকে দিয়ে তারপর ছবি চালাতে হতো। ধরেন ১০ টাকা টিকিট বিক্রি হয়েছে এক সপ্তাহে, সেখান থেকে সিনেমা হলের খরচা বাবদ ‘হাউজ প্রোটেকশন’ হিসেবে ২ টাকা বাদ দিয়ে বাকি ৮ টাকা দুই ভাগ করে নিতেন প্রযোজক ও সিনেমা হল মালিক। সেই আমলে বলাকা সিনেমা হলের ‘হাউজ প্রোটেকশন’ ফি ছিল ৩০-৪০ হাজার টাকা। বুঝতেই পারছেন অঙ্কটা কত বড়! এটা তো গেল সিনেমা হিট হওয়ার পর হিসাব। আর যদি সিনেমা ফ্লপ হতো তাহলে তো প্রযোজক কোনো টাকা পেতেনই না, উল্টো ‘হাউজ প্রোটেকশন’ বাবদ তাকে গাঁটের পয়সা দিতে হতো হল মালিককে! নয়তো হল মালিকরা সিনেমার প্রিন্ট আটকে রাখত। এই অবস্থা আমি আসার আগে থেকেই ছিল। যেটি মোটামুটি আশির দশকের শেষ দিক পর্যন্ত ছিল। যেহেতু শিল্পমান সম্পন্ন সিনেমার জনপ্রিয়তা বরাবরই আমাদের দেশে কম, এ জন্যই তখন জীবনঘনিষ্ঠ সিনেমা বা আর্টস্টিক সিনেমা কেউ বানিয়ে লোকশনের ভাগিদার হতে চাইতেন না। ফলে ইন্ডাস্ট্রিতে শুধু বাণিজ্যিক ঘরানার সিনেমাই হতো।

আপেল মাহমুদ : ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ ছবি নির্মাণের অভিজ্ঞতা জানান...

কাজী হায়াৎ : কত সহস্র স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ঠাসা, তাই না? একটা বলতে গেলে দর্শকের প্রিয় আম্মাজান সিনেমাটার কথাই বলি। এ ছবি করার আগেই আমার একের পর এক ছবি সুপারহিট হয়ে জনপ্রিয়তা শীর্ষ ছুঁয়েছে। প্রযোজকরা আমার ওপর অন্য রকম আস্থা করতে শুরু করেছেন। আমার আর মান্নার জুটিটাও তৈরি হয়ে গেছে। এমন সময় আম্মাজানের গল্পটা মাথায় আসে। অবাক করা কা-, এমন পরিস্থিতিতেও একাধিক প্রযোজক ছবিটি করতে রাজি হলেন না। তাদের দাবি ছিল, যে ছবিতে নিজের মায়ের ধর্ষণের দৃশ্য ছেলে সচক্ষে দেখেছে সেই ছবি কোনোভাবেই দর্শক সাদরে গ্রহণ করবে না। তারা তো ছবিটি করতে রাজিই হয়নি, আমাকে উল্টো পরামর্শ দিল, অন্য প্রযোজককে দিয়েও যেন ছবিটি করিয়ে তাদের সর্বনাশ না করি! কিন্তু আমার তেমনটা মনে হয়নি। গল্পটি নিয়ে আমি খুব আশাবাদী ছিলাম। এমন সময় হুট করেই ডিপজল আমাকে ফোন করে বলল, দ্রুত একটি ছবি করেন আমার হাউজ থেকে। কিন্তু একটাই শর্ত মান্নাকে কাস্টিং করা যাবে না। কারণ তার কিছুদিন আগেই মান্নার সঙ্গে ডিপজলের কি একটা বিষয়ে মনোমালিন্য হয়েছে। আমি প্রযোজকের শর্ত মেনে নিয়ে প্রথমে হুমায়ুন ফরিদী, এরপর রুবেলকে নিয়ে ছবিটি করতে চাইলাম। কিন্তু তাদের সিডিউল মিলছিল না। খবরটি মান্নার কানে যেতেই আমাকে ফোন দিল। আমি একটু বকা দিয়েই বললাম, ছবিটি করতে না পারলে তোর ক্যারিয়ার থেকে একটা বড় ছবি হাতছাড়া হবে। তুই যে করেই হোক ডিপজলের সঙ্গে মিটমাট করে ফেল। অবশেষে তাদের দূরত্ব কমে গেল। এরপর মায়ের চরিত্রের জন্য প্রথমেই গেলাম শাবানা ম্যাডামের কাছে। তিনি গল্পটি শুনে রীতিমতো কাঁদলেন। পরদিন এফডিসিতে যেতে বললেন সিডিউল দেবেন বলে। আমি পকেটে নগদ দুই লাখ টাকা অ্যাডভান্স নিয়ে ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। দেখি উনি আমাকে দেখে খালি সরে সরে যাচ্ছেন। অবাক হলাম, পরে যখন কথা হলো, উনি বললেন, হায়াৎ সাহেব ছবিটি আমি করতে পারব না। কারণ হিসেবে বললেন, এখনই আমাকে মান্নার মায়ের চরিত্রে কাজ করতে অনেকেই নিষেধ করেছেন। তার নায়ক আলমগীর সাহেব, জসীম সাহেবরা হয়তো বাণিজ্যিক চিন্তা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পরে আমাকে বিখ্যাত সাংবাদিক খোকা জামান চৌধুরী একদিন বললেন, হায়াৎ সাহেব, আপনি কি জানেন শবনম ম্যাডাম পাকিস্তান থেকে দেশে থিতু হয়েছেন। উনি এ ধরনের চ্যালেঞ্জিং কাজ করবেন বলে আমার বিশ্বাস। আপনি দেখা করেন, আমি আপনার কথা বলে রাখব। আমি গেলাম, শবনম ম্যাডাম এক বাক্যে রাজি হলেন। এবং অনেক কম পারিশ্রমিকেই কাজটি করে দিলেন। শুধু তাই নয়, তার মতো অভিনেত্রী আমাকে এক সেকেন্ডের জন্য কোনো যন্ত্রণা দেননি। অসম্ভব মনোযোগ ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজটি করেছেন। তার ফল তো পরে দর্শক দিয়েছেন।

উম্মুল ওয়ারা সুইটি : মান্নার সঙ্গে আপনার সুপারহিট জুটি। তাকে আবিষ্কার করলেন কীভাবে?

কাজী হায়াৎ : মান্নাকে প্রথম দেখি ১৯৮৪ সালে এফডিসিতে নতুন মুখের সন্ধানে প্রোগ্রামে। তখন বলিউডে মিঠুনের যুগ চলছে। মান্না মিঠুনের গানেই ভালো নেচে দেখাল। এর কদিন পরেই ডিপজলের বড় ভাই শাহাদাৎ আমাকে বললেন, আমাকে এক মাসের মধ্যে একটি ছবি করে দেন, আমার জিদ আমার নানাকে অন্তত একটা ছবি প্রযোজনা করে দেখাব! আমার সৌভাগ্য যে, প্রযোজকরা বরাবরই আমার গল্প আর আমার প্রতি আস্থাশীল হয়েছেন। কে নায়ক-নায়িকা সেটা খুব একটা ভাবতেন না। এ জন্যই আমি অনেক নতুন শিল্পীকে সুযোগ করে দিতে পেরেছি। সেভাবেই মান্নার কথাটা মনে পড়ে। ঠিকানা নিয়ে তার মোহাম্মদপুরের বাসাই যাই। কিন্তু সে আমাকে নামে চিনলেও চেহারায় চিনত না বলে প্রথমে আমার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। কারণ সে তখন একটু খারাপ লোকজনের সঙ্গে ওঠাবসা করত। আমাকে ভেবেছে সিনেমায় কাজের কথা বলে তাকে বাড়ি থেকে বের করে মেরে ফেলব। তখন এমন চিত্র দেখা যেত ঢাকায়। কিন্তু আমি আসার সময় তাকে মিরপুরের একটি স্টুডিওর ঠিকানা দিয়ে এসেছিলাম, মত বদলালে দেখা করতে। সে পরে হয়তো কারও কাছে আমার সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে আশ্বস্ত হয়ে দেখি জামা কাপড় নিয়ে স্টুডিওতে হাজির। সেই শুরু হলো তার সঙ্গে প্রথম সিনেমার কাজ। অনেক বাণিজ্যসফল ছবি আমরা একসঙ্গে উপহার দিয়েছি। একটা পর্যায়ে আমার এক সহকারী পরিচালককে মান্না বলেছিল, আমি মুখে রঙ না মাখলে তো তোর ওস্তাদের পেটেও ভাত যাবে না! আমি সেটা শুনে খুব আহত হই। মনে হতে লাগল, আমিই মান্নাকে সুযোগ দিয়েছি, তৈরি করেছি। সেই এখন নিজেকে এত বড় ভাবছে, আমাকে অপমান করে কথা বলছে। আমি বরং তাকে এড়িয়ে চলি। আমি দেখিয়ে দেব, কাজী হায়াৎ চাইলে যে কাউকে দিয়েই ছবি হিট করাতে পারে। এরপর আমার ছেলেকে নিয়ে বাজি ধরলাম। সে দেখত অতটা নায়কোচিত নয়, কিন্তু তারপরও ‘ইতিহাস’ ছবিটি সুপারহিট হলো। সেটা ভিন্ন গল্প, মান্নার প্রসঙ্গে আসি। সে মৃত্যুর ছয় মাস আগে একদিন আমার বাড়িতে এসে তার কথার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে আমাকে এক লাখ টাকা দিয়ে বলল, একটা নতুন ছবি করতে হবে। এভাবেই তার সঙ্গে মনোমালিন্য দূর হয়ে যায়। 

আপেল মাহমুদ : পুত্র কাজী মারুফকে নিয়ে সম্ভাবনা দেখালেন। কিন্তু বেশিদিন দীর্ঘ হলো না সেই জার্নি। কেন?

কাজী হায়াৎ : আসলে চলচ্চিত্রের কিছু দুর্দিন এসে গেল। পাইরেসি একটা বড় কারণ ছিল। আমি পাইরেসির কবলে পড়ে ‘ইতিহাস’-এর মতো সুপার ডুপারহিট ছবিটি থেকে কোনো টাকা ফেরত পাইনি। সেই টাকা পেলে আজ আমি যথেষ্ট সম্পদের মালিক থাকতাম। এর ওপর ছিল অশ্লীল ছবির জয়জয়কার। এসব কারণেই মারুফকে নিয়ে আমার জার্নিটা শুরুতেই হোঁচট খায়। তারপরও ছবিটি দর্শক পছন্দ করেছে, আমি আর মারুফ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছিলাম। এরপর তাকে নিয়ে আরও কয়েকটি সুপারহিট ছবি আমি করেছি, কিন্তু টাকা আমার কাছ পর্যন্ত আসেনি। তা ছাড়া তার প্রতিপক্ষ তৈরি হয়েছিল, যারা ছিল অনেক স্ট্রং। ফিল্ম পলিটিক্সে পড়েই মারুফ আমেরিকায় পাড়ি জমায়।

তাপস রায়হান : পাশের দেশ ভারতেও দেখা যায় তারকা বাবা-মায়ের সন্তানরাও শোবিজে বড় জায়গা করে নেয়। কিন্তু আমাদের এখানে সেভাবে পারে না। এর কারণ কি তারা মনে করেন বাবার পরিচয়েই সব হয়ে যাবে? নাকি অন্য কোনো কারণ আছে?

কাজী হায়াৎ : এটা বললে কে কীভাবে নেবে জানি না। তাও বলতে হয়। আমরা আসলে ধর্মীয় অনুভূতির জন্য অনেকটা আটকে যাই। কারণ ইসলামে সিনেমা করা নিষেধ। আমাদের দেশের শিল্পীরা একটা পর্যায়ে এসে ধর্মীয় চিন্তা দ্বারা আবদ্ধ হই, সেটা অবশ্যই ভালো দিক। ফলে আমরা আর ছেলেমেয়েদের সেভাবে অনুপ্রাণিত করি না সিনেমার লাইনে আসতে। এ জন্যই খুব কম শিল্পী বা নির্মাতা আছেন যারা তার সন্তানকে এই লাইনে এনেছেন। আর যারা এসেছেন তারাও সেভাবে সফল হননি।

উম্মুল ওয়ারা সুইটি : বিশ্ব সিনেমায় এখন মূলধারা-বাণিজ্যিক ধারা বলে কিছু নেই। কিন্তু আমরা এখন চলচ্চিত্রকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেখি। এফসিডিকেন্দ্রিক লোকজন বিকল্পধারাকে আপন করে নিতে পারে না। নায়ক-নায়িকা দেখতে কেমন হবে তারও নির্দিষ্ট মাপকাঠি রয়েছে। এতে করে কি আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি না?

কাজী হায়াৎ : অবশ্যই পিছিয়ে যাচ্ছি। আমার মনে সিনেমার কোনো বিভাজন থাকা উচিত নয়। এফডিসির লোকেরা যেমন আর্ট ফিল্মকে টেলিফিল্ম বা নাটক বলে অনেক সময়, আর্ট ফিল্মের লোকেরাও কিন্তু এফডিসির সিনেমাকে সিনেমাই মনে করে না। এসব বিভাজন এখন ঘুচে যাচ্ছে। এবারের ঈদেও যে ছবিগুলো সুপারহিট হয়েছে তা কিন্তু তথাকথিত বাণিজ্যিক ঘরানার নয়। আমি সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসেবে যেহেতু সব ছবি দেখার সুযোগ পাই তা বলতে পারি, সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি দারুণ আশাবাদী। নতুনরা দারুণ আইডিয়া নিয়ে কাজ করছে। এর ফলে নায়ক-নায়িকার সংজ্ঞাও বদলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। এখন ভালো শিল্পীরাই কাজের সুযোগ পাবেন বেশি।

মাসিদ রণ : এমন কোনো আশা-আকাক্সক্ষা যা পূরণ হয়নি...

কাজী হায়াৎ : একটি সুপারহিট ছবি বানাতে চাই, যে টাকাটা আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত পৌঁছবে (হাহাহা)।

মাসিদ রণ : নিজের সেরা কাজটি কি দিতে পেরেছেন এখনো? দিয়ে থাকলে সেটি কোন ছবিটি?

কাজী হায়াৎ : না, আমি এখনো সেরা কাজটি করতে পারিনি। দুটো ছবির গল্প তৈরি আছে। ‘ঘুম’ আর ‘হুসনার জবানবন্দি’। এই ছবি দুটি আমার কল্পনার মতো করে বানাতে পারলে সেটিই হবে আমার সেরা কাজ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত