যুদ্ধের ধাক্কা বাংলাদেশে

যুদ্ধকালীন সারচার্জ কনটেইনারপ্রতি ৩০০ ডলার!

সমুদ্রবাণিজ্য

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৬, ০২:০৬ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের যুুদ্ধের প্রভাব এবার সমুদ্রবাণিজ্যে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় পণ্যবাহী জাহাজগুলো এবার কনটেইনারপ্রতি ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। চীন থেকে আমদানিকৃত ৪০ ফুটের প্রতিটি কনটেইনারের ভাড়া ২০০ থেকে ৩০০ ডলার বাড়ানো হয়েছে। শিপিং লাইনগুলো একে যুদ্ধকালীন সারচার্জ হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বন্ধ রয়েছে আমদানি-রপ্তানি পণ্য আনা-নেওয়ার কাজ। আর এতে দেশের পোশাক শিল্পসহ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে ব্যবসায়ীদের অভিমত।

যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি (পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের যুক্তকারী একটি পথ) বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এতে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৪০টি জাহাজ আটকা পড়েছে পারস্য উপসাগরে। এসব জাহাজ তিন লাখ কনটেইনার নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ভাসছে। যুদ্ধঝুঁকির কারণে যেমন কোনো বন্দরে বার্থিং নিতে পারছে না, তেমনি কনটেইনার খালাস করতে পারছে না। এই ১৪০ জাহাজের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম শিপিং লাইন এমএসসির রয়েছে ১৫টি জাহাজ, যেগুলোতে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ টিইইউস একক কনটেইনার রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরমুখী কনটেইনারও রয়েছে। এ বিষয়ে এমএসসি শিপিং ইন্টারন্যাশনালের হেড অব অপারেশন আজমীর হোসাইন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় সারা বিশ্বের শিপিং খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে প্রতিদিন বাড়ছে তেলের দাম। এখন পারস্য উপসাগরে যেসব জাহাজ আটকা পড়ে আছে, সেগুলো কিন্তু জ্বালানি পোড়াচ্ছে অথচ কোনোদিকে যেতে পারছে না।’

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমাদের বেশি দাম দিয়ে তেল কিনতে হচ্ছে। এজন্য ব্যবসায়িক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চীন থেকে চট্টগ্রামমুখী সব আমদানি পণ্যের ৪০ ফুটের কনটেইনারগুলোর ভাড়া ২০০ থেকে ৩০০ ডলার বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকলে পর্যায়ক্রমে জাহাজ ভাড়াও বাড়বে। করোনাকালেও কিন্তু এমনভাবে ভাড়া বেড়েছিল।

তবে ২০০ থেকে ৩০০ ডলার নয়, তা ৫০০ ডলার করে বাড়ানো হয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, চীন থেকে চট্টগ্রামে ৪০ ফুট কনটেইনারের ভাড়া ছিল ১৫০০ ডলার। এখন তা বেড়ে ২০০০ ডলার করা হয়েছে। আমরা তা ১৮০০ ডলারে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি।

রপ্তানি পণ্যে চট্টগ্রাম থেকে চীন কিংবা সিঙ্গাপুরগামী কনটেইনারে ভাড়া না বাড়িয়ে আমদানি পণ্যে কেন বাড়ানো হলো? এই প্রশ্নের উত্তরে বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, চীনের উৎসব উপলক্ষে গত ১৫ দিন আমদানি পণ্যের জাহাজীকরণ বন্ধ ছিল। এখন আবার তা চালু হয়েছে। এতে অনেক বেশি আমদানি পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে আসবে। শিপিং লাইনগুলো এ সুবিধা কাজে লাগাতে চাইছে।

জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির কারণে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি দেশের পোশাক খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেন শিপিং কোম্পানি জিবিএক্স লজিস্টিক লিমিটেডের হেড অব অপারেশন মুনতাসির রুবায়েত। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোতে বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। আবার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে মধ্যপ্রাচ্যের এই রুট পরিহার করে আফ্রিকার নিচ দিয়ে উত্তমাশা অন্তরীপ ও আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে ইউরোপে যাবে জাহাজগুলো। এতে স্বাভাবিকভাবেই জাহাজ ভাড়া বাড়বে এবং এতে আমাদের পোশাক শিল্প মালিকদের লভ্যাংশের মার্জিন কমে আসবে। আর জাহাজ ভাড়া বেড়ে গেলে আমদানিকারকের খরচ বেড়ে যাবে এবং তা দিনশেষে ভোক্তার ওপর এসে পড়বে।

এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, এতে পোশাক শিল্পের মালিকরা আবারও নতুন করে চাপে পড়বেন। খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমাদের মার্জিন কমে আসবে।

রাকিবুল আলমের বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান এসএম আবু তৈয়ব বলেন, এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের ট্যারিফ জটিলতার এখনো নিরসন হয়নি। এখন নতুন করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে জাহাজ ও কনটেইনার ভাড়া বাড়ানো হলে দেশের গার্মেন্টস শিল্প সংকটে পড়বে। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে নীতি সহায়তা প্রয়োজন।

বিশ্ব অর্থনীতি হলো জ্বালানি তেলনির্ভর। জাহাজ চালাতে গেলে তেল লাগবেই মন্তব্য করে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন বলেন, জাহাজ ভাড়া বাড়ানো ছাড়া শিপিং কোম্পানিগুলোর কোনো পথ খোলা নেই। আর এ ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি আমাদের ভোক্তা পর্যায়ে যেমন পড়বে, তেমনিভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে আমাদের পোশাক শিল্প। আমদানি পণ্যের খরচ যেমন বাড়বে, তেমনিভাবে রপ্তানি পণ্যের খরচও বাড়বে।

এদিকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী প্রধান দেশগুলো হলো পারস্য উপসাগরীয় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ যেমন ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ প্রণালি দিয়ে এশিয়ার বাজারে (প্রধানত চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া) বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ইরান এ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ও পণ্যবাহী সব জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম হয়ে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে ২৯ লাখ ৬১ হাজার ১১৮ একক কনটেইনার পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছিল। এর মধ্যে আমদানি পণ্য ছিল ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ২৭০ একক কনটেইনার এবং রপ্তানি পণ্য ছিল ১৪ লাখ ৭১ হাজার ৮৪৮ একক কনটেইনার। গত মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা ১১৩টি জাহাজ দিয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৬৯২ একক কনটেইনার আমদানি পণ্য ও ১ লাখ ৩ হাজার ৩৫ একক কনটেইনার রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত