চরমপন্থা-উগ্রবাদ মোকাবিলা

দায় কারোরই কম নয়

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ১২:৩০ এএম

১৯ জুলাই দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা মেহেরপুরে একের পর এক হুমকিসংবলিত চিরকুট ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার, মুজিবনগরে অপহরণ এবং পুলিশের ওপর ককটেল হামলার ঘটনাগুলো ঘিরে পুরনো চরমপন্থি নেটওয়ার্ক নিয়ে আবার নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন বলে দাবি করছে। তবে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে এই নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। আমাদের স্মরণে আসে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘ নীরবতার পর দেয়ালে দেয়ালে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির পোস্টার সাঁটানোর বার্তা সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছিল এ বছরের মার্চ মাসে।

আমরা জানি, এক সময় দেশের চরমপন্থি রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল সীমান্ত জেলা মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রক্তাক্ত অনেক ঘটনার পর চরমপন্থিদের একটা বড় অংশ আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রত্যয়ে। যারা আত্মসমর্পণ করেনি তারা গা-ঢাকা দেয় এবং টানা বেশ কয়েক বছর তাদের কার্যক্রম চোখে পড়েনি। অতীতে স্থানীয় কোনো কোনো রাজনীতিক নিজেদের স্বার্থে বিশেষ করে নির্বাচনের সময় চরমপন্থিদের ব্যবহার করেছেন এই অভিযোগও উঠেছিল। এ ধরনের তৎপরতা কয়েকটি বিষয়ে সতর্কতার  ইঙ্গিত করে। কোনো কোনো নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, সংগঠনের মূল কাঠামো না থাকলেও বিচ্ছিন্ন কিছু পুরনো সদস্য বা সমর্থক নিজেদের উদ্যোগে এ ধরনের প্রচারণা চালাতে পারে। আবার তাও হতে পারে, এটি বিভ্রান্তিমূলক আচরণ বা কর্মকাণ্ড, যেখানে অন্য কোনো পক্ষ পুরনো নাম ব্যবহার করে ভীতি তৈরি করতে চাইছে। তবে এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উদাসীন থাকার অবকাশ নেই বলে আমরা মনে করি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের (বাজেট অধিবেশন) সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার কোনোভাবেই কোনো ধরনের চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না।’ এ ক্ষেত্রে সরকার বিরোধী দলের পূর্ণ সহযোগিতা পাবে বলে তিনি বিশ^াস করেন। এও তিনি বলেন আমরা জানি, আমাদের দেশের রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব ও বিরোধ সমান্তরালে চলে এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও অনেক ক্ষেত্রেই অনৈক্য দৃশ্যমান হয়। এমতাবস্থায়  প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য তর্কাতীতভাবে সাধুবাদযোগ্য। ‘দৃঢ়ভাবে আমরা প্রত্যেকে বিশ^াস করি, সেই বাংলাদেশ যে বাংলাদেশে চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদের কোনো রকম ঠাঁই হবে না। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে কেউ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করবে না’ প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যও সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। দেশে ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। আমরা মনে করি, তার এই উপলব্ধিও যথার্থ। চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদ মোকাবিলার জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্যের বিকল্প নেই।

দেশে উগ্রবাদের উপসর্গ পুরনো এবং একই সঙ্গে এও সত্য, উগ্রবাদ শুধু ধর্মীয় পরিচয়েই নয়; রাজনৈতিক মতাদর্শেও তা নেহায়েত কম ক্ষয় ঘটায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এর উদ্বেগজনক বিস্তারের অধ্যায়ও আমরা বিস্মৃত হইনি। সামাজিক-রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের উত্থান, বিদ্বেষমূলক রাজনৈতিক কর্মকা--বক্তব্য কিংবা ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের  হীনপ্রবণতা উগ্রপন্থার জন্য উর্বর ভূমি তৈরি করে। যেকোনো ধরনের উগ্র কিংবা চরমপন্থার পথ রুদ্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সজাগ-সতর্ক থাকার পাশাপাশি জোর দিতে রাজনৈতিক ঐক্যর ওপর। নিশ্চিত করতে হবে সামাজিক স্থিতিশীলতা। বাড়াতে হবে গোয়েন্দা নজরদারি। একই সঙ্গে আমলে রাখতে হবে বৈরী পরিস্থিতি নিরসনে কিংবা মোকাবিলা করতে গিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় কেউ যাতে অহেতুক হয়রানির শিকার না হন।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের ফার্স্ট লেডি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কূটনীতিক এলেনর রুজভেল্ট যথার্থই বলেছেন, ‘শান্তির কথা বলাই যথেষ্ট নয়, এতে বিশ^াস করতে হবে। কেবল বিশ^াস করাই যথেষ্ট নয়, এর জন্য কাজও করতে হবে।’ উগ্রবাদ ও সামাজিক স্থিতিশীলতা পরস্পরের পরিপন্থী। উগ্রবাদ সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় আর স্থিতিশীলতা বজায় রাখে শান্তি ও সুবিচার। আমরা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় আশ^স্ত হওয়ার পাশাপাশি তার আহ্বানের প্রতি রাজনৈতিক মহলের কার্যকর দৃষ্টি আশা করি। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নির্মূল হোক চরমপন্থা-উগ্রবাদের ব্যাধি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত