কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। গতকাল রবিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান এ নির্দেশনা দেন, যা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আকারে গণমাধ্যমকর্মীদের জানানো হয়।
তবে কোন প্রক্রিয়ায় এবং কত দিনের মধ্যে সম্পদ বিবরণী জমা দিতে হবে, তা বলা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সভা করে শিগগিরই বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
দেশে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারী রয়েছেন। চাকরিজীবীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পাঁচ বছর পরপর সম্পদ বিবরণী নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও তা কার্যকর নেই। কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর বা সংস্থারও হিসাব নেওয়ার ব্যাপারে গরজ দেখা যায় না। উল্টো হিসাব বিবরণী জমা দেওয়ার বাধ্যবাদকতা তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। নির্দিষ্ট সময় পরপর হিসাব বিবরণী জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে আচরণবিধিতেও। এ বিধান বাতিলসহ আরও কিছু প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করে তা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তা ঝুলিয়ে রাখে আইন মন্ত্রণালয়। এ অবস্থায় দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মধ্যেই সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার কাজ শুরু করল অন্তর্র্বর্তী সরকার।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন, সরকারি কর্মচারীদের নিয়মিত তাদের সম্পদের বিবরণী জমা দিতে হবে। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমাদের উপদেষ্টারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করবেন। সব সরকারি চাকরিজীবীর জন্য নিয়মিত সম্পদ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হবে।’
এর আগে গত ১৪ আগস্ট আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেছিলেন, বিচার বিভাগীয় সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশ-বিদেশে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসাব বিবরণী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদ ও এনবিআর থেকে বদলি হওয়া কর্মকর্তা মতিউর রহমানের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর সরকারি কর্মচারীর সম্পদের হিসাবের বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় আসে। প্রতি বছরই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আয়কর বিবরণী জমা দেন সরকারি কর্মচারীরা। সেখানেই তাদের সম্পদের হিসাব থাকে। সরকারের প্রয়োজন হলে এনবিআর থেকে আয়কর বিবরণী সংগ্রহ করলেই কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব জানা যাবে। সম্পদের হিসাব আলাদা করে না দেওয়ার জন্য এসব যুক্তি দিতেন জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা।
এদিকে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মতে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে সার্বিকভাবে দুর্নীতি বেড়েছে। সংস্থাটি গত বছর দুর্নীতির যে ধারণা সূচক প্রকাশ করে, সেখানে আগের বছরের চেয়ে দুই ধাপ নিচে নামে বাংলাদেশ। সূচক অনুযায়ী, বিশে^র সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন দশম।
২০১৯ সালে ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর সাইফুজ্জামান চৌধুরী তার দপ্তরের কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু অন্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেননি। বিষয়টি অনানুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিসভা বৈঠকে গড়ালে এরপর তা আর আলোর মুখ দেখেনি।
২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারও কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা নিয়েছিল। কিন্তু লাখ লাখ কর্মচারীর তথ্য বিশ্লেষণ করার মতো জনবল জনপ্রশাসনের না থাকায়, তা শেষ পর্যন্ত ফিতাবন্দিই ছিল।
