যুদ্ধের ধাক্কা বাংলাদেশে

এলএনজির দ্বিগুণ দাম এলপিজিতে বৃদ্ধির চাপ ব্যয় বাড়বে তেলেও

জ্বালানি খাত

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৬, ০২:০৩ এএম

 

 

 

 

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে হামলার পর যুদ্ধ পরিস্থিতি ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে। ওই অঞ্চল বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম হাব হওয়ায় এ যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে জ্বালানি খাতে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানির তীব্র সংকট এবং এর অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে। যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বন্ধ হওয়ায় এরই মধ্যে খোলা বাজার থেকে দ্বিগুণেরও বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে সরকারকে। জ্বালানি তেল আমদানিতেও বাড়বে ব্যয়। অতিরিক্ত এ ব্যয় সামাল দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস কতটা সরবরাহ করা যাবে, তা নিয়েই এখন বড় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্ববাজারের এ অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে ভোক্তা পর্যায়ে ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রির পরও সংকটময় এ পরিস্থিতিতে আরও দাম বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। যদিও সরকার তাদের এ দাবি এখন পর্যন্ত আমলে নেয়নি।

চড়া দামে এলএনজি কেনার উদ্যোগ : জ্বালানি তেল নিয়ে আপাতত তেমন একটা সংকট না হলেও বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস সরবরাহে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কেনা এলএনজিবাহী দুটি কার্গো বিরোধপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া এবং কাতার সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ করায় ১৫ মার্চের পর এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে খোলা বাজার থেকে এলএনজি আমদানি করবে সরকার। যদিও এখন খোলা বাজারে দাম অনেক বেশি চড়া।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রমতে, খোলা বাজার থেকে দুই কার্গো এলএনজি কিনতে গত বুধবার রাতে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটি জরুরি ভিত্তিতে অনুমোদন দিয়েছে।

সরকারি অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করে পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, দুটি কার্গোর মধ্যে একটি কেনা হবে গানভর থেকে। প্রতি ইউনিটের (এমএমবিটিইউ) দাম পড়বে ২৮.২৮ ডলার। ভিটল নামের আরেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২৩.০৮ ডলার হিসেবে অন্য কার্গোটি কেনা হবে।

পেট্রোবাংলার সূত্রমতে, গানভরের কার্গোটির দাম পড়বে প্রায় ১ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা, যেখানে এ বছরের জানুয়ারিতে একই ধরনের একটি কার্গোর দাম ছিল ৫০০ থেকে ৫৫০ কোটি টাকা। গানভোরের কার্গো ১৫ থেকে ১৬ মার্চ বাংলাদেশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ভিটলের চালান ১৮ থেকে ১৯ মার্চ আসার কথা রয়েছে।

পেট্রোবাংলার একজন পরিচালক জানান, মার্চে নির্ধারিত চারটি এলএনজি কার্গো ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তবে আরও দুটি জাহাজ এখনো আটকে আছে। এজন্য স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার জন্য গত মঙ্গল ও বুধবার দুই দফা দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো দরদাতা অংশ নেয়নি। পরে পেট্রোবাংলা স্পট মার্কেট থেকে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে দুই জাহাজ এলএনজি কেনার বিষয়টি চূড়ান্ত করে।

প্রতিটি এলএনজি কার্গোতে সাধারণত প্রায় ৩০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস থাকে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৯০-১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। একটি জাহাজ আটকে গেলেই ৪০-৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি দেখা দেয়। আগাম সতর্কতা হিসেবে সরকার বুধবার থেকে বিদ্যুৎ ও সার কারখানায় গ্যাস রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে দিনে ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় হবে বলে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে।

ব্যয় বাড়বে তেল আমদানিতেও : চলতি সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৬৭ থেকে ৮৪ ডলারে পৌঁছেছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারির চেয়ে যা ২৬ শতাংশ বেশি। যুদ্ধ সহসা শেষ না হলে এই দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, বর্তমানে ডিজেল ১০ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৩ দিন, ফার্নেস ৯০ দিন ও জেড ফুয়েল ৫২ দিনের মজুদ রয়েছে। ৩০ হাজার ও ২৭ হাজার টন জ্বালানি তেল নিয়ে দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে এসেছে। আরও জাহাজ আসছে। হরমুজ প্রণালির কারণে সৌদি আরবে দুটি জাহাজ আটকে গিয়েছিল। সেজন্য ইউপ্যাককসহ কয়েকটি কোম্পানিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে দাবি বিপিসির। তবে সংস্থাটির একটি সূত্র জানিয়েছে, চুক্তিবদ্ধ কোম্পানিগুলো যুদ্ধসংকট পুঁজি করে প্রিমিয়াম বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় বিপিসি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েক হাজার কোটি টাকা করে মুনাফা করছে। সংস্থাটির মতে, প্রতি ব্যারল তেলের দাম ৭২ ডলার অতিক্রম করলেই লোকসান গুনতে হয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলার বাড়লে বছরে অতিরিক্ত কয়েক হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হয়। এ অবস্থায় এলসি খোলা কঠিন হওয়ার পাশাপাশি অস্থিরতা বাড়তে পারে ডলারের বাজারে। সঙ্গে বাড়তে পারে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানান, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ তেল মজুদ রয়েছে, তাতে দাম বাড়ার শঙ্কা নেই। জ্বালানি সরবরাহে এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই বলে জানিয়েছেন সরবরাহকারীরা। যুদ্ধ পরিস্থিতি নজরে রেখে তেলের বিকল্প বাজার খোঁজার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে চলতি মাসে ১৪ থেকে ১৫টি কার্গোর এলসি দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এপ্রিলেও একই পরিমাণ জ্বালানি আমদানির প্রস্তুতি রয়েছে। এর মধ্যে সোমবার পর্যন্ত সাতটি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে।

বাড়তি দামে বড় উদ্বেগ : গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি পড়বে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘায়িত হলে চলতি অর্থবছরে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি রেকর্ড করতে পারে বলে শঙ্কা খাতসংশ্লিষ্টদের।

পেট্রোবাংলা সূত্রমতে, গত বছর ১০৯টি কার্গো এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৩ হাজার ৮৭৭ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। আগের বছর ৮৬টি কার্গোর জন্য ব্যয় ছিল ৩ হাজার ২২ দশমিক ৩২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ৮৫৫ মিলিয়নের বেশি ডলার। চলতি বছর ১১৫টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে ৪০টি ও ওমান থেকে ১৬টি কার্গো আসার কথা। আমদানি বাড়ায় খরচ এমনিতেই বাড়বে। বর্তমানে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়ায় খরচ বাড়বে দ্বিগুণেরও বেশি।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৬২ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর। কয়েক দিন ধরে জ্বালানির দাম বেড়েই চলেছে বিশ্ববাজারে। এ বাড়তি দাম বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশ্ববাজারে এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে ঝুঁকি আরও বাড়বে। তখন ডলার নিয়েও সংকট তৈরি হবে। বাড়বে ভর্তুকির চাপ। তার ভাষায়, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প উপায় হলো খোলা বাজার থেকে কেনা। কিন্তু সেখানেও দাম বাড়ছে। এ দাম বেড়ে যদি ২০ ডলার পর্যন্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশ চাহিদামতো এলএনজি কিনতে পারবে না। তখন গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুতের লোডশেডিং হবে।

এলপিজির দাম বাড়ানোর দাবি ব্যবসায়ীদের : ভোক্তা পর্যায়ে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ থাকলেও বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। বরং গত বছর ডিসেম্বর থেকে পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে অরাজকতায় রূপ নিয়েছে। সরকারি হিসাবে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা হলেও বাজারে অনেক জায়গায় তা ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে গতকাল এক বৈঠকে এলপিজির দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

বৈঠক সূত্র জানায়, আমদানিকারকরা জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে টনপ্রতি ১৬০ ডলারেও জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না, অনেক ক্ষেত্রে ২০০ ডলার পর্যন্ত দর হাঁকা হচ্ছে। সরকারিভাবে আগে ফ্রেইট চার্জ টনপ্রতি ১০৮ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১২১ ডলার করা হলেও ব্যবসায়ীরা আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। এ সময় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুরেটরি কমিশনের পক্ষ থেকে জানা হয়, এখন যে এলপি গ্যাস বাজারে আছে, তা আগে আমদানি করা; তাই দাম বাড়ার যৌক্তিকতা নেই। এখন যে ভাড়া ধরা হচ্ছে, তা ধরে আগামী মাসে দাম সমন্বয় করা হবে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে দেড় লাখ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে, তাই চলতি মাসে সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে এক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, আমদানি হলেও বৈশ্বয়িক সংকটে দাম বাড়তে পারে এমনটি মনে করে কোনো কোনো ব্যবসায়ী গ্যাস ধরে রাখতে পারে। সেটি হলে বাজারে সংকট বাড়বে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যে দামেই হোক এলপিজির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং জাহাজ ভাড়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে।

এর আগে বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমদানিসীমা বাড়ানো, ভ্যাট কমানো এবং এলসিতে ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়। তবে এত সুবিধা দেওয়ার পরও বাজারে অস্থিরতা কমেনি।

গ্যাস রেশনিং, বন্ধ তিন সার কারখানা : এলএনজি আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিকল্প হিসেবে গ্যাস রেশনিংয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে প্রতিদিন ১৮-২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ করা হবে। রেশনিংয়ের আওতায় চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত দুটি সার কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় বুধবার বিকেল ৩টা থেকে চিটাগাং ইউরিয়া সার কারখানা (সিইউএফএল) ও কর্ণফুলী সার কারখানার (কাফকো) উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।

সিইউএফএল স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করে। অন্যদিকে কাফকোর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৭২৫ টন ইউরিয়া ও প্রায় ১ হাজার ৫০০ টন অ্যামোনিয়া।

এদিকে ২ হাজার ৮৪০ টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন নরসিংদীর পলাশের ঘোড়াশাল সার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। গত বুধবার বিকেল থেকে এ কারখানার সার উৎপাদন বন্ধ করা হয় বলে জানান কারখানার মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ফখরুল আলম। তিন সার কারখানা বন্ধ হওয়ায় ১৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় হচ্ছে। তবে বোরো মৌসুমে সার সংকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে ব্যাহত হতে পারে খাদ্য নিরাপত্তা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত