সংকট উত্তরণের উপায়

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ১২:৩০ এএম

দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গভীর ও বহুমুখী সংকটের মধ্যে। একদিকে শিক্ষার্থী সংখ্যা ও উচ্চশিক্ষার পরিসর বাড়ছে, অন্যদিকে শিক্ষার প্রকৃত গুণগত বিশেষত কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ বা ভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনা করলে শিক্ষার মান নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান, গবেষণার অপ্রতুলতা, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব, সেশনজট, রাজনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব এবং কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে পাঠ্যক্রমের ক্রমবর্ধমান অসামঞ্জস্যতায় বিষয়গুলো, উচ্চশিক্ষার ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আমাদের দেশের জন্য উচ্চশিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং এটি হওয়া উচিত দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রধান ক্ষেত্র। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলছে।

কর্মবাজার ও পাঠ্যক্রমের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা উচ্চশিক্ষার মান নিম্নমুখী হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। বিদ্যমান পাঠ্যক্রম ও কর্মবাজারের সংযোগ নেই বললেই চলে। কিছু কিছু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে এগিয়ে এলেও, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলা শ্রেয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট তৈরি হলেও, বড় একটি অংশই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কারিকুলাম যথাযথ না হওয়ার শিল্পের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তারা প্রায়ই অভিযোগ করেন, চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে কারিগরি দক্ষতা ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার অভাব। এই চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়, যখন পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যেখানে দেশীয় প্রকৌশলীর ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে সহযোগীর পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। একইভাবে, বাংলাদেশের রপ্তানমুখী পোশাকশিল্পসহ অন্যান্য সেক্টরেও উচ্চপদে প্রতিবেশী দেশের জনবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।  কারণ গ্র্যাজুয়েটরা বিষয়ভিত্তিক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন না। পাঠ্যক্রম যদি শুধু তাত্ত্বিক এবং মুখস্থ নির্ভর হয়, তবে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে বাধ্য।

উচ্চশিক্ষার প্রাণ, গবেষণা ও নতুন জ্ঞান উৎপাদন। কিন্তু দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত সরকারি বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল এবং শিক্ষা খাতে জিডিপির বরাদ্দ পাসের দেশগুলোর তুলনায় নগণ্য। গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো,  বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে কাক্সিক্ষত অবস্থানে পৌঁছাতে না পারার অন্যতম কারণ। উচ্চমানের গবেষণার জন্য, প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের জন্য যে ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন, তা অপ্রতুল। গবেষণার মানোন্নয়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে শিক্ষকদের গবেষণা ও পিএইচডি থিসিসগুলো কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে রাখা জরুরি। যাতে চৌর্যবৃত্তি রোধ করা যায়। শিক্ষক সংকট ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শিক্ষক। অথচ শিক্ষকতা পেশা মেধাবীদের কাছে ক্রমে অনাকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। মূলত অযৌক্তিক বেতন কাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধার অভাব। তার চেয়েও বড় সমস্যা, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও মেধার পরিবর্তে রাজনৈতিক ভাবাদর্শগত পরিচয় বা অনৈতিক লেনদেন নিয়োগের ক্ষেত্র যখন মুখ্য হয়। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে প্রথিতযশা শিক্ষাবিদদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করার জন্য পৃথক বেতন কাঠামো ও গবেষণা ভাতার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সেশনজট ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য ভয়াবহ অভিশাপ। এটি শুধু শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে মূল্যবান সময় কেড়ে নেয় না, বরং প্রচ- হতাশা তৈরি করে। সেশনজট নিরসনে একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ, দ্রুত ফলাফল প্রকাশ এবং পরীক্ষা পদ্ধতির আধুনিকায়ন জরুরি। প্রযুক্তিনির্ভর বা অটোমেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করলে, সেশনজট অনেকটা কমানো সম্ভব। সুশাসন ও উচ্চশিক্ষা কমিশন বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সীমাবদ্ধতা এবং উচ্চশিক্ষায় সুশাসন নিশ্চিত করতে, ২০২৬ সাল নাগাদ ‘বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই কমিশন কেবল আর্থিক বরাদ্দ বণ্টনকারী সংস্থা হিসেবে নয়, বরং শিক্ষার মানদ- নির্ধারক এবং অনিয়ম তদন্তকারী শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এখন প্রয়োজন প্রস্তাবিত খসড়ার বাস্তবায়ন। সরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে প্রশাসনিক সংস্কার পরিচালনা করা এই কমিশনের বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে, একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিকল্প নেই। শিক্ষার মান কেবল ডিগ্রির ওপর নির্ভর করে না। বরং শিক্ষার্থীর নৈতিক ও মানবিক গুণাবলির বিকাশও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা অর্থ ও ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যা সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। উচ্চশিক্ষায় এমন পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন যা শিক্ষার্থীর মধ্যে সহানুভূতি, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি করবে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু চাকরি পাওয়ার প্রস্তুতির জায়গা নয়, বরং এটি হওয়া উচিত মানুষ গড়ার কেন্দ্র।

বর্তমান সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে উত্তরণে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। এর জন্য কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে :

১. চাহিদাভিত্তিক কারিকুলাম : শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সরাসরি সম্পৃক্ত করে পাঠ্যক্রম যুগোপযোগী করতে হবে এবং বিষয়ভিত্তিক ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ২. বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা : কেবল স্নাতক ডিগ্রির ওপর গুরুত্ব না দিয়ে স্বল্পমেয়াদি সার্টিফিকেট কোর্স ও কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে বেকারত্ব নিরসনে উদ্যোগ নিতে হবে। নৈতিকভাবে আলোকিত মানুষ তৈরির সহায়ক পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করতে হবে। ৩. গবেষণায় বিনিয়োগ : জিডিপির অন্তত একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গবেষণা ও উদ্ভাবনে বরাদ্দ দিতে হবে। ৪. নিয়োগে স্বচ্ছতা : শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মেধাবীদের এই পেশায় ফিরিয়ে আনতে হবে। ৫. সমন্বিত উদ্যোগ : সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্য দূর করে একটি অভিন্ন জাতীয় শিক্ষা মানদ- তৈরি করতে হবে। উচ্চশিক্ষার সংকট একক কারণে তৈরি নয়। ফলে সমাধান হতে হবে সমন্বিত।

লেখক :  উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত