যুদ্ধের ধাক্কা বাংলাদেশে

রেমিট্যান্সযোদ্ধাসহ আটকেপড়া যাত্রীরা গভীর সংকটে

বিমান ভাড়া আকাশচুম্বী

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৬, ০২:০৪ এএম

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মোস্তাফিজুর রহমান। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে ওমরাহ করতে যান। ওমরাহ শেষ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি এমিরেটস এয়ারলাইনসে তার ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় আকাশপথে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তিনি জেদ্দায় আটকা পড়েন পুরো পরিবার নিয়ে। শেষমেশ তিনি বিকল্প পথে আসতে গিয়ে ইন্ডিগো এয়ারলাইনসে (তিন ঘণ্টা ট্রানজিট মুম্বাই) জনপ্রতি ৬৮ হাজার টাকায় টিকিট কেনেন। আকাশচুম্বী অর্থ দিয়ে টিকিট কিনে মোস্তাফিজ হতভম্ব হয়ে পড়েন। অথচ অন্য সময় এই রুটে ভাড়া ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। তার মতো হাজার হাজার যাত্রী মধ্যপ্রাচ্যে রুটে চড়া দামে বিমান টিকিট কিনছেন। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বিশেষ করে ওমরাহ হজযাত্রীরা বিপাকে পড়েছেন বেশি। বিদেশি এয়ারলাইনসের পাশাপাশি দেশীয় এয়ারলাইনসও বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে তাদের কাছ থেকে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, বিদেশে কর্মসংস্থান এবং জীবিকার তাগিদে দেশ ছাড়া মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্য। কিন্তু কয়েক মাস ধরে এ দেশগুলোতে যাওয়ার বিমান ভাড়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হলে ওমরাহ হজযাত্রী ও শ্রমিকরা বিভিন্ন দেশে আটকা পড়েন। তাছাড়া বাংলাদেশে ছুটিতে আসা শ্রমিকরাও পড়েন বিপাকে। আকাশপথ বন্ধ হয়ে গেলে সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করে। তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউএস বাংলাসহ একাধিক বিদেশি এয়ারলাইনস কিছু রুটে ফ্লাইট চালু করে। এতে টিকিটের দাম বেড়ে যায় বহুগুণ। এতে চরম অসহায়ত্বের মধ্যে পড়েছেন হাজার হাজার হজযাত্রী, প্রবাসী শ্রমিক ও ছুটিতে এসে আটকে পড়া যাত্রীরা।

৩০ হাজারের ভাড়া ৬৮ হাজার : সাধারণত ঢাকা থেকে জেদ্দা, রিয়াদ বা দুবাইয়ের রিটার্ন টিকিট ছাড়া ওয়ান-ওয়ে ভাড়া ২৫ থেকে ৩২ হাজার টাকার মধ্যে ওঠানামা করত। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ট্রাভেল এজেন্সিগুলো এবং এয়ারলাইনসগুলোর পোর্টালে দেখা যাচ্ছে, এ ভাড়া এখন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। হজে যাওয়া মো. আরেফ বলেছেন, ওমরাহ করতে এসে বিপাকে পড়েছি। এমিরেটস এয়ারলাইনসে দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু দুবাই রুট বন্ধ থাকায় আমাদের ফ্লাইট চলাচল করছে না। পাঁচ দিন ধরে অশ্চিয়তার মধ্যে আছি। এমিরেটস কর্তৃপক্ষও নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না কবে বা কখন ফ্লাইট চালু হবে। পরে বাধ্য হয়ে জেদ্দা থেকে যেসব ফ্লাইট চলাচল করছে ওইসব প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করে টিকিট সংগ্রহ করার চেষ্টা চালাই। বাংলাদেশের কোনো এয়ারলাইনসের টিকিট না পেয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার টিকিট কিনি। বিজনেস টিকিট কিনতে হয়েছে একেকটি দেড় লাখ টাকা দিয়ে। অন্য সময় এই টিকিট কেনা হতো ৪৫ থেকে ৫৫ হাজারের মধ্যে। সরকারের উচিত দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে ভাড়া কমানো। রফিকুল ইসলাম নামে এক প্রবাসী শ্রমিক বলেন, আমি মাসে বেতন পাই এক হাজার রিয়াল (প্রায় ৩০-৩২ হাজার টাকা)। এখন টিকিট কিনতে চাচ্ছে ৬৮ হাজার টাকা। দুই মাসের বেতন দিয়েও তো একদিকের টিকিট হচ্ছে না। ঋণ করে টিকিট কাটলে বিদেশের মাটিতে গিয়ে খাব কী আর বাড়িতে পাঠাব কী। রফিকুলের মতো হাজারো প্রবাসী এখন একই সংকটে। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, কিন্তু টিকিট না পাওয়ায় বা আকাশছোঁয়া দামের কারণে তারা সময়মতো ফিরে যেতেও পারছেন না। এতে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন অনেকে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহর নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ’ শীর্ষক একটি পেজ রয়েছে। পেজটিতে মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইনস সংকটের নিয়মিত আপডেট দেওয়া হয়। গত বুধবার ওই পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে বলা হয়, সৌদিতে বাংলাদেশি ওমরাহ যাত্রীদের সঙ্গে বয়স্ক নারী-পুরুষ ও শিশুরাও রয়েছেন। তারা সৌদিতে থাকান্ডখাওয়া নিয়ে কঠিন এক অবস্থায় পড়েছেন। এ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ মানবিক সংকটের দিকে যাচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ অবিলম্বে বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে আটকে পড়া ওমরাহ যাত্রীদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হোক।

বাংলাদেশি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো রেমিট্যান্স। যদি একজন প্রবাসীকে তার আয়ের বড় একটি অংশ শুধু যাতায়াত খরচেই ব্যয় করতে হয়, তবে দেশে পাঠানো অর্থের পরিমাণ কমে যাবে। এ ছাড়া উচ্চ ভাড়ার কারণে অনেক নতুন শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না, যা দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এয়ারলাইনসগুলোর দাবি ও বাস্তবতা : দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর দাবি, তারা আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করে। তবে যাত্রীদের অভিযোগ, একই দূরত্বের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ভাড়া বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। এটি স্পষ্ট করে, বাংলাদেশের আকাশ পথে কোনো একটি পক্ষ কৃত্রিমভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। অ্যাভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বাংলাদেশ বিমানসহ বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোকে অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দিলে ভালো হয়, সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি কর্তৃক ভাড়ার একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিলে এ অরাজকতা সৃষ্টি হবে না। ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর টিকিট ব্লকিং সিস্টেম বন্ধ করতে কঠোর মনিটরিং করতে হবে।

ইউরোপ-আমেরিকার যাত্রীরাও পড়েছেন সমস্যায় : মধ্যপ্রাচ্যের ছাড়াও যারা ওইসব রুটের ট্রানজিট নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় ভ্রমণ বা ব্যবসার কাজে গেছেন, তারাও ফিরতে পারছেন না। ওই দুটি মহাদেশ থেকে যারা ফিরছেন, তাদের নতুন টিকিট কিনে বিকল্প এয়ারলাইনস ও রুটে ফিরতে হচ্ছে। আবার যারা যাচ্ছেন, তাদেরও নতুন করে টিকিট কাটতে হচ্ছে। এতেও ভাড়া আকাশচুম্বী। শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে দিনে প্রতিদিন প্রায় ১৯০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল করে। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ ফ্লাইট মধ্যপ্রাচ্যের। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর গতকাল পর্যন্ত ২৬০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে অন্তত লাখের বেশি যাত্রী চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ না হলে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

দুবাই থেকে ক্রুসহ ৪০৫ জনকে আনল ইউএস বাংলা : চলমান পরিস্থিতির মধ্যে দুবাইয়ে আটকে পড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ২৭ জন ফ্লাইট ক্রুকে গতকাল দেশে ফিরিয়ে এনেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। একই ফ্লাইটে ওই দেশ থেকে ৩৭৮ যাত্রীও দেশে ফিরেছেন। পাঁচ দিন ধরে তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে সেখানে অবস্থান করছিলেন।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বলেন, দুবাই ও আবুধাবি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, এমিরেটস, এয়ার ইন্ডিয়াসহ কয়েকটি এয়ারলাইনসকে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে। তিনি বলেন, যেসব বাংলাদেশি যাত্রীর ভিসার মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে অথবা শিগগির শেষ হতে যাচ্ছে, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভ্রমণের সুযোগ দেওয়া হবে। বেশি দামে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে না। একই কথা বলেছেন বিমানের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম। তিনি বলেন, আমার জানামতে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না।

সীমিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে এমিরেটস : আঞ্চলিক আকাশসীমা আংশিকভাবে চালু হওয়ার পর বাণিজ্যিক ফ্লাইটের নিরাপদ পরিচালনার স্বার্থে এমিরেটস আপাতত সীমিত ফ্লাইট সূচি নিয়ে নিজস্ব কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

গতকাল প্রতিষ্ঠানটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আজ শুক্রবার পর্যন্ত দুদিনে দুবাই থেকে ১০০টির বেশি ফ্লাইট ছেড়ে যাবে এবং দুবাইয়ে ফিরে আসবে। এসব ফ্লাইটে ভ্রমণে আগ্রহী যাত্রীদের পাশাপাশি পচনশীল পণ্য ও ওষুধের মতো জরুরি কার্গোও পরিবহন করা হবে।

এতে বলা হয়, ‘এয়ারস্পেস অ্যাভেইলেবিলিটি এবং সব অপারেশনাল শর্ত পূরণ হওয়ার ওপর নির্ভর করে এমিরেটস ধীরে ধীরে তাদের ফ্লাইট সূচি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে। নিরাপত্তা সবসময়ই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমরা নিয়মিতভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং সেই অনুযায়ী আমাদের কার্যক্রম সমন্বয় করছি।’ এ মুহূর্তে যেসব যাত্রীর বুকিং নিশ্চিত রয়েছে, শুধু তাদেরই বিমানবন্দরে আসার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে এয়ারলাইনসটি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত