বরেণ্য বংশীবাদক গাজী আব্দুল হাকিম। সুদীর্ঘ সংগীত ক্যারিয়ারে দেশে-বিদেশে অনেক সুনাম অর্জন করেছেন। পেয়েছেন একুশে পদক। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বংশীবাদকদের মধ্যে তার রয়েছে একাধিক রেকর্ড। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে নিজের মেধা ও অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। এই স্পষ্টভাষী শিল্পী এসেছিলেন শুক্রবারের আড্ডার অতিথি হয়ে। আড্ডাবাজ হিসেবে ছিলেন- সিনিয়র কপি এডিটর সাইফ তারিক, সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, সিনিয়র সহ-সম্পাদক মোহসীনা লাইজু ও বিনোদন সম্পাদক মাসিদ রণ । গ্রন্থনা : মাসিদ রণ
হা
কিমের বাঁশিবাদন দিয়েই শুরু হলো। বাঁশির হৃদয়গ্রাহী ধ্বণিতে সবাই সম্মোহিত। মুখ থেকে যেন কথা আর ফোটে না। আড্ডার সঞ্চালক মাসিদ রণই নীরবতা ভাঙলেন। বললেন, ‘ধন্যবাদ আপনাকে, আড্ডার শুরুতেই এত সুন্দর একটি পরিবেশ তৈরির জন্য।’
মাসিদ রণ : ছোটবেলা দিয়েই শুরু করি। যেখানে বেড়ে ওঠা, সেখানকার পরিমন্ডল কেমন ছিল?
গাজী আব্দুল হাকিম : আমার জন্ম খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থাকার চেচড়ি গ্রামে। চারদিকে শুধু বিল আর বিল, মেঠো রাস্তার দুপাশে বড় বড় গাছের সারি। একপাশে বয়ে চলেছে ছোট্ট নদী। ডুমুরিয়া সম্পর্কে আপনারা সবাই জানেন। এলাকাটি সাংস্কৃতিকভাবে খুব উন্নত। এক সময় বাম আন্দোলনের তীর্থস্থান ছিল এই ডুমুরিয়া। হিন্দু পরিবারের সংখ্যাই বেশি ছিল আমাদের গ্রামে। ফলে গান-বাজনার চল ছিল অনেক বেশি। সন্ধ্যাবেলা পালা গান হতো, কীর্তন-কবি গান, জারি গান, যাত্রাপালা, পুতুল নাচ, সার্কাস এমনকি নাটকও হতো। এসব শিল্পীদের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই সখ্য। এমন পরিবেশেই আমার বেড়ে ওঠা।
মাসিদ রণ : বাঁশির প্রতি টান কীভাবে তৈরি হলো?
গাজী আব্দুল হাকিম : ওই যে বললাম, বিভিন্ন ধরনের শিল্পীদের সঙ্গে শৈশব থেকেই পরিচয়, তাদের সান্নিধ্য পাওয়া। ফলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি গান-বাজনার দিকে ঝুঁকে পড়ি। তারমধ্যে বাঁশি আমাকে সবচেয়ে টানত। কারণ আমার চারু কাকা বাঁশি বাজাতেন। আমার বড় ভাইও দূরের মেলা থেকে একটি বাঁশি কিনে এনেছিলেন। মাত্র তিন-চার বছর বয়সেও আমি ওত পেতে থাকতাম, ভাই কখন বাড়ি থেকে বের হবে আর আমি বাঁশিটা হাতে পাব! হিন্দুপ্রধান এলাকা হওয়ায় বিভিন্ন পূজা-পার্বণে গ্রামে মেলা বসত। আমি আর কিছু কিনি না, একটি বাঁশি আমার কিনতেই হতো। বলতে পারেন, বুঝতে শেখার আগেই বাঁশির প্রেমে পাগল আমি। তখন আমার দুধের দাঁতও পড়েনি। এত ছোটবেলা থেকেই বাঁশি হাতে তুলে নিয়েছিলাম। গান-বাজনার প্রতি এতটাই মোহাবিষ্ট ছিলাম যে, ঢাকা থেকে যদি কেউ যেত আমি তাদের ঘেরাও করতাম। কেননা, তখন খুলনা রেডিও স্টেশন হয়নি। কিশোর মানুষ আমি, ভাবতাম যারাই ঢাকা থাকে সবাই মনে হয় ঢাকা রেডিও স্টেশনের আশপাশেই থাকে। এ জন্য ঢাকা থেকে যাওয়া ফেরিওয়ালাদের কাছেও জিজ্ঞেস করতাম, তুমি কি ফেরদৌসী বেগমকে (কিংবদন্তি শিল্পী ফেরদৌসী রহমান) চেন? কলকাতার আকাশবাণী শোনা যেত, আমাদের এলাকা থেকে। সেখানে অনুরোধের গানের আসর শোনার জন্য রাত জেগে বসে থাকতাম।
মোহসীনা লাইজু : বাঁশি শিক্ষা ও চর্চার দিনগুলো কেমন ছিল?
গাজী আব্দুল হাকিম : গুরু ধরে তালিম নেওয়ার বিষয়টি এলে বলতে হয়, আমার প্রথম গুরু ওস্তাদ মুকুল বিশ^াস। তারপর দুলাল বাবু, শেখ আলী আহমেদ ও বিনয় রায়ের কাছে তালিম নিয়েছি। এই চারজন গুরু আমার। কিন্তু আমার মধ্যে চারু কাকার প্রভাবের কথা কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারি না।
মোহসীনা লাইজু : বাঁশির প্রতি এত টান, পড়াশোনা করতে পেরেছিলেন?
গাজী আব্দুল হাকিম : সত্যিই বাঁশির জন্য পড়াশোনা অনেকখানি ব্যাহত হয়েছে। এমনিতেই গ্রামের ছেলেমেয়েরা তখন ৭-৮ বছর না হলে স্কুলে যেত না। আর আমি তো আরও ছিলাম গান নিয়ে ব্যস্ত। স্কুলে যখন যাওয়া শুরু করি, প্রথমে কলার পাতায় লিখতে হতো। এরপর চক-সেøট এলো, আরও পরে কাগজ-কলমের যুগ শুরু। আমার স্মৃতিশক্তি বরাবরই ¯্রষ্টাপ্রদত্তভাবেই প্রখর। অনেক বছর আগের স্মৃতিও একেবারে টনটনে। কারও সঙ্গে একবার আলাপ হলে তাকে কোনোদিন ভুলি না। ফলে পড়াশোনার পাশাপাশি গান-বাজনা করলেও আমার রেজাল্ট খারাপ হতো না। শুধু পড়াশোনা কিংবা গান-বাজনাতেই নয়, আমি খেলাধুলায় ভালো, রাজনীতিতে ভালো, সংগঠক হিসেবে ভালো। মোট কথা যে কাজ করেছি তাতেই ভালো করার চেষ্টা করেছি। তবে বাঁশির কাছে সব হার মেনেছে। গানের প্রতি প্রবল টান থেকে ক্লাস সেভেনে থাকতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাত্রদলে চলে যাই। গ্রামের লোকেরা বলতেন, ইশ এত সুন্দর ছেলেটা নষ্ট হয়ে গেল। অবশ্য পরে তারাই আমার সফলতা, দেশ-বিদেশে পরিচিতি দেখে আমাকে নিয়ে গর্ব অনুভব করতেন। যাই হোক, আবার পড়াশোনা শুরু করি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বছর আমি ক্লাস টেনের ছাত্র। ফলে এসএসসি পাস করতে আরও দুবছর দেরি হয়ে যায়। এরপর মধুগ্রাম কলেজে ভর্তি হলেও গান-বাজনা নিয়ে এত বেশি ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায় যে, আর পড়াশোনা কনটিনিউ করা হয়নি। তখন রাজনীতিতেও অনেক মনোযোগী হয়ে ওঠায় মা আমাকে নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তা করতেন। তিনি বলতেন, আর যাই করো, রাজনীতিতে থাকতে পারবা না। তাই সবার কথা ভেবে রাজনীতি থেকেও দূরে সরে আসি। আমার পরিবার গান-বাজনা নিয়ে তাই আর বেশি বাধা দিতে পারেনি। কারণ স্টেজ শোর পাশাপাশি আমি তখন খুলনা রেডিওতে চাকরিও শুরু করি। এরপর থেকে শুধুই বাঁশির সঙ্গে পথচলা।
আড্ডাবাজদের সম্মিলিত প্রশ্ন, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্মৃতি শুনতে চাই...
গাজী আব্দুল হাকিম : একাত্তরে আমি টগবগে যুবক। আমরা বন্ধুবান্ধব মিলে ২৪টি ছেলে একসঙ্গে সশস্ত্র যুদ্ধে চলে যাই। তার আগে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের কথা বলতে হয়। যখন আসাদসহ অনেকেই মারা গেলেন, তখন তো স্কুল-কলেজ সব বন্ধ হয়ে গেল। আমি তারও আগে থেকে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলাম। শুরুতেই বলেছিলাম, আমার এলাকা ডুমুরিয়া মার্কসবাদী, লেনিনবাদীদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। তখন আমার নাম ছিল জামান। বামপন্থি বড় নেতা মজিদ সাহেব, অনাদি বাবু, হাবিব মাস্টারের সঙ্গে আমি সমান্তরালভাবে রাজনীতি করেছি। সে সময় আমরা মিছিল মিটিং করেই দিন পার করেছি। একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ শুনতে পাই রেডিওতে। আমি তো সাংঘাতিকভাবে উদ্বুদ্ধ হই দেশ স্বাধীনের ব্যাপারে। এরপর আমরাও সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছি। লাঠিসোটা, গ্রাম্য হাতিয়ারসহ যার যা আছে তাই নিয়েই নিজেদের মতো প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেছি। এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ইপিআরের দুজন সদস্য লুকিয়ে আমাদের বাড়িতে এলেন। তাদের কাছ থেকে দুটি বন্দুক পেলাম। পাকিস্তান আর্মিতে ছিলেন ওদুদ নামের একজন, তিনিও চলে এলেন আমাদের প্রশিক্ষণ দিতে। এরপর মোজাম্মেল হক যখন আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন তখন আমরা পুরোদমে কাজ শুরু করলাম। আমাদের একটা বড় সুবিধা হলো, আমাদের চেচড়ি গ্রামটা দৌলতপুর, ফুলতলা, ডুমুরিয়া, যশোরের অভয়নগর, কেশবপুর থানার মোহনা। ফলে আমাদের গ্রামে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও অপারেশন পরিচালনা করা বেশ সহজ ছিল। আসাদ নামের একজন বরিশাল এমএম কলেজের ভিপি ছিলেন তখন। তারাও আমাদের সঙ্গে এসে যোগ দিলেন। আমার কাঁধে দায়িত্ব পড়ল তাদের অস্ত্র সংগ্রহের। আমার বড় ভাই কাদের গাজী, মামা মোকসেদ গাজী আর আমি ভবদার সøুইস গেটের তীব্র স্রোতের মধ্য দিয়ে নদী পার হয়ে সেই অস্ত্র সংগ্রহ করে নিয়ে আসি আমাদের ঘাঁটিতে। আমরা প্রায় শখানেক লোক দেশের মধ্যেই প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতার বলে যুদ্ধ করে টিকে ছিলাম। আমি একাধিক সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিই। আমার সামনেই সহযোদ্ধা আলীর মস্তক দিখ-িত করা হয়! আরও কত যে ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে হয়েছে, বলে বোঝানো সম্ভব নয়। অনেকবার জীবন যায় যায় করে আবার ফিরে পেয়েছি। নিজেদের এলাকাতে পাক-বাহিনী ও শান্তি বাহিনীর হাত থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করেছি আমরা।
মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোর অনেক স্মৃতিচারণের পর আবার আমরা ফিরে আসি হাকিমের বাঁশির জগতে।
মাসিদ রণ : প্রথম প্রফেশনাল প্রোগ্রাম কবে? সেই অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
গাজী আব্দুল হাকিম : সেটাও অনেক ছোটবেলায়। পাকিস্তান আমলেই প্রথম পেশাগতভাবে স্টেজে উঠে বাঁশি বাজাই। এত ছোট একটা ছেলে এত দক্ষতার সঙ্গে বাঁশি বাজাচ্ছে দেখে সবাই খুব অ্যাপ্রিসিয়েট করেছিল। এরপর থেকেই আশপাশের এলাকাতেও আমার নাম ছড়িয়ে পড়ে। আমি তখন থেকেই বেশ ভালো পারিশ্রমিক নিয়েই বাজাতে থাকি।
সাইফ তারিক : আপনি সশরীরে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। গানের মানুষ হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে কি কোনো যোগাযোগ ছিল?
গাজী আব্দুল হাকিম : না। আমি তখন ঢাকাতে আসিনি। প্রতিষ্ঠিত কোনো শিল্পীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগও ছিল না। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময়ও কিন্তু আমি বাঁশি থেকে দূরে ছিলাম না। একটু সুযোগ পেলেই বাঁশি নিয়ে বসতাম। সহযোদ্ধারাও বায়না করত, তারা আমার বাঁশি শুনে দু দন্ড মানসিক তৃপ্তি পেত। ওই অন্ধকার সময়ে এটাও কম কথা নয়! আর স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের কথা জানতাম। পরবর্তী সময় ঢাকা এসে ক্যারিয়ার শুরুর পর স্বাধীন বাংলার বেতারের শিল্পীদের অনেকের সঙ্গেই আমার ভালো বন্ধুত্ব হয়।
তাপস রায়হান : বাঁশের বাঁশি একেবারেই আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে উঠে এসেছিল। কিন্তু এখন কি বাঁশের বাঁশির চর্চা অনেকটা ক্ষয়িষ্ণু?
গাজী আব্দুল হাকিম : একদম ঠিক বলেছেন, আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গেই বাঁশের বাঁশির সংযোগ। হিন্দু মাইথোলজি, বিশেষ করে রাধা-কৃষ্ণ আখ্যানে এটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেদিক থেকে বাঁশির চর্চা আমাদের অব্যহত রাখা উচিত। নতুন শিল্পী তৈরি হওয়া উচিত, কিন্তু ততটা হচ্ছে না বলে আমার আফসোস রয়েছে।
সাইফ তারিক : বাঁশিকে এখন ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের মধ্যেই নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু বাঁশির সঙ্গে শুরু থেকেই বাঁশের সম্পর্ক, গ্রামীণতার সম্পর্ক। ফোক মিউজিকে এটি অপরিহার্য। এই দুই ধাঁচের মিউজিকে একই যন্ত্রকে আপনারা কীভাবে সমন্বয় করেন?
গাজী আব্দুল হাকিম : পান্নালাল ঘোষ প্রথম বাঁশিকে ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের সঙ্গে সংযোগ করেছেন। এরপর প-িত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া, এখন রাকেশ চৌরাশিয়া, কিংবা আরও অনেক গুণী শিল্পী সেই ধারাকে দারুণ একটা জায়গায় নিয়ে গেছেন। ফলে বাঁশের বাঁশি এখন শুধু আমার দেশের বাদ্যযন্ত্র হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইনস্ট্রুমেন্ট হিসেবেই ধরা হয়। বাঁশি এখন শুধু বাঁশের নয়, মেটালিকসহ নানা ধরনের হয়ে থাকে। আমরা বললে কেমন শোনাবে জানি না, কিন্তু সত্য বলতে অসুবিধা কোথায়? এই যে দেশীয় একটি যন্ত্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এর পেছনে বাংলাদেশিদের মধ্যে আমার অনেক অবদান আছে। যাই হোক, গ্রামবাংলার সোঁদা গন্ধ মাখা এই বাঁশের বাঁশিই রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, পল্লীগীতি, ওয়েস্টার্ন মিউজিক (আমি কদিন আগে বেলজিয়ামের বিখ্যাত দাদা স্টুডিওতে ফ্রান্সের একটি গ্রুপের সঙ্গে বাজিয়ে এলাম) কিংবা হিন্দুস্তানি ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের সঙ্গে বাজানো হয়। আবার সেই বাঁশি নিজেই ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক হয়ে ওঠে। এটা আসলে চর্চার মাধ্যমেই সম্ভব। আমরা এক বাঁশিকেই গান বা কম্পোজিশন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারি।
মাসিদ রণ : বিশে^র বহু দেশে বাঁশি নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। কিছু অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাই?
গাজী আব্দুল হাকিম : বেলজিয়ামের বিশ্ববিখ্যাত বোজার হলে আমি কয়েক বছর আগে পারফর্ম করেছি। ১৯৯৪-এ হাউজ অব কমন্সে বাজিয়েছি, যেটা বিশ্বের আর কোনো বংশীবাদকের সৌভাগ্য হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের মেডিসিন স্কয়ারে বাজিয়েছি। এমন অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা যখন হয় তখন বারবার মনে পড়ে দেশের কথা। মনে হয়, নিজের দেশের প্রতি আমার একটা দায়বদ্ধতা আছে, বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করছি বিশ^ দরবারে। মুক্তিযুদ্ধের থ্রি নট থ্রি রাইফেল ছেড়ে বাঁশের বাঁশিকেই সঙ্গী করে নিয়েছিলাম। এই বাঁশিই তখন হয়ে ওঠে বাংলাদেশের প্রতীক। বাংলাদেশকে তখন এই বাঁশি দিয়ে চিনতে পারে বিদেশিরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যেমন আমার নাম জড়িত, তেমনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমি আরেকবার যুদ্ধ করি বাঁশির মাধ্যমে। সেই যুদ্ধের উদ্দেশ্য বিদেশিদের মন জয় করা। আমার দেশপ্রেম, চেতনা কিংবা দায়িত্ববোধ আর পাঁচটা শিল্পীর মতো নয়। অনেকেই প্রশ্ন করেন- আপনি ফেরদৌসী রহমান, ফিরোজা বেগম, সনজিদা খাতুন, কলিম শরাফি, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, ফরিদা পারভীনের মতো শিল্পীর সঙ্গে বাজিয়েছেন। এত বড় অর্জন আপনার। এখনো কেন নতুন শিল্পীদের সঙ্গে বাজাতে হবে! আমি তখন বলি, এটা আমার দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা। আর পাঁচটা মানুষের সঙ্গে আমার মানসিকতা মিলবে না। তারা মন্ত্রী হতে চেয়েছে, আমি হতে চেয়েছি যন্ত্রী। ‘ম’ আর ‘য’-এর মধ্যে তো পার্থক্য আছে! আমি বাঁশিবাদক হতে চেয়েছি। শুধু দেশের নয়, সারা বিশে^র হতে চেয়েছি। আমার জ্ঞান, কবরে নিয়ে যেতে পারি না। পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে তা ছড়িয়ে দিতে হবে। এ জন্য ‘অচিন পাখি’ নামের একটি একাডেমিও খুলেছি। যেখান থেকে অনেক ছেলেমেয়ে বাঁশিশিল্পী হয়ে বের হচ্ছে। এখন যারা দেশে প্রফেশনালি বাঁশি বাজাচ্ছে, তার অধিকাংশই তো আমার ছাত্র। এটাই আমার গর্ব। কারণ, এমন একটি কাজ করে যাচ্ছি যাতে আমি মরে যাওয়ার পরও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আমার নামটা গুরু পরম্পরায় থেকে যাবে।
তাপস রায়হান: আপনার সহধর্মিণী ফরিদা পারভীন কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী। তার সঙ্গে আপনার পরিচয়, প্রণয় ও কাজের অভিজ্ঞতা শুনতে চাই...
গাজী আব্দুল হাকিম : পরিচয় তো বহু বছরের। অবধারিতভাবেই গানের জন্যই পরিচয়। এরপর সুরের সঙ্গে সুরের মেলবন্ধন। যা প্রণয়ে রূপ লাভ করে। কাজের অভিজ্ঞতা মধুর না হলে তো আর ব্যক্তিগত সম্পর্কে যাওয়া যায় না! তিনি অসামান্য শিল্পী, তাকে নিয়ে নতুন করে আর কী বলব? তিনি নিজেই নিজের তুলনা। আমি তার সংগীতসাধনা, চর্চা, দর্শন, ধ্যান ও জ্ঞানের ভক্ত। এসব কিছুতেই আমাদের সহাবস্থান রয়েছে। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।
মাসিদ রণ : ফরিদা পারভীন আর আপনি মিলে ‘অচিন পাখি’ সংগীত একাডেমি পরিচালনা করছেন। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে বাঁশি বা যন্ত্রসংগীত চর্চা কোন পর্যায়ে আছে বলে মনে করেন?
গাজী আব্দুল হাকিম : অ্যাকুইস্টিক যন্ত্র সংগীতের চর্চা সত্যিই অনেক কম, যা আমাকে ভাবায়। এ জন্য আমরা দুজন কাজ করছি। কিন্তু সেটা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই সীমিত। দ্ব্যর্থহীনভাবে আমি বলতে পারি, সবার দায় নিতে হবে, এগিয়ে আসতে হবে। সব টিভি চ্যানেল কিংবা প্ল্যাটফরম শুধু কণ্ঠশিল্পী তৈরি করতে চায়। কিন্তু তাদের সঙ্গে বাজাবে কে, সেদিকে কারও নজর নেই। কণ্ঠশিল্পীর পাশাপাশি যদি তারা যন্ত্রশিল্পী তৈরির দিকেও একটু মনোযোগী হয়, তাহলে চর্চা আপনাতেই বাড়বে। আর যারা বড় বড় শিল্পী, সংগীত পরিচালক কিংবা ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট আছেন, তারা প্রত্যেকে মাত্র ৫ জন করে যন্ত্রশিল্পীর শিক্ষা ও চর্চার দায়িত্ব নিতে পারেন। দেখুন না, কীভাবে অবস্থার পরিবর্তন হয়ে যায়। ‘বাংলাদেশ মিউজিশিয়ান ফাউন্ডেশন’-এর সভাপতি আমি। এত কিছু দায়িত্ব পালন করে এটুকু অনুধাবন করেছি। বারবার সরকারকে এই কথাগুলো বলতে চেয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে একটি কথা অন্তত বলতে পেরেছি যে- আপা, এই ব্যাপারে নজর দিতে হবে। তিনিও আমাকে দেখলেই জিজ্ঞেস করেন, তোমার মিউজিশিয়ানরা কেমন আছে? করোনার সময় যখন কোনো তারকা, শিল্পী বা অর্থবানরা এগিয়ে আসেননি তখন অল্প হলেও আমি সরকারের কাছ থেকে মিউজিশিয়ানদের জন্য অর্থ সহায়তা এনে দিতে পেরেছি।
মাসিদ রণ : আপনার এত লম্বা জার্নি। আপনি কতটা তুষ্ট?
গাজী আব্দুল হাকিম : আমার ব্যক্তিগত জার্নিতে খুশি। আমি পরাধীন দেশের শিল্পী হতে চাইনি। আমি স্বাধীন দেশের গাজী আব্দুল হাকিম, এই পরিচয় নিয়েই সারা বিশ্বে পারফর্ম করেছি। এর চেয়ে তৃপ্তি আমার নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাকে অনেকেই বলেছেন, ভারতে থেকে যেতে। আমি বলেছি, এটা তো আমার দেশ হলো না। আমার দেশ বাংলাদেশ, রক্ত দিয়ে স্বাধীন করেছি যে দেশ। এখনো আমাকে ইউরোপ আমেরিকার অনেক দেশে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়। আমার একই উত্তর, অন্য দেশে বেশি রোজগারের চেয়ে নিজ দেশে মাথা উঁচু করে বাঁচার স্বাদই আলাদা। তবে দেশের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে ভাবলে কিছু জিনিস শিল্পী হিসেবে আমাকে খুবই কষ্ট দেয়। যারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান তাদেরই তো একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়। তাহলে তারা কেন সচিবালয়ে ঢুকতে পাশের জন্য অপেক্ষা করবে? এয়ারপোর্টে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবে? কোনো জায়গায় প্রথম সারির নাগরিকের সম্মান পাবেন না তারা ! প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কেন তাদের মর্যাদাটুকু পর্যন্ত পাচ্ছেন না। কেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা সব সুবিধা ভোগ করছে? আমার প্রশ্ন, ভারতে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ শুরু হয় যুদ্ধ শুরুর আরও কয়েক মাস পরে। সেই প্রশিক্ষণ শেষে তারা যুদ্ধ শুরু করে। কিন্তু তার আগের মাসগুলোয় কারা যুদ্ধ করে দেশটাকে টিকিয়ে রেখেছিল? তাদের কি মুক্তিযোদ্ধা বলা যাবে না? তাহলে কেন তারা সবাই সেই পরিচয়টা পেল না আজ পর্যন্ত? এটা তো কঠিন কোনো কাজ নয়, আমাকে দায়িত্ব দিলেই আমি সেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা বের করে ফেলতে পারব।
