‘জাতীয়’ অভিধার সরকারীকরণ উদ্দেশ্যপূর্ণ

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৫, ০২:৫০ এএম

জাতীয় অভিধা যতক্ষণ জনগণের যাপিত জীবনের চর্চায় থাকে ততক্ষণ তাতে থাকে জনগণের ইচ্ছা, অভিপ্রায় ব্যক্ত করার বিস্তৃত সুযোগ। সেটি হয় জনগণের কাছে পরম আরাধ্য। কিন্তু সেই জাতীয় শব্দকে যখন কোনো সরকার ও ক্ষমতাসীন দল নিজস্ব সম্পদে পরিণত করতে উদ্যত হয় তখনই সমস্যা। “সরকার জনগণের কোনো প্রতিষ্ঠান বা সম্পদকে ‘জাতীয়’ করলেই বুঝবেন তার মধ্যে কোনো না কোনো উদ্দেশ্য আছে। সংগত কারণে ‘জাতীয়’ অভিধাটির সরকারীকরণ বা জাতীয়করণ হয়ে ওঠে একটি ঝামেলাপূর্ণ প্রপঞ্চ” কথাগুলো বলেছিলেন আমার রাজনৈতিক শিক্ষক আবদুল বারী, যাকে আমরা বারী ভাই হিসেবে প্রিয়তর অবস্থানে রেখেছি। কথাগুলো মনে পড়ল এই কারণে যে, সম্প্রতি ছত্রিশে জুলাইয়ের গণজাগরণ পরবর্তী সময়ে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অনেক কিছুকেই পাল্টে দেওয়ার কিংবা বাতিল করবার প্রয়াস তৈরি হয়েছে। সেই প্রয়াসের অংশ হিসেবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সবশেষ বাতিল করেছে ‘জয়বাংলা’ স্লোগানটির সরকারীকরণের আইনি সিদ্ধান্ত। যা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে ‘জাতীয়’ হিসেবে বৈধতা পেয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২০ সালের ১০ মার্চ তারিখে। বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের দ্বৈত বেঞ্চ বাংলায় লেখা সেই রায়ে বলেছিলেন, ‘‘আমরা ঘোষণা করছি যে, ‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান হবে।’’ পরে ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ‘জয় বাংলা’-কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভা।” এরপর একই বছরের ২ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। যাতে বলা হয়, ‘জয় বাংলা’ হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান। সাংবিধানিক পদাধিকারীরা দেশে ও দেশের বাইরে কর্মরত সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার কর্মকর্তা/কর্মচারীরা সব জাতীয় দিবস উদযাপন এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ও সরকারি অনুষ্ঠানে দেয় বক্তব্যের শেষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারণ করবেন। এছাড়াও দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাত্যহিক সমাবেশের পর ও সভা-সেমিনারে বক্তব্য শেষে শিক্ষকরা ও শিক্ষার্থীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারণ করবেন। এভাবেই সর্বজনস্বীকৃত একটি জনপ্রপঞ্চকে নিজ দলের সম্পত্তিতে পরিণত করে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। 

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি এই জনপদের মানুষের সবথেকে বড় অর্জন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রেরণাদায়ী একটি প্রপঞ্চ। যে স্লোগান এ দেশের জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সাহস জুগিয়েছে দেশমাতৃকার দখলদারদের বিরুদ্ধাচরণে। যতদূর জানা যায়, মানুষকে মুক্তিপ্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত করবার অন্যতম এই শব্দবন্ধটি সর্বপ্রথম উচ্চারিত হয় ১৯২২ সালে কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কবিতায়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা মাদারীপুরের স্কুল শিক্ষক পূর্ণচন্দ্র দাসের স্বজাত্যবোধে মুগ্ধ হয়ে পূর্ণচন্দ্র দাসের কারামুক্তি উপলক্ষে কালিপদ রায় চৌধুরীর অনুরোধে ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কবিতাটি লেখেন কবি। এছাড়া কবির রচিত ‘বাঙালির বাঙলা’ প্রবন্ধেও জয় বাংলা শব্দ যুগলের হদিস মেলে। এরও পরে পাকিস্তান ঔপনিবেশিক শাসন-সময়ে ১৯৬৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সভায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আফতাব আহমেদ ও চিশতী হেলালুর রহমান ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি উচ্চারণ করেন। ১৭ মার্চের শিক্ষা দিবস যৌথভাবে পালনের জন্য কর্মসূচি প্রণয়নের লক্ষ্যে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এই সভার আয়োজন করে। তবে ১৯৭০ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকার পল্টনের এক জনসভায় ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান। শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের সাতই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসভায় তার ভাষণ শেষ করেন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে। আর এভাবেই এই স্লোগানটি হয়ে ওঠে এই জনপদের মানুষের মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম উদ্দীপক।

ইংরেজি হধঃরড়হধষ শব্দটির বাংলা অর্থ হচ্ছে জাতীয়। আভিধানিকভাবে জাতির সঙ্গে সম্পর্কিত সবকিছুই জাতীয়। সেই অর্থে কোনো একটি জাতির ভাষা, পতাকা, পোশাক ও সংস্কৃতির মতো প্রপঞ্চকে আমরা ‘জাতীয়’ হিসেবেই স্বীকৃতি দিয়ে থাকি। আর এসব প্রপঞ্চ নিজেদের স্বীকৃতির জায়গা করে নেয় এদের দীর্ঘদিনের চর্চিত অবস্থানের জোরে। যেমন একটি জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা জাতীয় হয়ে ওঠে তখনই যখন সেটি সংশ্লিষ্ট জাতির অধিকারবোধের দিক থেকে সর্বজনস্বীকৃতি লাভ করে। যে অধিকার হরণের বিরুদ্ধাচরণের মধ্য দিয়ে রঞ্জিত হয়েছিল এই ভূখন্ডের রাজপথ। প্রাণ দিয়েছিল বাঙালি তরুণ যুবারা। তৈরি হয়েছিল বাহান্নর ভাষা আন্দোলন। কিন্তু গোল বাধে তখনই যখন কিনা কোনো একটি জাতির এমন সব জনউৎসারিত প্রপঞ্চকে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকার ‘জাতীয়’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অন্যভাবে বলা যায়, রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর মধ্যে যখন ব্র্যাকেটবন্দি করে কিংবা করতে উদ্যত হয়। আসলে কোনো একটি রাষ্ট্রের পরিচালক সংস্থা তথা সরকার যখন জনগণের কোনো সম্পদকে জাতীয় অভিধায় অভিহিত করে তখন সেটি আর জনসম্পদ থাকে না। সেটি হয়ে যায় নির্দিষ্ট সেই সরকারের অধিকৃত সম্পদ! যাকে সে (সরকার) নিজের মতো করে ব্যবহার ও ভোগ করে। সেই অর্থে ‘জাতীয়’ শব্দটির অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে ‘সরকারি’ মোটেও তা ‘রাষ্ট্রীয়’ বা ‘জনঅধিকৃত’ নয়। কোনো একটি রাষ্ট্রের পরিচালক সংস্থা বা সরকার (তা সে জনভোটেই নির্বাচিত হোক, কিংবা রাতের ভোটে) যে কোনো জনপ্রপঞ্চকে নিজের করায়ত্তে নিতে চায় সেই প্রপঞ্চের ওপর তার আধিপত্য কায়েম করতে। কিংবা নিজের ফায়দা লুটতে।

‘জাতীয়’ প্রপঞ্চটি যেহেতু কোনো একটি জাতির যাপিত জীবনের আজন্ম চর্চিত বিষয়, তাই সেটিকে রাষ্ট্র বা সরকার কর্র্তৃক অনুমোদনের দরকার হয় না। আর যখন সেটি করা হয় কিংবা করবার চেষ্টা করা হয়, তখনই সেটি নিয়ে সৃষ্টি হয় বিতর্কের। কেননা কোনো একটি রাষ্ট্রের সরকার যখন এমনটা করে তখন সেটিকে সেই রাষ্ট্র বা সমাজের রাষ্ট্র বা সরকারবিরুদ্ধ বড় একটি অংশ সমর্থন করে না। ফলে বিতর্কিত হয়ে পড়ে সর্বজনস্বীকৃত সেই ‘জাতীয়’ প্রপঞ্চটি। আর ঠিক এমনটিই ঘটেছে ‘জয় বাংলা’, ‘সাতই মার্চ’-এর মতো জনপ্রপঞ্চকে ‘জাতীয়করণ’ তথা আওয়ামীকরণ করবার ফলে। এই জনপদের মানুষের মুক্তির সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অনুঘটক হিসেবে স্বীকৃত এই প্রপঞ্চগুলো উৎসারণের ক্ষণ থেকে এতদিন সাধারণের সর্মথন-অসমর্থনে ঋদ্ধ হয়েই চর্চিত হয়ে আসছিল এই জনপদের মুক্তিকামী মানুষের কাছে। একাত্তরের জনযুদ্ধের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ তার দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ মেয়াদের বিতর্কিত নির্বাচনে (কখনো তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, কখনো বা রাতের ভোটে) রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। হয়ে ওঠে দুর্নিবার, অদম্য, অপ্রতিরোধ্য এবং প্রচন্ড মাত্রায় কর্র্তৃত্বপরায়ণ। আর এই সাংবিধানিক কর্র্তৃত্বপরায়ণতার সুবাদে দলটি মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে জয় বাংলা এবং সাতই মার্চের মতো জনপ্রপঞ্চকে পরিণত করে আওয়ামী লীগের নিজস্ব সম্পত্তিতে। যা স্পষ্ট হতে শুরু করে স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের সময়েই। একাত্তরে সারা ােদশের মানুষকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের মুখে ফেলে দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা যখন ভারতে গিয়ে প্রবাসী সরকার গঠন করেন। তখনই তারা মুক্তিযুদ্ধকে শুধুই নিজের করে নেওয়ার প্রয়াস নেয়।  স্বাধীনতার পরও তারা ‘এক নেতা এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ এমন বয়ান তৈরির লক্ষ্যে সব প্রয়াস অব্যাহত রাখে। তবে আওয়ামী লীগের এমন নিজস্বীকরণের প্রবণতা সব থেকে বেশি পরিলক্ষিত হয়, বিগত পনেরো বছরের শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে। 

মূলত বিচার বিভাগের কাঁধে বন্দুক রেখে ধারাবাহিক রাষ্ট্রক্ষমতার তৃতীয় মেয়াদের শেষ দিকে এসে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা মরিয়া হয়ে ওঠে গোটা বাংলাদেশকে নিজেদের পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত করতে। আইন করে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা ঘোষণা [দেখুন সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১], শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন ১৭ মার্চকে জাতির পিতার জন্মদিবস ও জাতীয় শিশু দিবস।  মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি জনযুদ্ধকে দলের সম্পত্তিতে পরিণত করেছিল আওয়ামী লীগ। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের জননেতৃত্বকে অস্বীকার করে এককভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় নানা বয়ান তৈরিতে মরিয়া ছিল খোদ শেখ হাসিনা। এরই ধারাবাহিকতায় ‘জাতীয়’ তথা পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত করবার মধ্য দিয়ে এই জনপদের সামষ্টিক সোচ্চারণ সাতই মার্চ এবং ঐক্য আর সাফল্যে স্লোগান ‘জয় বাংলা’কেও তারা জনগণের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। শুধু এখানেই থেমে থাকেনি শেখ হাসিনার পরিবারতন্ত্র গড়ে তুলবার এই প্রয়াস! জনগণের করের টাকায় নিজের মাকে মহিমান্বিত করবার লক্ষ্যে ৮ আগস্ট বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকী, ৫ আগস্ট নিজের ভাই শেখ কামালের জন্মবার্ষিকী, ১৮ অক্টোবর শেখ রাসেল দিবস, ৪ নভেম্বর জাতীয় সংবিধান দিবস এবং ১২ ডিসেম্বরকে স্মার্ট বাংলাদেশ দিবস হিসেবে উদযাপনকে বাধ্যতামূলক করা হয়। এছাড়া রাষ্ট্রীয় প্রায় সব প্রতিষ্ঠানকে নিজের বাবা, মা, ভাই ও বোনের নামে নামকরণ করবার মধ্য দিয়েও এমনিতর জনবিরুদ্ধ প্রয়াস অব্যাহত রাখে শেখ হাসিনা। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, দেশের ১৯টি বিভিন্ন ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হয় শেখ মুজিবুর রহামানের নামে। বলা চলে গোটা দেশ ও দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত করেছিল শেখ হাসিনা!! এমনিভাবে সাংবিধানিক স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ বিগত পনেরো বছরে শুধু জনগণের আবেগ, জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকেই অবজ্ঞা করেছে তাই নয়, একইসঙ্গে রাষ্ট্রকে করেছে জনবিরুদ্ধ। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রায় সব প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল জনগণের বিরুদ্ধে। অস্বীকার করেছে এই জনপদের মানুষের ও সমাজের বহুমুখিনতা ও নানান বৈচিত্র্যকে। স্বেচ্ছাচারের চরম মাত্রায় ছিঁড়ে ফেলেছে বৈচিত্র্যের ঐক্যকে।

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক সদস্য, রাষ্ট্রচিন্তা

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত