চমকহীন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ এবং বাস্তবতা

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৫, ০৩:১৭ এএম

রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের হিড়িক পড়েছে। গত ৮ মাসে অন্তত ২৭টি দল আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দিয়েছে। এসব দলে নেতৃত্বে আছেন চেনা রাজনীতিক, সেলিব্রেটি এবং তরুণরা। বিশেষ করে, জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছে। তারাই আছেন মূল আলোচনায়। অন্য দলগুলো নিয়েও নানা রকম কথা চলছে রাজনীতির মাঠে। বাংলাদেশের যেকোনো ব্যক্তি চাইলেই রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারে। তবে নিজ দল থেকে নির্বাচন করতে হলে, দলটিকে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হতে হয়। নতুন আত্মপ্রকাশ করা দলগুলো এখানো নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধন পায়নি। যদিও দল নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেওয়া সময় শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি এবং আ-আম জনতা পার্টি নিবন্ধনের সময় তিন মাস বাড়ানোর আবেদন করেছে। এই প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন দল নিবন্ধনের সময় দুই মাস বাড়ায়। নিবন্ধনের সময় বাড়ানোর পর আরও কিছু নতুন দলের আত্মপ্রকাশ করেছে। যদিও আগামী জাতীয় নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ করা নিয়ে কিছু জানা যায়নি। তারা এককভাবে নির্বাচন করবে নাকি জোটবন্ধভাবে নির্বাচন করবে, সেটা জানা যাবে আরও পরে। এর আগে তাদের প্রয়োজন হবে নিবন্ধনের এবং দলের রাজনৈতিক দর্শন জনগণের সামনে তুলে ধরা।

নতুন আত্মপ্রকাশ করা দলগুলোর বেশিরভাগেরই দলীয় কার্যালয় নেই বলে খবর এসেছে পত্রিকার পাতায়। বলা হচ্ছে দোকান, স্টোর রুম, এমনকি শ্বশুর বাড়ির ঠিকানা দেওয়া হয়েছে দলীয় কার্যালয় হিসেবে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের যোগাযোগের ফোন নম্বরও নেই। প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ এসব দল আত্মপ্রকাশের অর্থ কী। যদি রাজনৈতিক দল গঠনের ইচ্ছাই থাকে, তবে এভাবে কেন? দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে চারটি রাজনৈতিক দল নিবন্ধন নিয়েছিল। তৃণমূল বিএনপি, ইনসানিয়াত বিপ্লব-বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি। বিএনপি নির্বাচনে যোগ দেবে না খবরে এসব রাজনৈতিক দলের ঘোষণায় চমক দেখা দেয়। কিন্তু নির্বাচনে তৃণমূল বিএনপি ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত  পারেনি। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এই দলগুলোর নির্বাচনের পর আর কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। নির্বাচনে বিরোধী দলের ভূমিকায় যাওয়ার বাসনা প্রকাশ করলেও শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ভারত চলে যাওয়ার পরও এসব দলের কোনো নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস পাওয়া যাচ্ছে না। মূলত বিএনপির অনুপস্থিতিতে নির্বাচনকে জমজমাট করতে আওয়ামী লীগের চেষ্টা ছিল এসব দলকে নির্বাচনের মাঠে রাখার। শমসের মবিন চৌধুরী ও তৈমূর আলম খন্দকারকে বিএনপি থেকে আলাদা করে তাদের মাধ্যমেও বিকল্প বিএনপি করার চেষ্টাও আওয়ামী লীগ করেছে। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি এবং নির্বাচনে তারা কোনো অবদান রাখতে পারিনি। মূলত এ কারণে এই দলগুলো নির্বাচনের পর নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে নিজেদের মতো করেই।

এখন যে ২৭টি দল আত্মপ্রকাশ করেছে, এসব দল কি তবে কিংস পার্টি হবে? নাকি শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা হচ্ছে? এমন একটি আলোচনা চলছে সর্বত্র। কিংস পার্টি বলি বা শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা বলি, একই কথা। আওয়ামী লীগ তার একতরফা নির্বাচনে বড় দল বিএনপিকে আনতে না পেরে এসব কিংস পার্টিকে উৎসাহিত করেছিল। তবে ওই সময়ের চেয়ে বর্তমানের পার্থক্য হলো, তখন সরকারের তত্ত্বাবধানে শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা হয়েছে। এখন আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সুবিধা পাওয়ার বাসনায় নতুন নতুন দলের আবির্ভাব হচ্ছে। কিন্তু দলের আবির্ভাব ঘটলেই যে আগামী নির্বাচন জমজমাট হবে, সেটা বলা যাবে না। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্বশীল ভূমিকায় যেতে হবে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, নতুন দলগুলোর নিবন্ধন এবং রাজনীতির মাঠে দলগুলোর উপস্থিতি পারে আগামী নির্বাচনকে জমজমাট করতে। বাংলাদেশের নির্বাচন বা ভোটাধিকার সম্পর্কিত যত আইন আছে, তার মধ্যে একটি হলো আরপিও (রিপ্রেজেন্টেটিভ পিপলস অর্ডার) বা গণপ্রতিনিধিত্ব আইন। সেখানে অধ্যায় ৬ক-তে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের কিছু শর্ত আছে। এ উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশন ‘রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮’ শীর্ষক একটি বিধিমালাও প্রণয়ন করেছে। সেখানে তিনটি শর্তের কথা বলা হয়েছে নিবন্ধন পেতে হলে সেগুলোর যেকোনো একটি পূরণ করতে হবে। সেই শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত যেকোনো সংসদ নির্বাচনে দলীয় নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে কমপক্ষে একটি আসনে জয়ী হওয়ার রেকর্ড থাকতে হবে। যেকোনো একটি আসনে দলীয় প্রার্থীকে মোট প্রদত্ত ভোটের পাঁচ শতাংশ পেতে হবে। কেন্দ্রীয় কমিটিসহ একটি কেন্দ্রীয় কার্যালয়, অন্তত এক-তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক জেলায় কার্যকর জেলা কার্যালয়, অন্তত ১০০টি উপজেলায় কার্যালয় এবং প্রতিটিতে সদস্য হিসেবে অন্তত ২০০ জন ভোটারের তালিকাভুক্তি থাকতে হবে। তবে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন এসব নিয়মের অনেক কিছু শিথিল করেছে। যদিও কমিশনের সেসব সুপারিশ অনুযায়ী এখনো আইন সংশোধন করা হয়নি। নতুন দল নিবন্ধনের আবেদন করার আগেই সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী আইন সংশোধন করা হয়, তাহলে তাদের জন্য সবকিছু শিথিল থাকবে। নয়তো পুরনো আইনই বহাল থাকবে। নিবন্ধনের সময় বৃদ্ধির আবেদনে এনসিপি উল্লেখ করেছে, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশের আলোকে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি প্রণয়ন বা সংশোধন করে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হওয়া দরকার। মৌলিক সংস্কারের আলোকে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, বিদ্যমান নিবন্ধিত দলের নিবন্ধন হালনাগাদ করাও আবশ্যক। ২০০৮ সালের রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা ও প্রাসঙ্গিক আইনের অধীনে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের শর্তগুলোকে ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অসাংবিধানিক’। আগের স্বৈরাচারী সরকারের আমলে তৈরি এই বিধিগুলো রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে সংকুচিত এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য প্রণীত। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নিজেই জেলা পর্যায়ে ১০ শতাংশ ও উপজেলা পর্যায়ে ৫ শতাংশ কার্যালয় স্থাপনের শর্ত সহজীকরণের পাশাপাশি প্রতি পাঁচ বছরে নিবন্ধিত দলের নিবন্ধন নবায়নের বাধ্যবাধকতার প্রস্তাব দিয়েছেন। তা ছাড়া ইসির বর্তমান কাঠামো ও ব্যক্তিদের নিয়োগ ২০২২ সালের বিতর্কিত আইন অনুসারে গঠিত সার্চ কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব ও নিরপেক্ষতা রক্ষায় ব্যর্থতার জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে, যা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুন্ন করছে। এখন এনসিপির আবেদনে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধনের সময় দুই মাস বাড়িয়েছে। কিন্তু সংস্কার কমিশনের সুপারিশের আলোকে নির্বাচন কমিশন সংস্কার করতে হলে অধ্যাদেশ জারি করতে হবে। কারণ সংসদ নেই বলে আইন প্রণয়নের সুযোগ আপাতত নেই। ফলে সংস্কার কমিশনের সুপারিশের আলোকে নির্বাচন কমিশন সংস্কারের অধ্যাদেশ জারি হলে, অন্য দলগুলো বিশেষ করে পুরনো দলগুলো সেটা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে কিনা সেটা দেখার বিষয়।

মূলত রাজনৈতিক দল গঠনের আরও কিছু কারণও আছে। রাজনৈতিক দলের নেতারা সরকার-প্রশাসন থেকেও বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া ছোট দলগুলো সরকারি দলের নেতা বা মন্ত্রীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ব্যবসায়িক সুবিধাও পান। ফলে দল গঠনের সময় টাকাকড়ি দেখা না গেলেও, দল গঠনের পর বাড়ি-গাড়ি কিন্তু ঠিকই দেখা যায়। এ ছাড়া বিরোধী দলগুলোও এসব ছোট ছোট দলগুলোকে প্রণোদনা দেয়। যেন আন্দোলন সংগ্রামে সহমত প্রকাশে কাছে পাওয়া যায়। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে তারুণ্যনির্ভর রাজনৈতিক দলগুলোই শেষ অবধি রাজনীতির মাঠে সক্রিয় আছে। ১৯৪৯ সালে যখন মুসলিম থেকে আলাদা হয়ে আওয়ামী লীগ তাদের যাত্রা শুরু করে, তখন সেটি তরুণদের নেতৃত্বেই হয়েছিল। শেখ মুজিব, খন্দকার মোশতাক, তাজউদ্দীন আহমদের বয়স তখন ২৫-৩০ বছর। ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তরুণরা জাসদ করল। বর্তমান সময়ে তরুণরা বিপ্লবের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটিয়েছে। তাদের দল এনসিপি আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতিমধ্যে দল গোছানো অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে। আগামী নির্বাচনে দলটির বড় ভূমিকা থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশাও বেশি।

সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একটি বিদেশি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন হবে সর্বকালের সেরা নির্বাচন। আগামী বছরের জুনের মধ্যে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।  আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি পাবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস বলেছেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এখনো কিছু জানায়নি। যখন এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসবে, তখন নির্বাচন কমিশনের প্রতিক্রিয়া ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও সামনে আসবে। অন্যান্য অনেক দল বলতেও পারে যে এই আইনের অধীনে তারা অংশগ্রহণ করতে পারবে না, ইত্যাদি। ড. ইউনূস সাক্ষাৎকারে যদিও বিষয়টি স্পষ্ট করেনি, তবে নির্বাচন ঘনিয়ে এলে বিষয়টি মাথা চাড়া দিতে পারে। এ কারণে আওয়ামী লীগের ইস্যুটি জিইয়ে না রেখে এখনই এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে আসা উচিত। এই সিদ্ধান্ত আসতে হবে সব দলের কাছ থেকে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর যেন কোনো পক্ষ নির্বাচনের শুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে। অতীতের নির্বাচনগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলা হয়। তবে ওই নির্বাচনের শুদ্ধতা নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলো থেকে প্রশ্ন উঠেছে। সূক্ষ্ম কারচুপি, স্থূল কারচুপির অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা যখন বলছেন আগামী নির্বাচন হবে সর্বকালের সেরা নির্বাচন, তবে আমরা আগামী নির্বাচনের পর শুনতে চাই না নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। নির্বাচনে যারা পরাজিত হবেন তারা যেন নির্বাচনের ফল হাসিমুখে মেনে নিয়ে বলেন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, সে দৃশ্যটা এবার জাতি দেখতে চায়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত