কবি নির্মলেন্দু গুণ। তার লেখা কবিতা, গল্প, ছড়া এবং জীবনীগন্থ পেয়েছে প্রবল জনপ্রিয়তা। ছবিও আঁকেন। এই কবির সঙ্গে কথা বলেছেন তাপস রায়হান
এবারের বইমেলায় আপনার কয়টি বই আসছে?
নির্মলেন্দু গুণ : বের হবে। ৩টা বই। এখন তো আবার নাম জিজ্ঞাসা করবা? ঐটা কিন্তু মনে নাই।
আপনার বই পাঠককে কেন পড়তে বলবেন?
নির্মলেন্দু গুণ : কাউকে আমি বলব না বই পড়ার জন্য। কেউ যদি স্বেচ্ছায় পড়ে, পড়বে।
বই পৌঁছানোর কোনো কৌশল কি অবলম্বন করেন?
নির্মলেন্দু গুণ : না, কখনো করিনি। তরুণ বয়সে এসব করতাম। এই বয়সে এসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো আচরণ করা উচিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়সে পৌঁছে আমি তো তরুণ কবিদের মতো আচরণ করতে পারি না।
আমাদের বই প্রকাশ, প্রচার, আলোচনার প্রবণতা অনেকটা ফেব্রুয়ারি মাসকেন্দ্রিক। বছরের বাকি ১১ মাস কোনো খবর থাকে না। এ বিষয়ে কী বলবেন?
নির্মলেন্দু গুণ : সাহিত্য তো এক মাসের বিষয় না। এটা সারা বছর চর্চার বিষয়।
বইমেলার আয়োজন এবং পুরস্কার নিয়ে বাংলা একাডেমি সম্পর্কে একটা সমালোচনা রয়েছে। সার্বিকভাবে বাংলা একাডেমির ভূমিকা কেমন দেখছেন এবং কেমন হতে পারে?
নির্মলেন্দু গুণ : বইমেলাটা বাংলা একাডেমি থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আমি দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলাম। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এটা সরিয়ে নিয়ে ভালো কাজ করেছে। বইমেলা আয়োজনের দায়িত্ব বাংলা একাডেমি থেকে সরিয়ে নিলে বাংলা একাডেমি তার যে স্বাভাবিক কর্মকা-, তার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবে। মেলা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় দুই মাস তাদের অন্যান্য কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে যায়। এটা বাংলা একাডেমির কার্যক্রমের জন্য ক্ষতিকর। এই মেলা প্রকাশকরা করুক? তারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই করবে।
বাংলা একাডেমি একুশের ভাষাশহীদদের স্মরণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আগে যেভাবে করত, এখনো তাই করবে। কিন্তু মেলার স্টল বণ্টন, তদারকি এসবের দায়িত্বে তাদের থাকার দরকার নেই। কলকাতার বইমেলা তো রাইটার্স গিল্ড করে। কোনো প্রতিষ্ঠান করে না। পৃথিবীর কোনো দেশের বইমেলা, সেই দেশের কোনো একাডেমি পরিচালনা করে না। এটা বাংলা একাডেমির অতিরিক্ত বোঝা। একুশে ফেব্রুয়ারির কপিরাইটকে ব্যবহার করে, তারা মেলার নেতৃত্ব নিজেদের হাতে রাখতে চায়।
একসময় আমাদের প্রকাশনা শিল্প খুব দুর্বল ছিল। স্বাধীনতার আগে প্রকাশকদের মেলা করার মতো কোনো সুযোগ বা ব্যবস্থা ছিল না। চিত্তরঞ্জন সাহা মেলা শুরু করেছিলেন কারণ, একাত্তরে তিনি কলকাতায় প্রবাসী লেখকদের বই প্রকাশ করেন। সেখানে বিনিয়োগ করেছিলেন লাখ লাখ টাকা। মুক্তিযুদ্ধ প্রলম্বিত হলে, সেই বইগুলো বিক্রি হতো। যেহেতু বই প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়, তখন চিত্তরঞ্জন সাহাও সেই বইগুলো নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৭২ সালে প্রথম আমরা যখন ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করলাম, তখন একটি চট বিছিয়ে সেই বইগুলো নিয়ে তিনি বসে পড়লেন। দুপুরের দিকে সেটা চলে এলো বাংলা একাডেমিতে। আমিও সেখানে ছিলাম। তিনি তো আমার বই প্রকাশ করেছিলেন। আমি চিত্তদার এই উদ্যোগকে সম্মান জানাই। তখন প্রকাশকদের মধ্যে একটা আগ্রহ সৃষ্টি হলো। তারা ভাবলেন, বইমেলা করলে পাঠকদের কাছ থেকে সারা পাওয়া যাবে। এরপর ১৯৭৩ সালে নতুন কয়েকজন প্রকাশক তাতে যোগ দিলেন। এভাবে কিন্তু মেলার শুরু। বইমেলায় বাংলা একাডেমির কোনো ভূমিকাই থাকা উচিত না। তারা অ্যাকাডেমিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করুক। এটা বাংলা একাডেমির জন্মসূত্রে প্রাপ্ত কোনো বিষয় না। তবু বাংলা একাডেমি নিজস্বতা দাবি করে। এই ব্যবসাকে নিজেদের করায়ত্তে রাখতে চায়। ওই যে, দুই মাস ছুটি পাওয়া যায়। কোনো কাজ নেই। আর সব তো বন্ধ। মাতব্বরি করার এবং নেতৃত্বের নেশায় পেয়ে বসেছে বাংলা একাডেমিকে।
বইমেলাকে কীভাবে লেখক-পাঠক ঘনিষ্ঠ করা যায়?
নির্মলেন্দু গুণ : লেখক-পাঠক ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য তো অনেক অনুষ্ঠান হচ্ছে। সেখানে একজন পাঠক একজন লেখককে প্রশ্ন করার সুযোগ পান। তবে আরও অনুষ্ঠান করা যায়। প্রতিদিন একজন লেখক যদি একটা অনুষ্ঠান করেন, তাহলেই তো হয়। তারা সবাই যদি সম্মানী পায়, তাহলে সবাই আরও ঘনিষ্ঠ হবে। একটা প্রাতিষ্ঠানিকতা আসবে। এখানে লেখক-পাঠক ঘনিষ্ঠ হবে।
অনেকে বলেন, বইয়ের পাঠক কমছে। আবার কেউ বলে বাড়ছে। আপনার কী মনে হয়?
নির্মলেন্দু গুণ : জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, সেই হারে পাঠক বাড়ছে না। আবার পাঠকের সংখ্যা যে কমে গেছে সেটাও বলা যাবে না। মেলায় বইয়ের স্টল সংখ্যা তো বাড়ছে। এর মানে প্রকাশকের সংখ্যা বাড়ছে। সুতরাং পাঠক তো বাড়ছেই।
