কারও ওপর ক্ষোভ নেই, দোষারোপও করছি না

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:১১ পিএম

দেশের নারী ফুটবলের সব সাফল্যের অগ্রনায়ক তিনি। অথচ সাবিনা খাতুনকে নিয়ে কত সমালোচনাই না হয়েছে ২০২৪ সাফ জয়ের পর। অনেক অন্যায়ের শিকারও হয়েছেন। তবে কখনই প্রতিক্রিয়া দেখাননি, বিশ্বাস রেখেছেন নিজের ওপর। প্রথম সাফ ফুটসালে বাংলাদেশকে শিরোপা জেতানোর পর দেশ রূপান্তরকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছেন অনেক কথা- 

সাবিনা, আপনাকে অভিনন্দন। আরেকটি ইতিহাস রচিত হলো আপনার হাত ধরে। আরেকটি সাফল্যের আনন্দে দেশকে ভাসালেন, কেমন লাগছে?

সাবিনা : আলহামদুলিল্লাহ জয় তো সবসময়ই আনন্দের এবং দেশের জয়ের থেকে তো বেশি খুশি আর কিছু আসলে হতে পারে না। দেশের মানুষ যখন খুশি হয় এসব জয়ে, তখন তো আসলে অনেক গর্ব লাগে।

২০২২ সালে সাফে যেবার বাংলাদেশ প্রথম শিরোপা জিতল, আপনি সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন। সবচেয়ে বেশি গোলও ছিল আপনার। আবার ফুটসালে আরেকটা সাফল্য এলো আপনার হাত ধরে। ব্যক্তিগত অর্জনেও সেরা। ২০২২ থেকে ২০২৬- এই পরিক্রমাটা নিয়ে একটু বলেন।  

সাবিনা : সমস্যা-ঝঞ্ঝাট— এটা তো সব জায়গায় থাকে। সব থেকে বড় ব্যাপার হচ্ছে আমার কাছে দেশের সম্মান সবার আগে এবং এর জন্য আমি সব ধরনের লড়াই করতে প্রস্তুত। আমার কাছে দলের চেয়ে দেশ বড়। সুতরাং সেই জায়গা থেকে আমি সবসময় চেয়েছি দেশের জন্য খেলতে। দেশের সম্মান যাতে কোনোভাবে ক্ষুণ্ন না হয়, সেদিকে আমি সবসময় খেয়াল রেখেছি এবং বিগত দিনে কী হয়েছে সেগুলো নিয়ে আমার ওরকম কোনো আক্ষেপ বা কোনো কিছু নেই। আমি নিজের অভিজ্ঞতাটা কাজে লাগিয়ে দেশকে একটু সাহায্য করতে পেরেছি, এটাই আমার তৃপ্তির জায়গা।

শুধু তো আর সাহায্য করেননি, আপনাকে কেন্দ্র করেই এগিয়ে গেছে দলটি...

সাবিনা : এই ফুটসাল খেলাটা আসলে অনেক মেন্টাল টাফনেসের ব্যাপার। সেই জায়গা থেকে আমার ও দলের কোচদের মনে হয়েছে আমি যদি প্লে-মেকিংটা করি তাহলে হয়তো দলের জন্য ভালো হবে। তাই সেই ভাবনা থেকেই ওই পজিশনে খেলা এবং ওই জায়গাটাতে খেললে সবাইকে গাইড করা যায় ভালোভাবে।

মানে আপনার ক্যারিয়ারের একটা বড় সময় জুড়েই এই যে গাইড করার ব্যাপারটা চলে আসছে—  একটা ছায়া হয়ে থাকছেন, যখন যে দলেই খেলছেন...

সাবিনা : আমরা সবাই ফ্যামিলি মেম্বারের মতো। ওদের সঙ্গে আমার দীর্ঘ বছরের সম্পর্ক। ওরা আমার নিজের বোনের মতো। তাই ওদের আগলে রাখাটা আমার দায়িত্বের ভেতরেই পড়ে।

আপনি যেটা বলছিলেন যে কারও ওপর রাগ-ক্ষোভ নেই। তারপরও সাবিনা দেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় পোস্টার গার্ল। অথচ ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে আপনি জাতীয় দলের হয়ে একটা ম্যাচও খেলার সুযোগ পাননি। সব মিলিয়ে সাবিনার যে জায়গাটায় থাকা উচিত ছিল, সে জায়গাটায় থাকতে পেরেছে?

সাবিনা : সবার পছন্দের তো আসলে হয়ে ওঠা যায় না। কেউ কেউ পছন্দ করবে, কেউ অপছন্দ করবে— এটা নিয়েই মানুষের জীবন। যেগুলো হয়েছে হয়তো ডিজার্ভ করতাম না এবং শুধু আমার ব্যাপার না, আমার কাছে মনে হয়েছে বাকি যারা আছে তারাও হয়তো ও রকম কিছু ডিজার্ভ করত না। তবে একটা স্বস্তির জায়গা হচ্ছে আল্লাহপাক যা করেন সব সময় সবার মঙ্গলের জন্যই করেন। এটা আমি খুব বিশ্বাস করি।

সাবিনা খাতুন

অক্টোবরের পর থেকে আপনার সঙ্গে যখনই কথা হতো আপনি একটা কথাই বলেছেন যে সময়ের হাতেই সবকিছু ছেড়ে দিচ্ছেন...

সাবিনা : জি, অবশ্যই। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলে আল্লাহ কাউকে নিরাশ করেন না। এটা আমাকে দিয়েই বোঝা যায়। সবকিছুর সঙ্গে তো আপনি লড়াই করতে পারবেন না। সবাইকে তো আসলে সবকিছু বলে দিতে পারবেন না। তাই সেই জায়গা থেকে আল্লাহর ওপরে বিশ্বাস রেখে কাজ করে যাওয়াই ভালো। আপনার নিয়ত যদি ভালো থাকে, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ আপনার সহায় হবেন।

সময়ের কাছ থেকে কি সঠিক বিচারটা পেয়েছেন?

সাবিনা : আমি গ্রেটফুল আল্লাহর প্রতি এবং অবশ্যই আমি ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ দিতে চাই আমাদের চেয়ারম্যান (বাফুফের ফুটসাল কমিটির) ইমরান ভাইকে। উনি যে সমর্থন দিয়েছেন আসলে ওনার থেকে অনেক কিছু শেখার আছে- যারা প্রফেশনাল টিম চালায় কীভাবে প্লেয়ারদের সম্মান দিতে হয়। আমি খুবই গ্রেটফুল যে উনি টিমের সঙ্গে ছিলেন।

থাইল্যান্ড যাওয়ার আগে আপনাদের কোচ (সাঈদ খোদারাহমি) বলছিলেন মেয়েদের ফুটসালটা শেখাতে হচ্ছে কারণ এখানে কোনো ফুটসাল প্লেয়ার নেই। অথচ আমরা দেখলাম ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের ধারাবাহিকতা অনেক বেশি..

সাবিনা : আমাদের আসলে অনেক ল্যাকিংস ছিল। তবে আমরা যে ১০ দিন আগে থাইল্যান্ডে এসেছিলাম। সেটা আমাদের জন্য সব থেকে বড় প্লাস পয়েন্ট ছিল। আমরা তিনটা ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলছি, ওই ম্যাচ তিনটাই আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে যে টুর্নামেন্টে করতে পারব। এর জন্য আমাদের চেয়ারম্যানকে আলাদাভাবে ধন্যবাদ দিতে চাই।

আমরা দেখলাম যে প্রতিটা ম্যাচেই ম্যানেজার আপনাদের উইনিং বোনাস দিয়েছেন। একটা হেলদি এনভায়রনমেন্ট পেয়েছেন এই সময়টায়। ২০২৪ সালের সাফের ওই সময়টার সঙ্গে যদি একটু তুলনা করতে বলি? 

সাবিনা: ওই সময়টা স্ট্রাগলের ছিল। অনেক কিছুর সঙ্গে ফাইট করতে হয়েছে। তবে দিনশেষে আসলে সবাই তো মানুষ, কারও ওপর ক্ষোভ নেই, দোষারোপও করছি না। যা গেছে তা গেছে। সামনের দিনগুলো যাতে ভালো যায়, এটাই কাম্য। 

সাবিনা খাতুন টুর্নামেন্ট সেরা

সাবিনাকে তো আবারও বাংলাদেশের মানুষ জাতীয় দলের জার্সিতে ফুটবল খেলতে দেখতে চায়। সাবিনা চাওয়াটা কী?

সাবিনা : আল্লাহ পাক যদি চান তাহলে হবে অবশ্যই। আমি আসলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই যাচ্ছি। আমার আসলে কোনো তাড়া নেই। সবকিছুতেই গ্রেটফুল।

বাংলাদেশ মার্চে এশিয়ান কাপ খেলবে অস্ট্রেলিয়ায়। একটু কি আফসোস হয়, যে আপনিও খেলতে পারতেন?
সাবিনা : যারা আছে ওরাও তো আমার খুব ক্লোজ। ওদের জন্য তো আমার শুভকামনা, ভালোবাসা সবসময় থাকবে। ওরা আমার খুব আদরের। আমি মনে করি না এভাবে কেউ চিন্তা করে। যদি করত তাহলে ওরা (অন্য যারা বাদ পড়েছেন) ওখানেই থাকত। তারা (কোচিং স্টাফ) যেহেতু মনে করে যে ওখানে অল গুড, সেখানে আর কিছু বলার থাকে না। এগুলো নিয়ে আসলে কোনো কথা বলতেই চাই না।

নারী ফুটসালে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কেমন দেখেন?

সাবিনা: সম্ভাবনা নির্ভর করে ফুটবল ফেডারেশন ফুটবলারদের যেমন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে এগিয়েছে- এ রকম কিছুর ওপর। ধারাবাহিকভাবে যদি এ রকম হয় এবং মেয়ে ও ছেলেদের নিয়ে যদি দীর্ঘমেয়াদি কাজ করে, তাহলে ভালো হবে।

" ওনাকে (পিটার বাটলার) নিয়ে আমার আসলে কিছু বলার নেই। আর ওনাকে নিয়ে আমার কথা বলাটাও উচিত না। উনি কাজ করছেন, আমি মনে করি ওনাকে কাজ করতে দেওয়া উচিত। উনি ওনার মতো কাজ করে যাক"

লিগ না খেলে ফুটসাল দলে যোগ দিয়েছিলেন। লিগে খেললে তো একটা ভালো চুক্তি পেতেন...

সাবিনা: ডিসিশন মেকিং-এর ক্ষেত্রে আমার মনে হয় না যে আমি ভুল করেছি। আমি যখন কোনো কিছু করি আমি সেটার জন্য বিন্দুমাত্র গিল্টি ফিল করি না। লিগে হয়তো দুইটা টাকা পেতাম। বাট সব থেকে বড় ব্যাপার তো দেশের সম্মান। এর জন্য যদি আমাকে দরকার হয়, আমি কেন যাব না সেখানে? মানুষ ভালোবাসে, এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হয় না।

অক্টোবরের পরের কিছুটা দিন আপনাদের নিয়ে অনেক সমালোচনা ও ট্রল হয়েছে। তবে আপনাকে সবসময় দেখেছি চুপ থাকতে...

সাবিনা: আমার কাছে মনে হয়েছে যে মানুষ তো আসল ব্যাপারগুলো ওভাবে জানে না। আপনি তো প্রত্যেকটা মানুষকে গিয়ে বোঝাতে বা ব্যাখ্যা দিতে পারবেন না। এখন আমার কাছে ম্যাটার করে আমার ফ্যামিলি। আমি যখন প্রতিক্রিয়া দেব, সেটা আমার ফ্যামিলি দেখবে। তাদের টেনশন না বাড়ানোর কারণেই আমার চুপ থাকা। এমন না যে আমাদের কাছে কোনো উত্তর থাকে না। আর আপনি যখন এই সেক্টরে কাজ করবেন, দেশের জন্য খেলবেন গালি তো আপনাকে খেতেই হবে। মানুষ যে সবসময় আপনার কথা শুনবে তা না, অপোজিটটাও মানার মন মানসিকতা রাখতে হবে।

সব শেষে বাটলার প্রসঙ্গ নিয়ে একটু জানতে চাই। ওনার সঙ্গে আপনাদের ইগোইস্টিক একটা সমস্যা তৈরি হয়েছিল। যার পরিণতি...

সাবিনা: ওনাকে নিয়ে আমার আসলে কিছু বলার নেই। আর ওনাকে নিয়ে আমার কথা বলাটাও উচিত না। উনি কাজ করছেন, আমি মনে করি ওনাকে কাজ করতে দেওয়া উচিত। উনি ওনার মতো কাজ করে যাক। 

তাহলে জাতীয় দলে ফেরার বিষয়টাও সময়ের হাতে ছেড়ে দিচ্ছেন?

সাবিনা: হ্যাঁ, সময়ের ওপরে ছেড়ে দিচ্ছি সব। ম্যাচিউর হয়ে গেছি তো (হাসি), ঝামেলায় আর ভালো লাগে না। ভালো থাকুক সবাই। এখন ভালো রেজাল্ট করেছি বলে লোকজনকে নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলার মানুষ আমি না, এটা ঠিকও না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত