গ্রামীণ অর্থনীতির স্তরগুলোর মধ্যে প্রতিটিরই কমবেশি ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, গৃহভিত্তিক উৎপাদন এবং অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার। এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের প্রেক্ষাপটও সৃষ্টি হচ্ছে। গ্রামীণ জনপদে অর্থনৈতিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি গ্রামীণ নারী। দীর্ঘদিন ধরে তাদের শ্রম, দক্ষতা ও অবদানকে পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়েছে, ফলে জাতীয় অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক হিসেবে তাদের বড় একটি অংশ অদৃশ্য থেকে গেছে। অথচ বাস্তবতা হলো, গ্রামীণ নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি কিংবা দারিদ্র্য হ্রাস কোনোটিই কল্পনা করা যায় না। তারা শুধু পরিবারের সদস্য নন, বরং উৎপাদন-সঞ্চয়-সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক উন্নয়নের নীরব স্থপতি। এই স্থপতিদের মূল্যায়নের বাইরে রেখে অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুরুষদের শহরমুখী কর্মসংস্থান ও বিদেশ গমনের ফলে অনেক এলাকায় কৃষির দায়িত্বও এখন নারীদের কাঁধে এসে পড়েছে বহু ক্ষেত্রেই। ফলে কৃষি উৎপাদনে নারীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। গ্রামীণ নারীদের কর্মপরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তারা গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি কৃষিজমিতে বীজতলা তৈরি, চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সেচে সহায়তা, ফসল সংগ্রহ শুকানো, সংরক্ষণ এবং বীজ সংরক্ষণের মতো নানা কাজে যুক্ত থাকেন। এ ছাড়া গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি পালন, মাছ চাষ, দুধ উৎপাদন, গোখাদ্য প্রস্তুত, জৈব সার তৈরি এবং ফল-সবজি চাষেও তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব কাজের বড় অংশ বিনা পারিশ্রমিকে সম্পন্ন হয় বলে জাতীয় আয় নির্ধারণে প্রকৃতপক্ষে তা প্রতিফলিত হয় না।
খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গ্রামীণ নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। অধিকাংশ গ্রামের বাড়ির উঠানে সবজি চাষ, মসলা উৎপাদন, ফলের গাছ পরিচর্যা এবং গবাদিপশু পালন নারীরাই পরিচালনা করেন। এর ফলে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করা সম্ভব হয়। বর্তমানে অনেক নারী জৈব সবজি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছেন, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি, আত্মকর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন। গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা এবং অন্যান্য বেসকারি উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায় অনেক নারী ক্ষুদ্র পুঁজি নিয়ে সেলাই, হস্তশিল্প, নকশিকাঁথা, মসলা গুঁড়া, আচার, বেকারি, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণ, দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা করছেন। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেও অনেক নারী গ্রামে উৎপাদিত পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছেন তো বটেই, রপ্তানিকারকদেরও অনেকে তাদের উৎপাদিত পণ্য তাদের রপ্তানি তালিকায় রাখছেন। এই ডিজিটাল জমানায় প্রযুক্তির ব্যবহার তাদের বাজার সম্প্রসারণ এবং আয় বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
নারীর আয় শুধু ব্যক্তিগত স্বাবলম্বীই বাড়ায় না, বরং পরিবারের সামগ্রিক কল্যাণেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, নারীর উপার্জিত অর্থের বড় অংশ সন্তানদের শিক্ষা, পুষ্টিকর খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয়ে ব্যবহার করা হয়। ফলে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন সরাসরি মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রাখে। এ কারণেই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রেও নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে গ্রামীণ নারীদের কর্ম ও জীবনযাপনের পথ এখনো আশানুরূপ মসৃণ নয়। অধিকাংশ নারী ভূমির মালিকানা থেকে বঞ্চিত। কৃষিকাজে সমান অবদান রাখলেও জমির মালিক হিসেবে তাদের স্বীকৃতি সীমিত। ফলে কৃষিঋণ, সরকারি ভর্তুকি, উন্নত প্রযুক্তি, কৃষি উপকরণ কিংবা প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ থেকেও তারা অনেক সময় পিছিয়ে থাকেন। একই সঙ্গে সামাজিক রক্ষণশীলতা, লিঙ্গবৈষম্য, অল্প বয়সে বিয়ে, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাব তাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলাতেও গ্রামীণ নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় কিংবা খরার সময় সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে পরিবারকে টিকিয়ে রাখা, খাদ্য সংরক্ষণ, বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি এবং গবাদিপশু রক্ষায় তারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। অনেক এলাকায় নারীরা ভাসমান কৃষি, ছাদবাগান, খরা সহনশীল ফসল চাষ এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াচ্ছেন। সরকার ও গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের আত্মকর্মসংস্থান প্রকল্প, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, এসএমই ফাউন্ডেশনের নারী উদ্যোক্তা সহায়তা, বিভিন্ন ব্যাংকের স্বল্পসুদে ঋণ এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসার নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি ব্র্যাক, আশা, কারিতাস, ওয়ার্ল্ড ভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ, বাজার সংযোগ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অবদান কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিক পরিবর্তনেরও শক্তিশালী ভিত্তি। একজন শিক্ষিত, দক্ষ ও স্বাবলম্বী নারী পরিবারের শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নারীর ক্ষমতায়ন পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে, শিশুবিবাহ ও দারিদ্র্য কমাতে সহায়তা করে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। আমরা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এই অগ্রযাত্রার পথ আরও মসৃণ ও টেকসই করতে হলে গ্রামীণ নারীদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন, সমান মজুরি, ভূমির অধিকার, সহজ ঋণপ্রাপ্তি, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয়।
গ্রামীণ নারীরা বাংলাদেশের অর্থনীতির নীরব শক্তি, এই বাস্তবতা এড়ানোর অবকাশ নেই। তাদের অবদান অনেক সময় পরিসংখ্যানে দৃশ্যমান না হলেও দেশের খাদ্য উৎপাদন, দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিটি অর্জনের সঙ্গে তাদের শ্রম ও মেধা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হবে সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। তাদের অভিযোজন ক্ষমতা টেকসই উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর ভূমিকা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকও। তারা সন্তানদের শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একটি শিক্ষিত ও সচেতন নারী পুরো পরিবারকে আলোকিত করতে পারেন। ফলে নারীর উন্নয়ন মানে একটি প্রজন্মের উন্নয়ন, একটি সমাজের উন্নয়ন। আজকের বাংলাদেশে গ্রামীণ নারীরা আর কেবল গৃহকোণে সীমাবদ্ধ নন। তারা কৃষক, উদ্যোক্তা, সংগঠক এবং উন্নয়নের অংশীদার। তাদের শ্রম ও মেধার স্বীকৃতি প্রদান, সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং নীতিনির্ধারণে তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি। কারণ গ্রামীণ অর্থনীতির প্রকৃত অগ্রগতি তখনই সম্ভব হবে, যখন নারীর অবদানকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হবে। গ্রামীণ নারীরা আমাদের অর্থনীতির নীরব শক্তি, যাদের অবদান অনেক সময় দৃশ্যমান না হলেও উন্নয়নের প্রতিটি অর্জনের পেছনে তাদের শ্রম ও ত্যাগ জড়িয়ে আছে। তাদের অর্জন যাতে আরও স্ফীত সেই লক্ষ্যে রাষ্ট্র শক্তিকেই শুধু নয়, সামাজিক শক্তিগুলোকেও যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে। উদার সামাজিক ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা চাই।
একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে হলে গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা নারীর অগ্রযাত্রাই গ্রামীণ অর্থনীতির অগ্রযাত্রা, আর গ্রামীণ অর্থনীতির অগ্রযাত্রাই বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ভিত্তি। গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে যে সহায়তা দিচ্ছে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এর পরিসর বাড়ানো দরকার জাতীয় স্বার্থ ও প্রয়োজনেই। মনে রাখতে হবে, কৃষি খাতের মোট শ্রমদানকারীর প্রায় ৫৭ শতাংশ এবং
কৃষিকাজের ২১টি ধাপের ১৭টিতেই গ্রামীণ নারীরা সরাসরি যুক্ত। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে তাদের সহজ শর্তে কৃষিঋণ, আধুনিক প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। তাদের জন্য সহায়তামূলক আরও পরিকল্পিত কর্মসূচি প্রণয়ন-বাস্তবায়ন জরুরি। একটা কথা আছে, শিকড় যদি ভালোভাবে মাটি আঁকড়ে থাকতে না পারে তাহলে তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি দেশকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছাতে হলে তার শিকড় শক্ত করা বাঞ্ছনীয়। আমাদের শেকড় হলো গ্রামবাংলা। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও কার্যক্রম। এই কার্যক্রম আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে করতে হবে আরও অনেক কিছু।
লেখক : চেয়ারম্যান, প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র
writerrokeya@gmail. com