এলডিসি এবং বাস্তবতা

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৫, ১২:০১ এএম

১৯৭১ সালের ১৮ নভেম্বর প্রথম জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা প্রণয়ন করে। শুরুতে অন্তর্ভুক্ত ছিল ২৫টি দেশ। বর্তমানে ৪৪টি দেশ এলডিসি হিসেবে শ্রেণিভুক্ত রয়েছে। ২০১৮ সালের ১২-১৬ মার্চ নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (ইউএনসিডিপি) ২০তম অধিবেশনের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এলডিসি থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সীমা অর্জন করতে সক্ষম হয়। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু দেশের একটি শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন কিছুদিন আগে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হওয়ার সময়সীমা ১০ বছর পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। তারা বলেছে, বাংলাদেশ এখনো উন্নয়নশীল দেশের অবস্থায় উত্তীর্ণ হওয়ার মতো উপযুক্ত অবস্থা অর্জন করেনি। এই অবস্থায় দেশ যদি উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হয়, তাহলে অর্থনীতির ওপর যে অভিঘাত সৃষ্টি হবে, তা সামাল দেওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে। আগামী বছরের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে যাবে বাংলাদেশ। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ কিছু সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হবে। বিশেষ করে প্রধান রপ্তানি বাজারে বর্তমানে যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার রয়েছে, সেটি থাকবে না। বর্তমানে বাংলাদেশ যে কম সুদে বৈদেশিক ঋণ পায়, তার সুদ বেড়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে, নিশ্চিতভাবেই বিরূপ প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। মূলত, উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেতে জাতিসংঘের নির্ধারিত তিনটি সূচক অতিক্রম করতে হয়। প্রথমত দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১২৩০ ডলারের বেশি হতে হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে দেশের মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৭৩৮ ডলার। ২০২৪ সালে মানবসম্পদ সূচকে বাংলাদেশের পয়েন্ট ৭৭ দশমিক ৫। এক্ষেত্রে ৬৬ পয়েন্টের বেশি হলে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার যোগ্যতা অর্জিত হয়। সবশেষ অর্থনৈতিক ঝুঁকির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পয়েন্ট ২১ দশমিক ৯। এ পয়েন্ট ৩২-এর নিচে থাকলেই উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জন হয়।

এলডিসি উত্তরণে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতিফলন হলেও, এতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হবে। যা অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং সামাজিক খাতকে প্রভাবিত করতে পারে। রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে বুধবার ‘স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ : প্রস্তুতি ও বাস্তবতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এমন কথা বলেন। গবেষণা সংস্থা ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সভায় সম্মানিত অতিথির বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ ছাড়া বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের দ্য স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের অধ্যাপক মুশতাক খান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক ও গবেষক। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী মো. জাকির হোসেইন খান বলেন, ‘এলডিসি থেকে বের হওয়ার জন্য সরকার তাড়াহুড়া করছে। কিন্তু এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে যেসব সমস্যা সৃষ্টি হবে, সেগুলো সমাধানে কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আমাদের কিছু জানা নেই।’ এদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে বৈশি^ক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দুর্বল হবে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রানজিস্কা ওন্সর্জ বলেছেন, ‘নিম্ন রাজস্ব দক্ষিণ এশিয়ার আর্থিক দুর্বলতার মূল কারণ এবং এটি অনিশ্চিত বৈশি^ক পরিবেশে স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।’

এলডিসি থেকে কোন কোন দেশ বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে সিডিপি। এজন্য তিন বছর পরপর এলডিসিগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করা হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা এই সূচকগুলো দিয়ে একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারবে কি না, সেই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি দুর্বল হলে, আমাদের নিশ্চিতভাবেই বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। তখন আর্থিক খাতে অস্থিরতা দেখা দেবে। সে সময় অর্থনীতি, রাজনীতির গতিপথ কী হবে তা বলা খুব একটা কঠিন নয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত