আন্তঃনগর চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনটি চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছাড়ার ২০ মিনিট পরই আগুন লাগল কেন? এ সময়ের মধ্যে ট্রেনটি মাত্র ১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিল। আগুনে ট্রেনটির পাওয়ার কার ও একটি এসি কোচ (‘চ’) পুরোপুরি ভস্মীভূত হয়ে গেলেও যাত্রীরা ট্রেন থেকে নেমে যাওয়ায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের একটি কমিটি করেছে পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ে।
কিন্তু ট্রেনটি চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে পুরোপুরি ফিটনেস সার্টিফিকেট নিয়ে স্টার্ট করেছে। ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়া লোকোমাস্টার ট্রেন চালানোর কথা নয়। যথারীতি এই ট্রেনের ক্ষেত্রেও তা দেওয়া হয়েছে। আগুন লেগেছে পাওয়ার কার (যে কোচ থেকে লোকোমেটিভ ব্যতীত পুরো ট্রেনে লাইট ও ফ্যানের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়) কোচের চাকার নিচের অংশে। পাওয়ার কার থেকে আগুন লাগলে তা ট্রেনের ভেতরে কিংবা ওপরের অংশে হতো, কিন্তু আগুনের সূত্রপাত হয়েছে চাকার নিচের অংশে। আর এই আগুনে পাওয়ার কারের কোচের পাশাপাশি একটি এসি কোচও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তবে ভাগ্য ভালো যে ট্রেনের লোকোমাস্টার ও সহকারী লোকোমাস্টারের বুদ্ধিমত্তায় ট্রেন থামিয়ে আগুন লাগা কোচগুলো থেকে অন্য কোচগুলোকে আলাদা করে নেওয়া হয়েছিল। এতে অন্য কোচগুলো যেমন রক্ষা পেয়েছে তেমনিভাবে জানমালের ক্ষতি থেকেও রক্ষা হয়েছে।
প্রথমে আগুন কে দেখেছে? : চলন্ত ট্রেনে সহজে কারও আগুন চোখে পড়ে না। এজন্য ট্রেনের বাইরে থেকে কেউ দেখলে ট্রেন কন্ট্রোল রুমে জানালে কিংবা সেই তথ্য আবার ট্রেনের লোকোমাস্টারকে (ট্রেনচালক) জানানোর পরই ট্রেন থামানো হয়। কিন্তু আমরা দেখলাম চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনটি ফৌজদারহাট স্টেশন পার হয়ে ভাটিয়ারী স্টেশনে প্রবেশের আগে বিএম গেটে থেমে যায়। আর ট্রেনের লোকজন দ্রুত নেমে যেতে থাকে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, ট্রেনে আগুন লাগার বিষয়টি কে প্রথমে দেখেছে এবং লোকোমাস্টারকে অবহিত করল কে? চলন্ত ট্রেন থামাতে হলে ট্রেন পরিচালকের (গার্ড) অনুমোদন সাপেক্ষে লোকোমাস্টার অনির্ধারিতভাবে ট্রেন থামাতে পারবেন। এ বিষয়ে চট্টলা ট্রেনের গার্ড মোহাম্মদ শামীমের সঙ্গে কথা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফৌজদারহাট স্টেশন পার হওয়ার সময় সেখানকার স্টেশন মাস্টার ট্রেনে আগুন বলে চিৎকার করেন। পরে আমি বাইরের দিকে মুখ বের করে দেখি ধোঁয়া বের হচ্ছে। তখন লোকোমাস্টারের সঙ্গে কথা বলে ট্রেনটি থামানোর ব্যবস্থা করি।
এ বিষয়ে কথা হয় ফৌজদারহাট স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মোবারক হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, রেলওয়ে বিধি অনুযায়ী ট্রেন স্টেশন অতিক্রম করার সময় স্টেশন মাস্টারকে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে পতাকা প্রদর্শন করতে হয়। একই সঙ্গে ট্রেনটি ঠিক আছে কি না, সেই তথ্যও জানাতে হয়। চট্টলা এক্সপ্রেস সকাল ৬টা ২৫ মিনিটে ছেড়ে আমার স্টেশনে ৬টা ৪৫ মিনিটে অতিক্রম করার সময় পাওয়ার কারের কোচে আগুন দেখতে পেয়ে চিৎকার করে গার্ডকে ইনফর্ম করি। পরে রেলওয়ে কন্ট্রোলরুমে অবগত করার পর সেখান থেকে লোকোমাস্টার ও ট্রেনের গার্ডকে অবহিত করা হয়।
আগুনের কারণে ট্রেন থামে ভাটিয়ারী বিএম গেটে : এদিকে আগুন লাগার সংবাদ পাওয়ার পরই ট্রেন থামানো হয়েছে বলে জানান ট্রেনের লোকোমাস্টার জয়নাল আবেদিন। তিনি বলেন, কন্ট্রোলরুম থেকে আগুন লাগার বিষয়টি জানার পরপরই ট্রেনের গার্ডের সঙ্গে কথা বলে ভাটিয়ারী স্টেশনে প্রবেশের আগেই বিএম গেটে ট্রেনটি থামানো হয়।
তিনি আরও বলেন, ট্রেন থামানোর পর আমার সহকারী লোকোমাস্টার স্বপন কুমার দাশকে আগুন লাগার কোচের কাছে যেতে বলি। তিনি গিয়ে সামনের ১০টি কোচকে আলাদা করে দিলে আমি সামনের দিকে ট্রেনটি চালিয়ে ভাটিয়ারী স্টেশনে নিয়ে আসি। পাওয়ার কার ও পরের এসি কোচে আগুন লাগায় পেছনের পাঁচটি কোচকে আলাদা করে দেওয়া হয়। সেই কোচগুলো যাত্রীদের সহায়তায় পেছনের দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে পাওয়ার কার ও এসি কোচ ছাড়া অন্য কোচগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
পরে যাত্রীরা কীভাবে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে ট্রেনের গার্ড মোহাম্মম শামীম বলেন, ট্রেনে ১৭টি কোচ ছিল। পাওয়ার কারের সামনে ছিল ১০টি কোচ। সেই কোচগুলো চলে যায় সামনের ভাটিয়ারী স্টেশনে। আর পেছনের পাওয়ার কার ও এসি কোচ (‘চ’) ছাড়া পেছনের পাঁচটি কোচ উদ্ধারকারী ইঞ্জিন দিয়ে ফৌজদারহাট স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পাহাড়তলী থেকে একটি পাওয়ার কার ও এসি কোচ আনা হলে পেছনের অংশটি নিয়ে ভাটিয়ারীতে সামনের অংশের সঙ্গে যুক্ত করে পুরো ট্রেনটি ১০টা ৪৮ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।
আগুন কীভাবে লাগল? : প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুনসহ ট্রেনটি বিম গেটসংলগ্ন এলাকায় থামার পর স্থানীয়রা তা নেভানোর উদ্যোগ নেয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এবং পাশে থাকা সেনাবাহিনীর সদস্যরাও আগুন নেভাতে সাহায্য করেন। এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভিডিওতে দেখা যায়, পাওয়ার কারের ডান দিকে চাকার নিচ থেকে আগুন বের হচ্ছে। এ ছাড়া ফৌজদারহাট স্টেশনের স্টেশনমাস্টার মোবারক হোসেনও বলেন, চাকার নিচের অংশে আগুন দেখা গেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, চাকার নিচের অংশে কীভাবে আগুন লাগল? এই প্রশ্নের উত্তরে পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের প্রধান বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী মুহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, ‘চাকার নিচের যে অংশে আগুন লেগেছে তা ব্রেক ব্লকের কারণে হয়েছে। যদি পাওয়ার কারের কারণে হতো তাহলে ওপরের অংশে আগুনের সূত্রপাত হতো। ওপরের অংশে আগুন লাগলে পাওয়ার কার শুরুতেই ক্ষতিগ্রস্ত হতো এবং আগুনের ভয়াবহতা আরও বাড়ত। এখন ব্রেক ব্লকের বিষয়টি যান্ত্রিক বিভাগ দেখে।’
এদিকে গতকাল চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনে পাওয়ার কারের দায়িত্বে ছিল জাহেদুল হক ও মোহাম্মদ মনসুর। এ দুজন পাওয়ার কারের কোচে অন ডিউটিরত অবস্থায় ছিলেন। আগুনের সূত্রপাত বিষয়ে জানতে চাইলে জাহেদুল হক বলেন, ‘আগুন লাগার পর আমরা জেনারেটর বন্ধ করলাম। কিন্তু কোথাও আগুনের উৎস চোখে পড়েনি। নিচের অংশে আগুন লেগেছে।’
তিনি আরও বলেন, নিচ থেকে আগুনটি ওপরে ওঠার কারণে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কোচগুলো প্লাস্টিকের এবং রঙ আছে। এ ছাড়া যেখানে আগুন লেগেছে এর ওপরে ছিল ১ হাজার লিটার ডিজেলের একটি ট্যাংক। এই ট্যাংকে শেষের দিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় আর সহজে নেভানো যায়নি।
ট্রেনের কোচের ফিটনেস নিয়ে সন্দেহ : মার্শাল ইয়ার্ড (যেখান থেকে কোচগুলো স্টেশনে নিয়ে আসা হয়) থেকে কোচগুলো চেক করে স্টেশনে নিয়ে আসা হয়। আর এই কাজগুলো করে রেলওয়ে টিএক্সআর ডিপার্টমেন্ট। তারাই কোচগুলোর ফিটনেস সার্টিফিকেট ট্রেনের গার্ডের কাছে দিয়ে থাকে এবং সেই সার্টিফিকেট পেলেই লোকোমাস্টার ট্রেন নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এখন প্রশ্ন হলো, পাওয়ার কারের কোচের চাকার ব্রেক ব্লকের ফিটনেস কি ঠিক ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় মার্শাল ইয়ার্ড ও চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের হেড টিএক্সআর আজাদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ফিটনেস ঠিক ছিল বলেই তো আমরা সার্টিফিকেট দিয়েছি। আর চাকার নিচে লোহালক্কর থেকে তো আর আগুন বের হয় না। তাই ব্রেক ব্লক কোনো বিষয় নয়।’
একই মন্তব্য করেন কোচগুলোর ফিটনেসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মাসুদ। তিনি বলেন, আমরা আগুন লাগার কারণ কিংবা উৎস এখনো বের করতে পারিনি। আর ব্রেক ব্লকের কারণে আগুনের সূত্রপাত হওয়ার কথা নয়।
তবে রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও একাধিক লোকোমাস্টারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্রেক ব্লকের কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে রেলওয়েতে এমন অনেক ঘটনা আছে। অনেক সময় ট্রেন থামিয়ে এসব আগুন নেভাতেও হয়েছে।
চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন : পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধান ও ক্ষয়ক্ষতির অবস্থা নিরূপণের জন্য বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা আনিসুর রহমানকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।
ঈদকেন্দ্রিক যাত্রাপথে দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। গতকাল পদ্মা নদীতে ৫০ জন যাত্রী নিয়ে একটি বাস তলিয়ে যায়। এর আগে কুমিল্লায় ট্রেন ও বাস সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি ঘটছে।
