ভারতে এবার ‘কনকাশন’ পরিস্থিতি বদলে দেবে বাংলাদেশ!

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:১০ এএম

কলকাতার নন্দনকাননে সেদিন সাজসাজ রব। বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট সৌরভ গাঙ্গুলীর ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। ভারতের মাটিতে প্রথমবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দিবা-রাত্রির টেস্ট ম্যাচ। এই উপলক্ষ স্মরণীয় করে রাখতে তিনি চেষ্টার কমতি রাখেননি। বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে ২০০০ সালে অভিষেক টেস্ট খেলা বাংলাদেশ দলের সদস্যদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন। উপস্থিত ছিলেন ভারতের গণ্যমান্যরাও। নতুন ধরনের এই টেস্ট ম্যাচ ঘিরে দুই দেশের সমর্থকদেরও ছিল প্রবল আগ্রহ। টিকিট কাউন্টারে লম্বা লাইন। চার দিনের টিকিট বিক্রি হয়ে গিয়েছিল নিমিষেই। কিন্তু কে জানত, সবার এই আগ্রহ এক লহমায় উড়ে যাবে? যে খেলাকে কেন্দ্র করে এতসব আয়োজন, সেই খেলাই শেষ হয়ে গেল মাত্র আড়াই দিনে! ইনিংস ব্যবধানে হার মানল মুমিনুল হকের বাংলাদেশ। দর্শকদের ক্ষোভের মুখে ম্যাচের শেষ দুই দিনের টিকিটের টাকা ফেরতও দিয়েছিলেন আয়োজকরা।

ঐতিহাসিক টেস্ট বাংলাদেশের জন্য হয়ে রইল বিব্রতকর স্মৃতি। ইডেন গার্ডেনসের বদলে যাওয়া পিচে ভারতীয় পেসারদের দুর্ধর্ষ বোলিংয়ের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিলেন মুমিনুলরা। এমনকি বল মাথায় লাগায় দু-দুবার ‘কনকাশন সাব’ নিতে হয়েছিল। অন্যদিকে সেই উইকেটেই দুর্দান্ত সেঞ্চুরি হাঁকান তৎকালীন ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলি। মজার ব্যাপার হলো, সেই সেঞ্চুরির পরবর্তী দুই বছরে আর তিন অঙ্কের দেখা পাননি ভারতের ব্যাটিং কিং! ভারতের মাটিতে সেটাই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বশেষ টেস্ট। ২০১৬ আর ২০১৯ মিলিয়ে ভারতে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটি টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ। হেরেছে সবগুলোতেই। তাছাড়া ভারতের বিপক্ষে দেশের মাটিতেও কোনো টেস্ট জিততে পারেনি। দুই দলের ১৩ বারের দেখায় ১১ বারই ভারত জিতেছে। দুটি টেস্ট বৃষ্টির সৌজন্যে হয়েছে ড্র।

মোটা দাগে এই হলো লাল বলে দুই দেশের মুখোমুখি পরিসংখ্যান। পাঁচ বছর পর ফের ভারত সফরের আগে যা টাইগারদের জন্য মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। কিন্তু গত দুই সপ্তাহে বদলে গেছে পরিস্থিতি। পাকিস্তানের সঙ্গে ১৩ টেস্টে জয়হীন থাকার পর এসেছে সিরিজ জয়ের উপলক্ষ। পূর্ণশক্তির পাকিস্তানকে তাদের মাটিতে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ধবলধোলাই করেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। অবিশ্বাস্য এই অর্জনের পেছনে দুর্দান্ত পেস আক্রমণ, সাকিব-মিরাজের মায়াবী ঘূর্ণি আর লিটন-মুশফিকদের অনবদ্য ব্যাটিং নজর কেড়েছে ক্রিকেট দুনিয়ার। ভারতও বাংলাদেশকে স্বাগত জানিয়েছে পূর্ণশক্তির টেস্ট দল ঘোষণা করে। প্রতিবেশী দেশটির বিপক্ষেও বাংলাদেশ সমান ১৩ টেস্টে জয়হীন। কিন্তু তারকাবহুল ভারতের সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে পাকিস্তান দলটি ছিল নেহায়েতই সাদামাটা। ভারতের এই দলটি দেশ ও দেশের বাইরে সমানতালে পারফর্ম করতে পারে। যেকোনো উইকেটে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তাই সবার আগ্রহ এখন একটা জায়গাতেই- ভারতের মাটিতে কেমন পারফর্ম করবে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকা টিম টাইগার?

পাকিস্তানের সব উইকেটেই সাধারণত পেসারদের জন্য সহায়তা থাকে। এবার রাওয়ালপিন্ডিতে ছিল স্পোর্টিং পিচ। বিপরীতে ভারতের পিচগুলো ভিন্ন ধরনের। এর আগে ভারতের মাটিতে টাইগাররা যে তিনটি টেস্ট খেলেছে, সেগুলোর ভেন্যু ছিল যথাক্রমে- হায়দরাবাদ, ইন্দোর এবং কলকাতা। হায়দরাবাদের পিচ সাধারণত মন্থর হয়ে থাকে। শুরুতে ব্যাটাররা সুবিধা পেলেও পরে বাইশ গজে রাজত্ব করেন স্পিনাররা। ইন্দোর এবং ইডেন গার্ডেনসের পিচ সাধারণত স্পোর্টিং হয়ে থাকে। এবার টাইগাররা খেলবে চেন্নাই এবং কানপুরে। চেন্নাইয়ের পিচ বরাবরই স্পিন সহায়ক। অনেকটা মিরপুরের মতো বললেও ভুল হবে না। কানপুরের উইকেট কিছুটা স্পোর্টিং হলেও স্পিনারদের জন্য সহায়তা থাকে। এ কারণে দুই দলই স্কোয়াড সাজাতে স্পিন আক্রমণে গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশ দলে যেমন সাকিব, মিরাজ, তাইজুল, নাঈমরা আছেন, তেমনই ভারতীয় দলে আছেন অশি^ন, জাদেজা, কুলদীপ, অক্ষরের মতো দুর্দান্ত সব স্পিনার। রাওয়ালপিন্ডিতে দুই টেস্টে বাংলাদেশের পেসাররা নিয়েছিলেন ২১ উইকেট। দুই স্পিনার নিয়েছিলেন ১৫টি। কিন্তু ভারতের মাটিতে এই রণপরিকল্পনা কাজ করবে না। দুই দলকেই স্পিনারদের ওপরই নির্ভরতা বাড়াতে হবে।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের এই স্পিন আক্রমণ ভারতীয় ব্যাটারদের কতটা চাপে ফেলতে পারবে? ভারতের এই ব্যাটিং লাইনআপ নিঃসন্দেহে বিশ্বের অন্যতম সেরা। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের ডানহাতি ব্যাটাররা বাঁহাতি স্পিনারদের বিপক্ষে ভুগেছেন। বিরাট কোহলিই গত তিন বছরে বাঁহাতি স্পিনারদের বলে আউট হয়েছেন ৯ বার। রোহিত শর্মা, শুভমান গিল, লোকেশ রাহুল, সরফরাজ খানদের নিয়ে সাজানো ভারতীয় টপ ও মিডল অর্ডারকে ভোগাতে পারেন সাকিব-তাইজুলরা। আবার মিরাজের মতো অফস্পিনারের বিপক্ষে বাঁহাতিদের আউট হওয়ার প্রবণতাও কম নয়। গত তিন বছরে রবীন্দ্র জাদেজা আউট হয়েছেন ১১ বার, ঋশভ পান্থ ৮ বার। আবার ডানহাতি কোহলিও অফস্পিনারদের বলে আউট হয়েছেন ১১ বার। এসব হিসাব করলে বাংলাদেশের একাদশে তিন স্পিনার না রাখার কোনো কারণ নেই।

তাছাড়া এই টেস্ট সিরিজ খেলা হবে এসজি বলে। দেশে কোকাবুরা বলে খেলে অভ্যস্ত বাংলাদেশি ক্রিকেটারা কালচে-লাল রঙের এসজি বলে অভ্যস্ত নন। এই বলে পেসারদের সুইং পেতে দেরি হয়। দ্রুত বলের উজ্জ্বলতা কমে যাওয়ায় ব্যাটারদের জন্যও হয়ে ওঠে সমস্যার কারণ। এই বলের গ্রিপ ধরা কঠিন, বিশেষত পেসারদের জন্য। তবে স্পিনাররা এসজি বলে বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকেন। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, পাকিস্তান সিরিজের পর সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েই ভারতের মুখোমুখি হতে হবে টাইগারদের। সঙ্গে থাকবে পাকিস্তান সিরিজে পাওয়া আত্মবিশ্বাস। ২৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর পরও দুর্দান্ত জুটিতে ঘুরে দাঁড়ানোর সুখস্মৃতি। ধারণা করা যায়, ভারতে এবার গতবারের ‘কনকাশন’ পরিস্থিতি বদলে দেবে বাংলাদেশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত