'সাবিনাকে নিয়ে আমরা গর্বিত'

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৩৬ এএম

২০২২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালার সন্ধ্যাটাই যেন ফিরে এলো ব্যাংককের হুয়া মাক ইনডোর স্টেডিয়ামে। ফিরিয়ে আনলেন সাবিনা খাতুন। আমাদের গর্বের সাবিনা। বাংলাদেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় পোস্টার গার্ল সাবিনা। কাঠমান্ডুতে সেই সন্ধ্যায় সাবিনার নেতৃত্বে স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সাফ ওমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপ নিজেদের করে নেয় বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। দুবছর পর একই মঞ্চে সেই সাবিনার দল ধরে রাখে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব। এর ঠিক ১৫ মাস পর আরেকবার সাফের মঞ্চে সেরা বাংলাদেশ। যথারীতি শিরোপাটাও উঠল সেই সাবিনার হাতেই। ধরনটা কেবল বদলেছে, এবার সাবিনা নেতৃত্ব দিলেন প্রথম সাফ ওমেন্স ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপে। কেবল আর্মব্যান্ড পরেই নয়, পুরো টুর্নামেন্টে সাবিনা নেতৃত্ব দিলেন সামনে থেকে। বয়স ৩২। অথচ দলের বাকি ১৩ জনকে পেছনে ফেলে মাঠের পারফরম্যান্সেও তিনিই সেরা। 

দক্ষিণ এশিয়ার সাত দেশের ৯৮ ফুটবলার অংশ নিয়েছেন এই আসরে। সাবিনা ছাপিয়ে গেছেন বাকি সবাইকে। বয়স ও অভিজ্ঞতার দিক থেকে আগে থেকেই এগিয়ে ছিলেন। তবে বয়সের ছাপ পড়তে দেননি নিজের পারফরম্যান্সে। তাই তো ছয় ম্যাচে বাংলাদেশের করা ২৮ গোলের ১৪টিই এসেছে সাবিনার পা থেকে। রবিবার রাউন্ড রবিন লিগের শেষ ম্যাচে মালদ্বীপকে ১৪-২ গোলে হারাতে অগ্রণী ভূমিকা ছিল তার, করেছেন চার গোল। এছাড়া সতীর্থদের একাধিক গোলে প্রত্যক্ষভাবে ছিল তার অবদান। তাই তো নেট দুনিয়ায় সাবিনাকে নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি থেকে শুরু করে ভক্তরা প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন সাবিনাকে। 

শিরোপা নিশ্চিত হওয়ার পর বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছা বার্তায় বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন সাবিনার নাম, ‘বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে তাদের ফুটসাল যাত্রা শুরু করেছে। আমাদের পুরুষ ও নারী দল বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের দেশে প্রতিভা এবং জয়ের মানসিকতা রয়েছে। সাফ ফুটসালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের আধিপত্য আরও বিস্তার করার জন্য নারী দলকে জানাই বিশেষ অভিনন্দন। বাংলাদেশের একমাত্র ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে খেলার দুটি ভিন্ন ফরম্যাটে (ফুটবল ও ফুটসাল) দলকে চ্যাম্পিয়ন করায় সাবিনাকে নিয়ে আমরা গর্বিত।’
তবে ব্যক্তি সাবিনা অন্য ধাতুতে গড়া। তার কাছে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলীয় সাফল্য বড়। তাই তো, পুরো আসর জুড়েই অনুজদের ছায়া হয়ে থেকেছেন। তিনি জাত ফরোয়ার্ড। অথচ এ আসরে খেলা শুরু করেছেন নিচে নেমে, মূল ডিফেন্ডারের ভূমিকায়। তবে প্রয়োজনে ওভার ল্যাপ করে ওপরে উঠেছেন, সেট পিসগুলোর বেশিরভাগই তার নেওয়া। সেসব থেকে নিয়মিত গোলও করেছেন। আবার অসাধারণ সব পাসে সতীর্থদের সাজিয়ে দিয়েছেন গোল। রক্ষণ সামলেছেন নিজে থেকে দায়িত্ব নিয়ে। আবার টার্ফের প্রতিটি কোনেই তার উপস্থিতি চোখে পড়েছে ছয় ম্যাচেই। ফুটসালে একটা সুযোগ থাকে, একটু বিশ্রাম নিয়ে খেলার। সাবিনা সে সুযোগটা খুব বেশি নেননি এ টুর্নামেন্টে। হয়তো অন্যদের অনুপ্রেরণা দিতেই টার্ফে থাকাটাই দায়িত্ব মনে করেছেন। 

২০২২ প্রসঙ্গটা শুরুতে আনার কারণ, কাঠমান্ডুতে প্রথমবারের মতো সাফ সেরা হওয়ার পথে সেরা খেলোয়াড় ও সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন সাবিনা। ২০২৪ সালে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার সফল মিশনে গোলের মালা হয়তো গাঁথতে পারেননি। তবে টুর্নামেন্ট শুরুর পর কোচ পিটার বাটলারের সঙ্গে দলের সিনিয়রদের বিরোধে শ্রেষ্ঠত্ব হারানো যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, অধিনায়ক হিসেবে নানাভাবে সে শঙ্কা দূর করে দিয়ে ঠিকই বাংলাদেশের মাথা উঁচু রেখেছিলেন সাবিনা। সেবার পছন্দের নাম্বার ১০ পজিশনটা তরুণ মনিকাকে ছেড়ে দিয়ে একটু নিচে নেমে খেলেছিলেন সাবিনা। তাতে রক্ষণভাগের সঙ্গে আক্রমণভাগের সেতুর কাজটা হয়েছিল ঠিকঠাক। পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বদলে ফেলার সহজাত বৈশিষ্ট্যই এই ফুটসাল আসরেও সাবিনাকে এগিয়ে রেখেছে, করেছে অনন্য। 

দেশের নারী ফুটবলে সাবিনা একজনই। এ কারণেই দুই সাফ জেতানোর পর যখন ব্রিটিশ কোচের একগুঁয়েমির বলি হতে হলো, ছিটকে যেতে হলো জাতীয় দল থেকে- তারপরও মুখ খোলেননি। তার সঙ্গে বড় অন্যায় হয়েছে, নারী ফুটবলের জাগরণের অগ্রনায়ক হওয়ার পরও তাকে দেওয়া হয়নি প্রাপ্য সম্মান। তারপরও নীরব থেকেছেন। বিচারের ভার ছেড়েছেন সময়ের হাতে। করেননি কোনো বেফাঁস মন্তব্য। দেশকে আরেকবার সাফের মসনদে বসিয়েও চুপ থাকলেন। কোনো প্রতিক্রিয়াই জানালেন না। তবে এ সাফল্য যে অনেক বঞ্চনার জবাব সেটা মুখে না বললেও বোঝা গেছে। 

‘বুড়িয়ে গেছেন’— এমন ট্যাগিংও সইতে হয়েছে সাবিনাকে। ভুটান লিগে পারো এফসির হয়ে ভূরি ভূরি গোল করার পরও তাকে নিয়ে অনেকে হাসি-তামাশায় মেতে ছিলেন। সাবিনা চুপ থেকেছেন। মুখ খোলেননি। বরং নিজের ওপর বিশ্বাস রেখেছেন। কঠোর পরিশ্রম করেছেন, নিজেকে প্রস্তুত রেখেছেন। এখানেই সাবিনা সবার চেয়ে আলাদা। আর ‘অবিশ্বাস্য’ তো তার পারফরম্যান্সই বলে দিচ্ছে। 

দেশ যে তার কাছে সবার ওপরে, তার মোক্ষম প্রমাণ সাবিনা দিয়েছেন নারী ফুটবল লিগে আকর্ষণীয় চুক্তির তোয়াক্কা না করে ফুটসাল দলে যোগ দিয়ে। লিগ না খেলে ফুটসাল কেন? এমন প্রশ্নে শুধু বলেছিলেন, ‘দেশের জার্সি আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। সেটা যে কোনো মঞ্চেই হোক।’ অথচ এই সাবিনাকে কতটা বঞ্চনাই না সইতে হয় প্রতিটি মুহূর্ত। সেই সাবিনাকে নিজের ইচ্ছেমতো ছিটকে দেন কোচ, সেটা আবার মুখ বুজে মেনেও নেন বাফুফে কর্তারা! 
আরেকটি ইতিহাসের গোড়াপত্তনের পর কি প্রাপ্য সম্মানটা পাবেন সাবিনা?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত