সামাজিক নিয়ম হচ্ছে উপকারের বিনিময়ে উপকার করা। যেহেতু সব উপকারের বিনিময়ে উপকার করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়; তাই আমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার মধ্যে অনেক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তাই তো গুণীজনরা বলেন, ‘কোনো পুরস্কার দিতে তোমার হাত যদি সংকীর্ণ হয় তাহলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তোমার জিহ্বাকে যথেষ্ট লম্বা করো।’
আল্লাহতায়ালা বান্দার কল্যাণের জন্যই আকাশ, বাতাস, চন্দ্র, সূর্য, তারকারাজি, আগুন, পানি, মাটি, লতা-পাতা, বৃক্ষরাজি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। এজন্য পৃথিবীর মালিক মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে হবে। আল্লাহতায়ালা কোরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো কেবল স্বীয় কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয়। আর সে অকৃতজ্ঞ হলে তো আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।’ (সুরা লোকমান ১২)
উপকারের বিনিময়ে উপকার করা অথবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা ভদ্রতার উত্তম নমুনা। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের পাশাপাশি ওই সব মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে হবে যারা আমাদের উপকার করেন। উপকারী ব্যক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের গুরুত্ব এই হাদিস দ্বারা স্পষ্ট হয়, যাতে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে মানুষের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ হয় না।’ (তিরমিযি ১৯৫৫)
দুনিয়ার সাধারণ নিয়মে আমরা ভদ্রতাসুলভ উপকারী ব্যক্তির উপকারের বিনিময়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘শুকরিয়া’, ‘জাজাকাল্লাহ’, ‘ধন্যবাদ’, এ ধরনের কোনো শব্দ দ্বারা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। তবে হাদিসের ভাষায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সর্বোত্তম পরিভাষা হচ্ছে, ‘জাজাকাল্লাহু খাইরান’ অর্থাৎ আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা শুধুমাত্র ভদ্রতাই নয়; বরং এতে রয়েছে প্রত্যেক মানুষের শারীরিক ও মানসিক অনেক উপকার।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অপেক্ষাকৃত বেশি কৃতজ্ঞ, তাদের মধ্যে মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা, অমূলক ভয়ভীতি, অতিরিক্ত খাবার অভ্যাস, মদ, সিগারেট ও ড্রাগের প্রতি আসক্তির ঝুঁকি অনেক কম। আরেক গবেষণায় পাওয়া যায়, যার মূলকথা হলো, মানুষকে নিয়মিত আরও বেশি কৃতজ্ঞ হতে অনুপ্রাণিত করলে, মানুষের নিজের সম্পর্কে যে হীনমন্যতা আছে, নিজেকে ঘৃণা করা, নিজেকে সবসময় অসুন্দর, দুর্বল, উপেক্ষিত মনে করা, এ রকম বিভিন্ন ধরনের সমস্যা ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত দূর করা যায়। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতামত হলো, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মনোভাব মানুষকে আরও ইতিবাচক হতে, উত্তম অভিজ্ঞতা থেকে আনন্দ লাভ করতে, স্বাস্থ্যকে আরও উন্নত করতে, দুর্দশার সঙ্গে মোকাবিলা করতে এবং দৃঢ়বন্ধন গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশে প্রতিটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক উপকার নিহিত রয়েছে বলেই কোরআনে আল্লাহতায়ালা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য অত্যধিক গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি আমাদের দৈনিক নামাজের মাধ্যমে বেশি বেশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছেন। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য দৈনিক পাঁচবার নামাজ আদায় করা ফরজ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ১৭ রাকাত হলো ফরজ। সঙ্গে সুন্নত নফল তো আছেই। প্রতি রাকাতে সুরা ফাতেহা অবশ্যই পড়তে হয়। তার মানে হচ্ছে, আমরা নামাজের প্রতিটি রাকাতে দাঁড়িয়ে প্রথমেই বাধ্যতামূলকভাবে মহান প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। সর্বদা নামাজে দাঁড়িয়ে বলি, ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।’ অর্থাৎ ‘সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সৃষ্টিজগতের প্রভু।’ আল্লাহতায়ালা এভাবেই আমাদের বেশি বেশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছেন।
মানবজীবনে সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিত। আল্লাহতায়ালা মানবজাতিকে বিপদে ফেলে, অসুস্থতায় আক্রান্ত করে, বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে দেখেন, বান্দা তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে কি না? বান্দা যদি কৃতজ্ঞ হয়, তাহলে তার জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান। কৃতজ্ঞতার পুরস্কার সম্পর্কে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করেছেন যে, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য এ অনুগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেব এবং যদি একে অস্বীকার করো তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর।’ (সুরা ইব্রাহিম ৭)
কোরআনে আল্লাহতায়ালা কৃতজ্ঞতার প্রসঙ্গ যতবার উল্লেখ করেছেন ততবারই অকৃতজ্ঞ হতে নিষেধ করেছেন। কেননা অকৃতজ্ঞতা ও দম্ভের কারণে শয়তান অভিশপ্ত হয়েছে। আর অভিশপ্ত শয়তান এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করেছে যে, সে কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের অনিষ্ঠ সাধনে কাজ করে যাবে। তাই শয়তান খুব কৌশলে মানুষকে হিংসাপ্রবণ, অহংকারী ও অকৃতজ্ঞ বানায়। শয়তান কীভাবে মানুষকে অকৃতজ্ঞ বানাবে সে নিজেই বলে দিয়েছে। আল্লাহতায়ালা মানুষকে সতর্ক করার জন্য তা কোরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘আমি মানুষের কাছে আসব তাদের সামনে থেকে, তাদের পেছন থেকে, তাদের ডান দিক থেকে এবং তাদের বাম দিক থেকে। আপনি দেখবেন তারা বেশির ভাগই অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা আরাফ ১৭)
শয়তান কীভাবে মানুষকে অকৃতজ্ঞ বানায় একটু চিন্তা করে দেখুন! আমরা যখন দেখি কোনো জিনিস আমাদের কাছে নেই, কিন্তু আশপাশের অন্য মানুষের কাছে তা ঠিকই আছে। গাড়ি-বাড়ি, সন্তান-সন্ততি, বিয়ে-শাদি, চাকরি-বাকরি ইত্যাদির ক্ষেত্রে অনেক চাওয়ার পরও আমরা যখন তা পাই না বা শতভাগ সফল হতে পারি না, তখন আমরা আক্ষেপ করতে থাকি আর মনে মনে প্রশ্ন করতে থাকি, তাহলে আমার নেই কেন? আমি কী দোষ করেছি? অনেক সময় শুরু হয়ে যায় আল্লাহকে নিয়ে অভিযোগ। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আল্লাহতায়ালা দুনিয়াবাসীর প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, অফুরন্ত নেয়ামত দান করেছেন, এর বিনিময়ে তিনি তার স্মরণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। কোরআনের সুরা বাকারায় আল্লাহতায়ালা উল্লেখ করেছেন, ‘আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, আর অকৃতজ্ঞ হয়ো না।’ সুতরাং আমাদের আবশ্যই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে হবে। মহান আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের তুলনায় আমাদের শুকরিয়া জ্ঞাপন খুবই সামান্য। আল্লাহর অফুরন্ত নিয়ামতরাজির যথাযথ কৃতজ্ঞতা দেখানোর সামর্থ্য মানুষের নেই। আল্লাহ মহান। আমাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার প্রয়োজন আল্লাহর নেই; বরং আমাদের কল্যাণের জন্যই আমাদের আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে হবে।