হরেক ফেরে নির্বাচনী ফিকশন

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৫, ০৩:২২ এএম

নির্বাচন সামনে রেখে দেশে নতুন করে ষড়যন্ত্র দেখছে বিএনপি। কোনো রাখঢাক না রেখে সোজাসাপ্টা এ অভিযোগ করেছেন, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন ব্যাখ্যাসহ। তার ভাষায়- ‘অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা নির্বাচিত সরকারের হাতে তুলে দেওয়া। এর বাইরে আর কোনো দায়িত্ব নেই। আর যে সংস্কারের গল্প করা হচ্ছে, সেগুলো হবে আগামী সংসদে। অর্থাৎ নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা যত সংস্কার প্রয়োজন তা করবে।’

বিএনপির সমমনার বাইরে কিছু দলের কথার ঝাঁজও এমন। সিপিবি থেকে বলা হয়েছে, ‘অরাজনৈতিক শক্তি যাতে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে না পারে, সে জন্য দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে। ১৫ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন, সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স। শেখ হাসিনা হটাও আন্দোলনের অন্যতম শক্তি জামায়াতে ইসলামীর দাবি এত জোরালো নয়। অনেকটা কোমল-কুসুম। তারা নির্বাচন চায় ধীরে-সুস্থে। কিন্তু, বিগত আন্দোলনের ফ্রন্টলাইনার বা ভ্যানগার্ড বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বড় কড়া। শেখ হাসিনাসহ ফ্যাসিস্টদের বিচারের আগে তারা নির্বাচনে নারাজ। বিচারের আগে যারা নির্বাচন চাইবে, তাদের জাতীয় বেইমান বলে আখ্যা দিয়েছেন তারা। গোলমালটা এখানেই। কারও কাছে এটি চাতুরী, কারও কাছে মতবিরোধ। আবার কারও কাছে ষড়যন্ত্র। এর মধ্যে ভর করেছে জুলাই আন্দোলনের ঘোষণাপত্র। মার্চ ফর ইউনিটির সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতাদের মুখ থেকে যেসব শব্দ-বাক্য এসেছে, যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখানো হয়েছে তা বিএনপিসহ দ্রুত নির্বাচনে আগ্রহীদের কষ্ট দিয়েছে। নির্বাচন নিয়ে আরেক ফের আনুপাতিক আসন নিয়ে। সিপিবি, গণসংহতি আন্দোলন, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলনসহ কিছু ‘অণুদল’ আশা করে, আনুপাতিক আসন ভাগাভাগি। এর ফের সবচেয়ে বেশি বোঝে বিএনপি। ‘অণুদের’ উদ্দেশ্য তারা ভালো মতো জানে-বোঝে। এসব দলের কারও কারও সারা দেশে দুয়েকটা আসন পাওয়ারও অবস্থা নেই। জনগণের কিছু হোক বা না হোক এলাকা থাকুক না থাকুক ঢাকায় বসে এসব দলের নেতারা বিশাল ব্যাপার। নির্বাচন বা ভোটের আসন প্রশ্নে বিএনপির কর্মীদের কাছেও তারা এক একটা ডিস্টার্ব। এত ফেরের মধ্যে ষড়যন্ত্র না হলেও গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য অনেকটা আর্টিফিশিয়াল হয়ে গেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের বিএনপির বিরুদ্ধে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বিশ্লেষণ আছে। তারা বিএনপির ১৬-১৭ বছরের যন্ত্রণা-লড়াই অস্বীকার করছে। উপরন্তু বিএনপির হাট দখল বাজার দখলের অভিযোগ সামনে আনছে।

ফেরের ওপর ফেরের মতো বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের মধ্যেও এখন কয়েক ভাগ। গণঅধিকার পরিষদের সঙ্গেও সংঘাত। মার খাওয়া ব্যক্তি বলেছেন, ছাত্রদল মেরেছে। তার নেতা বলেছেন, ছাত্রদল না বিপ্লবী পরিষদ মেরেছে। আবার বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক বলেছেন, ‘আমরা নই সার্জিস আলমের ক্যাডাররা মেরেছে।’ কষ্টের মধ্যেও ফের। কার হাতে মার খাওয়া, তা নির্ধারণ নিয়েও গোলমাল। হাস্যকর করে ফেলা হচ্ছে বিষয়টি। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে ছাত্রদের ভূমিকাকে খাটো করে দেখা অন্যায়। পেছন থেকে সমর্থন ও রাস্তা বাতলানো অন্যদের অবদানকেও অগ্রাহ্য করা ঠিক নয়। এই আন্দোলন নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তখন কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। তবে ছাত্ররা বিজয়ী হতে পারবেন কি না তা নিয়ে অনেকেই দোটানায় ছিলেন। কারণ ফ্যাসিস্ট পতনের আন্দোলন অতীতে বারবার রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যর্থ হতে দেখেছেন জনগণ। তারপরও ডু অর ডাই’তে ছাত্রদের দেওয়া আন্দোলনের কর্মসূচিতে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছে। কোটা আন্দোলন, সড়কে যানবাহন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আন্দোলন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে করবৃদ্ধির আদেশ বাতিলের আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রদের বিজয়ী হতে দেখেছেন জনগণ।  ছাত্রদের ওপর তাই আস্থা ছিল সাধারণ মানুষের। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল যখন গণতন্ত্র রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে পড়ে তখন জুলাই-আগস্টে ছাত্রদের নেতৃত্বে বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের পতন হয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ উন্মুক্ত হয়। এখন নির্বাচন সামনে রেখে গত আন্দোলন বা বিপ্লবের শরিকানা নিয়ে অতিকথন হচ্ছে। অতিকথনে কু-কথনও চলে আসছে। আর নির্বাচনের ধরন নিয়েও কথার খই ফুটছে। যার কোনো কোনোটি ঐক্যের গায়ে বিঁধছে। আরেক ফের চলছে ১৭ বছর বয়সীদের ভোটার করা নিয়ে। তাদের ভোটার করার অভিপ্রায়টি এসেছে স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টার কাছ থেকে। তার এ অভিপ্রায়ের একটি তাৎপর্য অবশ্যই রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ প্রস্তাব করেছেন একটি অনুষ্ঠানে। তিনি তরুণদের ভোটার করার পক্ষে। অনুষ্ঠানটিতে আশা করেছিলেন, নির্বাচন কমিশন নিশ্চয়ই এ রকম একটা বয়স সুপারিশ করবে। নির্বাচন কমিশন মনে করছে, এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঐকমত্যের দরকার আছে। মানে নির্বাচন কমিশন বিষয়টি ছেড়ে দিতে চায় রাজনৈতিক ঐকমত্যের ওপর।  

ভোটার হওয়ার ন্যূনতম বয়স ১৭ করার মধ্যে আইনি বিষয় রয়েছে। রয়েছে রাজনৈতিক সমীকরণসহ নানা তাৎপর্যও। বিদ্যমান শিশু আইনে ‘অনূর্ধ্ব-১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু। জাতিসংঘের মতে, জাতীয় আইনে অন্য কিছু না থাকলে ‘১৮ বছর বয়সের কম যেকোনো মানবসন্তানও শিশু’। আইনে এ কথাও আছে, এই শিশুরা কোনো বিশেষ অপরাধ করলে অপরাধের অনুসন্ধান, তদন্ত আলাদাভাবে করতে হবে। বিচারকার্য হবে শিশু আদালতে। বাংলাদেশে এবার হয়ে যাওয়া ছাত্র-গণআন্দোলনে অংশীজনদের মধ্যে বিশালসংখ্যক ছিল এই বয়সসীমার। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শিশু সংস্থা এ নিয়ে কাজ করছে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে। এবারের আন্দোলনে শিশু-কিশোর মৃত্যু নিয়ে তাদের হিসাব চলছে। আন্তর্জাতিকের বাইরে আমাদের স্থানিক হিসাবে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত শিশু-কিশোরের সংখ্যা শতের কাছাকাছি। এসব শিশু-কিশোরের শরীরে ছররা ও প্রাণঘাতী গুলির চিহ্ন ছিল। যানবাহন ও স্থাপনায় দেওয়া আগুনে মৃত্যু ৯ জনের। বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছররা, প্রাণঘাতী গুলি, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলা, গুলি এবং সরকার পতনের পর হামলা- অগ্নিসংযোগে শিশু-কিশোরের মৃত্যুর সব ঘটনা গণমাধ্যমে আসেনি। এখনো হাসপাতালে কাতরাচ্ছে শিশু-কিশোররা। কিছু কিছু ঘটনা গল্প-ছবিকেও হার মানানো। পুরান ঢাকার গে-ারিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র শাহারিয়ার খান আনাস (১৬) ৫ আগস্ট বাড়িতে চিঠি লিখে চলে যায় বিক্ষোভে। চিঠিতে সে লেখে, ‘মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলাম না। মৃত্যুর ভয়ে স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলি খেয়ে বীরের মতো মৃত্যু অধিক শ্রেষ্ঠ।’

নিহত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সী শিশুটির নাম আবদুল আহাদ (৪)। সে তখনো স্কুলে যাওয়া শুরু করেনি। ২০ জুলাই রাজধানীর রায়েরবাগে ৮ তলা ভবনের বারান্দা থেকে মা-বাবার সঙ্গে বিক্ষোভ দেখার সময় গুলিতে মৃত্যু হয় তার। নিহত শিশু-কিশোরদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের রিয়া গোপ (৬) ও উত্তরার নাঈমা সুলতানা (১৫)ও বেশ আলোচিত। শিশু হতাহতের ঘটনা সাভার-টঙ্গীসহ ঢাকায় সব চেয়ে বেশি। ঢাকার বাইরে ৩০-৩২ জন। আন্দোলনকে ঘিরে প্রথম শিশুমৃত্যুর ঘটনা ১৮ জুলাই। ওই দিন থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে অন্তত ৫৬ জন শিশু-কিশোর। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন থেকে ১১ আগস্টের মধ্যে আরও অন্তত ৩৩ শিশু-কিশোর নিহত হয়। বাংলাদেশে কোনো আন্দোলন ও বিক্ষোভে এত মানুষের মৃত্যু কখনো ঘটেনি। শিশু-কিশোরের এত মৃত্যু দেখা যায়নি। আবেগ-অনুভূতি ও বাস্তবতায় ১৭ বছর বয়সীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মধ্যে অনেক বর্তমান-ভবিষ্যৎ রয়েছে। এটি হবে রাষ্ট্রীয় এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ব্যাপারে তাদের মতামত দেওয়ার সক্ষমতার স্বীকৃতি দেওয়া। ১৭ বছর বয়সেই এই সক্ষমতা অর্জন হয়ে থাকলে কেবল রাজনৈতিক নয়, তাদের নিয়ে পারিবারিক-সামাজিক অনেক দায়ও রয়েছে। এখন ১৭ বছর বয়সীদের ভোটার করা হলে আগামী নির্বাচনে কত ভোটার বাড়বে এ বিষয়ে সরাসরি তথ্য না থাকলেও প্রতিবছর এসএসসি, দাখিল, কওমি বা সমমানের পরীক্ষার্থী ধরে হিসাব করলে একটা ধারণা মিলতে পারে। তা গড়ে ২৫ লাখ। এর সঙ্গে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের যোগ করলে সংখ্যাটা ৩২ লাখের ওপরে গিয়ে ঠেকে। তারা ভোটার হয়ে গেলে দেশের বিদ্যমান বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ভোট ব্যাংকে বড় রকমের নাড়া পড়বে। সংসদীয় ৩০০ আসনে ছড়ানো ছিটানো এই ৩২ লাখ নতুন ভোটার (প্রতি আসনে গড়ে ১০ হাজার)  নির্বাচনের হিসাবই পাল্টে দেবে। তারাই হয়ে উঠবে ভোটের অন্যতম নিয়ামক। যে কারণে একে ইস্যু করে নতুন সংকট তৈরির ঝুঁকিও রয়েছে।  রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণ চলছে। এই শিশু-কিশোরদের ভোটার করতেই নির্বাচনে দেরি করা হচ্ছে বলে ঘোরতর সন্দেহ আছে কারও কারও। তরুণরা এবার অতি উৎসাহী ভোটের জন্য। যুবকদের অনেকেও গত ১৫-১৬ বছর ধরে ভোট দিতে পারেনি। ৪০ বছরের বেশি বয়স্কদের অনেকেও কবে ভোট দিয়েছেন ঠিকমতো মনে করতে পারেন না। এদেশের মানুষ বিরাট লাইন করে ভোট দিয়ে পৃথিবীতে সুনাম পেয়েছে। নারীরাও দীর্ঘ লাইন ধরে ভোট দিয়েছেন। সেসব দৃশ্যকে ইতিহাস করে দিয়ে গেছে পতিতরা। বাতকে বাত বলা হয়, মানুষ দ্রুত অনেক কিছু ভুলে যায়। তা সত্য। কিন্তু সব ভোলে না। অনেক কিছু মনেও রাখে।  নির্বাচন তথা ভোটকে বিগত সরকারের কবর দেওয়ার তথ্য কেবল এ প্রজন্মে নয়, কালো দলিল হয়ে থাকবে ইতিহাসের কাছেও।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত