বাংলাদেশে শিল্প-কারখানা বন্ধের হিড়িক পড়েছে। যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরের (The Registrar of Joint Stock Companies and Firms) তথ্য অনুযায়ী, মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২৮টি কোম্পানি বন্ধ হয়েছে। শুধু আগস্ট মাসেই রেকর্ড সংখ্যক ৪৬টি কোম্পানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আর সেপ্টেম্বরে বন্ধ হয়েছে ২৬টি কোম্পানি। আবার অক্টোবরে সাভার, টঙ্গী, গাজীপুর, আশুলিয়া, উত্তরা, মিরপুরে বন্ধ হয়েছে যেসব কারখানা, সেগুলোর সঠিক তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
আরজেএসসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই থেকেই কোম্পানি বন্ধের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। সরকারি হিসাবে দেখা যাচ্ছে জুন মাসে ১৬টি বেসরকারি কোম্পানি বন্ধ হয়েছে এবং জুলাইয়ে বন্ধ হয়েছে ২১টি কোম্পানি। সরকারি এই সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে ২৭৫টি কোম্পানি বন্ধ করা হলেও চলতি অর্থবছরের তিন মাসে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে ধারণা করা যায়, চলতি অর্থবছরে কোম্পানি বন্ধের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, আর্থিক সংকটসহ নানা কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে সিটি গ্রুপ, বিএসআরএম, ইউএস-বাংলাসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গ্রুপের দেড় শতাধিক কোম্পানি তাদের ব্যবসা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিছু বিদেশি কোম্পানিও নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে শুধু কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে তাই নয় আমদানি বিকল্প এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পণ্য উৎপাদন না হলে ওইসব পণ্য বাইরের দেশ থেকে আমদানি করতে হবে অথবা নতুন কোম্পানি এসব শিল্পে আসতে হবে।
চলতি অর্থবছরে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার জিডিপির (দেশজ উৎপাদন) হার নির্ধারণ করেছিল ৬.৮ শতাংশ, যা অর্থনীতিবিদরা নাকচ করে দিয়েছেন। এদিকে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছিল, বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি আগের অবস্থায় ফেরার আগে ২০২৪ অর্থবছরে কমে ৫.৬ শতাংশে দাঁড়াবে এবং স্বল্পমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী থাকবে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলেছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। আর সার্বিক মূল্যস্ফীতি হবে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
কেন আমদানি বিকল্প শিল্পায়ন?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গরিব রাষ্ট্রগুলো শিল্পায়নের পদক্ষেপ যথাসময়ে নিতে পারেনি। কারণ তাদের কাছে উন্নত দেশে তৈরি হওয়া মেশিনপত্র ও কাঁচামাল কেনার অর্থ ছিল না। এদিকে তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য দিত না উন্নত দেশগুলো। এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে তারা আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদন তথা এ ধরনের শিল্পায়নে মনোনিবেশ করে। এতে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমে এবং দেশীয় বাজারে প্রয়োজনীয় সামগ্রী স্বল্প দামে সহজলভ্য হয়। ফলে মূলত কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদনের বিকাশ ঘটে তুলনামূলকভাবে বেশি। সেই সঙ্গে একটি সমস্যাও দেখা দেয়। যারা অকৃষিভিত্তিক শিল্পে মনোযোগ দিয়েছিল, তাদের কৃষি খাত কিছুটা পিছিয়ে পড়ে।
আমদানি বিকল্প শিল্পায়নের সুবিধা, অসুবিধা
আমদানি বিকল্প শিল্পায়নের একটি প্রধান সুবিধা হলো এটি দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। স্থানীয়ভাবে পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলো আমদানির ওপর তাদের নির্ভরতা কমিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বাড়াতে পারে। এটি তাদের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং তাদের বাণিজ্যিক লেনদেনের ভারসাম্য ভালো অবস্থানে রাখতে সহায়তা করে। উপরন্তু আমদানি বিকল্প শিল্প দেশের সদ্যোজাত (নতুন) শিল্পকে বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা দিয়েছিল।
অসুবিধা : আমদানি বিকল্প শিল্পায়নের প্রধান অসুবিধাগুলোর মধ্যে একটি হলো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অভাবের কারণে এসব খাত অদক্ষতা এবং নিম্নমানের পণ্য উৎপাদন উৎসাহিত করতে পারে। ভারত একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তাদের অনেক পণ্য দুই দশক আগ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মান থেকে অনেক পেছনে ছিল। আমদানি বিকল্প শিল্পের কারণে ভোক্তাদের জন্য উচ্চমূল্য এবং দেশীয় শিল্পে উদ্ভাবনের অভাব দেখা দিতে পারে। উপরন্তু এই ব্যবস্থা বিদেশি বিনিয়োগকে অনুৎসাহিত করতে পারে, কারণ বিনিয়োগকারীরা সুরক্ষাবাদী (Protectionism) নীতির দ্বারা নিরুৎসাহিত হতে পারে। এটি মূলধনের ঘাটতি এবং অভাব তৈরি করতে পারে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির । অনেক উন্নয়নশীল দেশ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমদানি বিকল্প শিল্পায়ন (SI) এবং রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন (EOI) কৌশলের যূথবদ্ধ ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ সময়ের ব্যবধানে এই কৌশলগুলোর আপেক্ষিক গুরুত্ব পরিবর্তিত হয়েছে।
আমদানি বিকল্প শিল্পায়ন এখনো প্রাসঙ্গিক
আমদানি বিকল্প শিল্পায়ন আজও প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য যারা আমদানির ওপর তাদের নির্ভরতা কমাতে এবং দেশীয় উৎপাদনকে এগিয়ে নিতে চায়। যা হোক, এটি খেয়াল রাখা জরুরি যে, এই নীতির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সব দেশের জন্য বিশেষত যাদের বাজার ছোট, তাদের জন্য আমদানি বিকল্প নীতি উপযুক্ত নাও হতে পারে। কেননা ছোট বাজারের দেশগুলোতে অর্থনীতি প্রসারণশীল (Scale of Economy) হয় না। অর্থাৎ দিনে দিনে কোন শিল্প যা দক্ষ হয়ে উঠেছে, তার প্রসার হওয়াটাই স্বাভাবিক, যেমন বাংলাদেশের গৃহনির্মাণ সামগ্রী শিল্প। কিন্তু ছোট বাজারের জন্য আমদানি বিকল্প শিল্পনীতি যথার্থভাবে কাজ করে না। উপরন্তু যখন কোনো দেশ রপ্তানিমুখী হয়ে ওঠে তাদের জন্য আমদানি বিকল্প শিল্পনীতি বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে, কারণ এতে তাদের রপ্তানি পণ্য কম প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে। আমদানি বিকল্প শিল্পে দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ভালো করেছে। কিন্তু ভারত সুবিধা করতে না পেরে এখন রপ্তানিমুখী শিল্পের দিকে মনোনিবেশ করেছে। তবে ধীরে ধীরে অনেক দেশই আমদানি বিকল্প শিল্প থেকে রপ্তানিমুখী শিল্পে মনোযোগ দিচ্ছে। এখানে তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্ব বা Comparative Advantage Theory আমদানি বিকল্প মতবাদকে পেছনে ফেলে দিয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া, বহুজাতিক কোম্পানিকে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া ইত্যাদি পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা বাড়ানো হয়েছে। এতে করে ছোট ও গরিব অনেক রাষ্ট্র সুবিধা করতে পারছে না। এ বিষয়ে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তারাও কোনো সমাধান দিতে পারছেন ন।
দেশে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কমেনি
বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কমেনি, বরং জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব পণ্যের চাহিদাও বেড়ে চলেছে। গত বছরের একটি বাংলা দৈনিকের রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ২৫ মিলিয়ন টন সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়, যা দেশেই উৎপাদিত হয়। সিমেন্ট উৎপাদনে দেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও (ভারত, মিয়ানমার) এখন সিমেন্ট রপ্তানি হচ্ছে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশে জনপ্রতি সিমেন্টের ব্যবহার ছিল মাত্র ৬৫ কিলোগ্রাম। বিশেষত পার্শ্ববর্তী ভারত (১৫০ কিলোগ্রাম), ইন্দোনেশিয়া (১২৭ কিলোগ্রাম), মালয়েশিয়া (৫২৯ কিলোগ্রাম) এবং থাইল্যান্ডের (৪২৫ কিলোগ্রাম) তুলনায় এ পরিমাণ খুবই কম। এক সময়ে দেশের বাজারে বিদেশি সিমেন্টের রাজত্ব থাকলেও সেটি এখন পুরোপুরিই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে। ক্রমেই তার পরিসর বাড়ছে। বলা চলে, সিমেন্টের বাজার এখন প্রায় পুরোপুরিই দখলে রেখেছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। একইভাবে বলা যায়, রড, ঢেউটিন ও অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীর পাশাপাশি কৃষি যন্ত্রপাতি, সার ও বীজের চাহিদাও বাড়ছে। সেই সঙ্গে খাবার তেল, দুধ, ডিম, মাংস ইত্যাদিরও চাহিদা বাড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটে দেশের অন্যতম বড় ভোগ্যপণ্য ও নির্মাণ সামগ্রী কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা কি অর্থনীতির নিয়ম মেনে করা হচ্ছে?
কোম্পানি বন্ধের অর্থনৈতিক নিয়মটি কী?
একটি কোম্পানি বন্ধ হওয়ার আগে টিকে থাকার জন্য নানাবিধ উদ্যোগ নেয়। দেশের অর্থনীতি এতটাই খারাপ যদি হয়, একজন মানুষ যে পরিমাণ পণ্য কিনছে, তাতে ওই কোম্পানির চলতি খরচ (শ্রমিকের মজুরি ও কাঁচামালের দাম) উঠছে না তবেই কোম্পানিটি বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্তে আসতে পারে। তার আগে, লোকবল ছাঁটাই, বাড়তি খরচ কমিয়ে দেওয়া এবং প্রয়োজনে উৎপাদন কিছুটা কমিয়ে কোম্পানিটি টিকে থাকতে চায়। কিন্তু বন্ধ হওয়া কোম্পানির ক্ষেত্রে কী হলো? মনে রাখতে হবে, বাজারের আকারের হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লোকসংখ্যা ৩৪.৬০ কোটির ওপর। সেই হিসাবে বাংলাদেশের বাজারের আকার ঠিক তার অর্ধেক। ফলে বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্য, হোম ডেকর, গৃহনির্মাণ বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিলাসী পণ্যের বাজার নিতান্তই ছোট নয়। বন্ধ পথযাত্রী কোম্পানিগুলো নিয়ে অনেক বিশ্লেষক বলছেন, মূল্যস্ফীতির চাপে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিক্রি কমে যাওয়া, সুদের উচ্চহার, শ্রম অসন্তোষ, পরিবহন ও কারিগরি সমস্যা, ডলার সংকটে কাঁচামালের ঘাটতি, বৈশি^ক যুদ্ধ ও আকস্মিক বন্যার বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের। পাশাপাশি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে কিছু কোম্পানির ব্যবসা করার সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে। তবে আমদানি বিকল্প শিল্পে দুর্নীতি করার সুযোগ তৈরি হয়। কেননা, এগুলো Perfect Competition-এর পরিবেশে কাজ করে না। ফলে কয়েকটি কোম্পানি মিলে একটি অলিগার্কি বা গোষ্ঠীবদ্ধ সত্তা তৈরি করে। তাতে করে তারা বাজারে সরবরাহ কমিয়ে কোনো পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে পণ্য বিক্রয় করে। বাংলাদেশে সয়াবিন তেল ও অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে এই ঘটনাটি প্রায়ই দেখা গেছে। এমনকি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জ্বালানি তেল বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও এই প্রবৃত্তি দেখেছি আমরা। দ্বিতীয়ত, এই আমদানি বিকল্প শিল্প সরকারের কাছ থেকে দেশি শিল্প রক্ষার নামে কিছু সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নেয়, যা বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতাকে ব্যাহত করে।
আইনি প্রক্রিয়া : বাংলাদেশের কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ অনুযায়ী তিনটি কারণে কোম্পানি বন্ধ হতে পারে (ক) আদালত কর্র্তৃক, (খ) স্বেচ্ছাকৃতভাবে অথবা, (গ) আদালতের তত্ত্বাবধান সাপেক্ষে। এ সময় একজন অবসায়ক নিয়োগ দিতে হয়, যার দায়িত্ব একটি কোম্পানির সম্পত্তিতে যার যার অধিকার আছে সেগুলো যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেওয়া এবং শ্রমিকদের যাবতীয় পাওনা মিটিয়ে দিয়ে কোম্পানি বন্ধ করা। অনেকে বলছেন, এসব কোম্পানির মধ্যে অনেকে নানাবিধ দুর্নীতি করেছে। এখন তাদের ব্যবসা না করলেও চলবে। তারা এখন অন্য কোনো দেশে বা বংলাদেশে বসেই সুখের জীবনযাপন করতে পারবে। কিন্তু ক্ষতি হবে সাধারণ শ্রমিক, দেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের কোষাগারের।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
